ধর্মকর্ম ব্যাপারে একপ্রকার অজ্ঞ ছিলাম বলিয়া আদ্যাশক্তির এই সব অপরিচিত সন্তানদের বিষয়ে আরও জানিবার জন্য মনে আগ্রহ বোধ করিতাম, যাহারা সুদূর নক্ষত্ররাজির ন্যায় নিজ নিজ কক্ষে বিদ্যমান থাকিয়াই দীপ্তি পাইবেন এবং আমাদের এই জগতে কদাপি প্রত্যাবর্তন করিবেন না। জানিতে ইচ্ছা করিত, তাঁহাদের সেই অনিন্দ্যসুন্দর জীবনেও হয়তো বা দূর অতীতের একদিনের সেই মহান অনুভূতির কথা তাহারা বিস্মৃত হইয়াছেন; হয়তো বা তাহাদের নিকট আচার্যশ্রেষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণের স্মৃতি ও তাহার কৃপাস্পর্শের কথা বহু অতীতের কোন ঘটনার মতো, অথবা স্বপ্নাবস্থায় শ্রুত কোন কোন গল্পের মতো স্মৃতিপট হইতে বিলুপ্তপ্রায় হইয়া থাকিবে—যেমন দক্ষিণেশ্বরে তাহাদের আগমনের কথা যাহাদের সাক্ষাতে ঘটিয়াছিল, তাহাদের স্মৃতি হইতে প্রায় লুপ্ত। ইহা সত্য কি না আমার জানিতে ইচ্ছা করিত। প্রকৃতপক্ষে সকল ব্যাপারেই পারস্পরিক প্রভাব কাহার অধিক তাহা নির্ণয় করিতে চাহিতাম; ঐ কালে আমার একেবারেই ধারণা হয় নাই যে, এইপ্রকার অভিজ্ঞতা হিন্দুগণের নিকট দৈনন্দিন ব্যাপারহিন্দুমাত্রেই এ-সকল অনায়াসে বুঝিতে পারে। কিন্তু স্বামীজী আমার মনের এই আলো-আঁধার অবস্থার কথা অবহিত ছিলেন না। তিনি বলিলেন, “শ্রীরামকৃষ্ণ যে কৃপা করে কাউকে স্পর্শ করেছেন, এটা কি তামাসার কথা? তার কাছে যে-সব নরনারী আসত, তারা এই রকম ক্ষণকালের স্পর্শেই নূতন জীবন লাভ করেছে—এ কথা কি আবার বলে বোঝাতে হবে?” অতঃপর তিনি এক এক করিয়া শ্রীরামকৃষ্ণের বিভিন্ন শিষ্যের জীবনের ঘটনাসমূহ বলিতে লাগিলেন। একজন ক্রমাগত তাহার নিকট যাতায়াত করিত এবং সত্যবস্তু ধারণার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টাও করিত। কিছুদিন পরে সহসা একদিন তিনি ঐ ব্যক্তিকে বলেন, “এখন যাও, কিছু টাকাকড়ি উপার্জন কর, তারপর আবার এস!” ফলে সে ব্যক্তির জগতে আজ বেশ পসার-প্রতিপত্তি, কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি তাহার সেই পূর্ব ভালবাসা এখনও তেমনি উজ্জ্বল। এই সকল ঘটনা বর্ণনাকালে স্বামীজী ঐ ব্যক্তির বা অপর কাহারও দোষত্রুটির বিন্দুমাত্র উল্লেখ করিতেন না। তাঁহার বর্ণনায় শ্রোতা ইহাদের প্রত্যেকের জীবনে যে সৎসাহস ও মহত্ত্ব কেবল তাহারই পরিচয় পাইতেন। প্রত্যেকেই জোর করিয়া সন্ন্যাস অবলম্বন করিবে কেন? কেবল তাহা নহে, অন্যান্য কর্মগুলি সমাপ্ত না হইলে তাহার সন্ন্যাসগ্রহণ কখনই সম্ভব নয়। কিন্তু শেষকালে আর তাহার ভুল হইবে না। তখনই সে প্রকৃত কর্মত্যাগের বা সন্ন্যাসজীবনের অধিকারী হইবে।
মহাপুরুষগণ সম্বন্ধেও স্বামীজী অনুরূপভাবে আলোচনা করিতেন। যখন যাহার প্রসঙ্গ উঠিত, তখন তাহার সম্পর্কে সমস্ত মনপ্রাণ দিয়া এরূপভাবে কথা বলিতেন যে, সেই সময়ের জন্য শ্রোতার মনে হইত, ইহার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ আর কেহ নাই। পওহারী বাবা সম্বন্ধে এত বিশদভাবে বলিবার চেষ্টা করিতেন যে, অতঃপর ঐ বিষয়ে কোন অনিশ্চিত প্রশ্ন উত্থাপন করা ভদ্রতাবিরুদ্ধ বলিয়া বোধ হইত। সেই মহাত্মার দেহত্যাগকালে যাহারা স্বামীজীর নিকট উপস্থিত ছিলেন, তাঁহারা জানিতেন, তাঁহার নিকট পওহারী বাবার স্থান ছিল শ্রীরামকৃষ্ণের পরেই; তাহারা আরও জানিতেন, পওহারী বাবার ভালবাসার ন্যায় আর কিছুই তাহার নিকট ঐরূপ মূল্যবান ছিল না।
তারপর ঘণ্টাখানেক ধরিয়া তিনি আরও দু-একজন মহাপুরুষ, যাহাদের তিনি দর্শন করিয়াছিলেন, তাহাদের বিষয় গল্প করিতে লাগিলেন। ত্রৈলঙ্গ স্বামীকে যখন স্বামীজী দেখেন, তখন তিনি অত্যন্ত বৃদ্ধ। দেখিলে মনে হইত, একশত বৎসরের অধিক বয়স। তিনি মৌন অবলম্বন করিয়া থাকিতেন। কাশীতে এক শিবমন্দিরে পড়িয়া থাকিতেন—শিবলিঙ্গের উপর পা দিয়াই শুইয়া আছেন! হঠাৎ দেখিলে মনে হইবে পাগল! কিন্তু দর্শকগণের মধ্যে কাহারও কোন প্রশ্ন থাকিলে লিখিয়া দিতে বাধা ছিল না, এবং খেয়াল হইলে তিনি কোন প্রশ্নের উত্তর সংস্কৃতে লিখিয়া দিতেন। কিছুদিন পূর্বে ইনি দেহত্যাগ করেন।
স্বামীজী যখন রঘুনাথদাসের আশ্রমে উপনীত হন, তখন দুইমাস হইল উক্ত মহাপুরুষের দেহত্যাগ হইয়াছে। প্রথমে তিনি ব্রিটিশ সৈন্যবিভাগে কার্য করিতেন, এবং শিবির-রক্ষক প্রহরীর কার্যে সৎ ও বিশ্বাসী কর্মচারী হিসাবে উপরিতন কর্মচারিগণের বিশেষ স্নেহভাজন ছিলেন। এইরূপে দিন যায়, এমন সময়ে একরাত্রে তিনি দেখিতে পাইলেন, একদল লোক রামনাম সঙ্কীর্তন করিতে করিতে চলিয়াছে। উহা শুনিবার পর নিজ কর্তব্য পালনে যথাসাধ্য চেষ্টা করিলেও “বোল রাজা রামচন্দ্রকী জয়!”—এই ধ্বনি শুনিবামাত্র তিনি উন্মত্তপ্রায় হইয়া উঠিলেন। নিজের অস্ত্রশস্ত্র ও সৈনিকের পরিচ্ছদ ছুড়িয়া ফেলিয়া তিনি সঙ্কীর্তনে যোগ দিলেন।
কিছুকাল এইরূপে চলিবার পর অবশেষে কর্ণেল সাহেবের নিকট তাহার নামে অভিযোগ গেল। কর্ণেল রঘুনাথদাসকে ডাকিয়া পাঠাইলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন—ঐ সকল সংবাদ সত্য কি না এবং উহার শাস্তি তাঁহার জানা আছে কিনা। রঘুনাথ উত্তর দিলেন, হ তাঁহার জানা আছে, বন্দুকের গুলিতে প্রাণ যাইবে। কর্ণেল বলিলেন, “দেখো, এবারের মতো তোমায় ক্ষমা করলাম। যাও, আমি একথা কাউকে বলব না। কিন্তু যদি আবার এরূপ হয়, তবে তোমার শাস্তি অনিবার্য।”
