তিনি আবৃত্তি করিলেন–
“মুণ্ডমালা পরায়ে তোমায়, ভয়ে ফিরে চায়,
নাম দেয় দয়াময়ী।
***
চূর্ণ হোক স্বার্থ সাধ মান, হৃদয় শ্মশান,
নাচুক তাহাতে শ্যামা।”
তিনি বলিতে লাগিলেন, “আমি ভয়ঙ্করকে ভয়ঙ্কর বলেই ভালবাসি, নৈরাশ্যকে নৈরাশ্য বলেই ভালবাসি। দুঃখদারিদ্রকে দুঃখস্বরূপ বলেই ভালবাসি। ক্রমাগত সংগ্রাম করে যাও; প্রতিপদেই পরাজয়, ক্ষতি নেই। তবু সংগ্রাম কর। ঐটেই আদর্শ–ঐটেই আদর্শ।”
একবার তিনি বলিয়াছিলেন, “শুধু মানবাত্মার নয়, সকল প্রাণীর আত্মার সমষ্টিই সগুণ ঈশ্বর। এই সমষ্টীভূত বিরাটের ইচ্ছাশক্তিকে কোন শক্তি প্রতিরোধ করতে পারে না। একেই আমরা নিয়ম বলে জানি। শিব, কালী ইত্যাদির অর্থও তাই।”
জগতের কতকগুলি শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্যময় দৃশ্য আমার নিকট অধিকতর সুন্দররূপে প্রতিভাত হইয়াছে; কারণ, ঐ সকল স্থানে স্বামীজীর নিকট দীর্ঘকাল ধরিয়া এইরূপ ধরনের কথাবার্তা শ্রবণ করিবার সুযোগ আমি পাইয়াছি।
আমরা যখন সিসিলি দ্বীপের নিকটবর্তী হইলাম, তখন সূর্য সবে অস্ত গিয়াছে, পশ্চিম গগনে অস্তমান সূর্যের শেষ রক্তচ্ছটা, এবং তাহারই সম্মুখে এটনা আগ্নেয়গিরি হইতে অল্প অল্প ধূম নির্গত হইতেছে। মেসিনা প্রণালীতে প্রবেশ করিবামাত্র চন্দ্রোদয় হইল। ডেকের উপর স্বামীজীর সহিত পায়চারি করিয়া বেড়াইতেছি তিনি বুঝাইতে লাগিলেন যে, সৌন্দর্য বাহিরের বস্তু নহে, উহা পূর্ব হইতেই আমাদের মনের মধ্যে থাকে। একদিকে ইটালীর উপকূলের ধূসরবর্ণের বন্ধুর পাহাড়গুলি যেন ভূকুটি করিতেছিল, অপরদিকে রজতকৌমুদীধারায় স্নাত সিসিলি উপদ্বীপ। স্বামীজী বলিলেন,”মেসিনা আমাকে ধন্যবাদ দেবেই, কারণ আমিই তাকে ঐ অতুল সৌন্দর্য দান করেছি।”
অতঃপর বাল্যকালেই তাহার মনে ভগবানলাভের জন্য যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্মিয়াছিল, সেই সম্পর্কে বলিতে লাগিলেন, কেমন করিয়া তিনি একাসনে বসিয়া কোন একটি মন্ত্র উদয়াস্ত জপ করিতেন। আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি তপস্যার অর্থ কি, তাহা বুঝাইবার চেষ্টা করিতেছিলেন। প্রাচীন প্রথানুযায়ী পঞ্চতপার কথা বলিলেন, চারিপাশে চারিটি অগ্নি প্রজ্বলিত করিয়া তাহার মধ্যে সাধক উপবিষ্ট থাকেন, মাথার উপর অনলবর্ষী সূর্য—এই অবস্থায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা মন স্থির করিয়া বসিয়া থাকিতে হয়। অবশেষে তিনি এই বলিয়া শেষ করিলেন, “ভীষণের পূজা কর, মৃত্যুর উপাসনা কর। আর সব মিথ্যা। সব চেষ্টা, সব সংগ্রাম বৃথা! এই হলো শেষ শিক্ষা। কিন্তু এ কাপুরুষের মৃত্যুকে ভালবাসা নয়, এ ভালবাসা দুর্বলের বা আত্মঘাতীর নয়। এ হলো শক্তিমান ব্যক্তির মৃত্যুকে সাদর সম্ভাষণ—যে অতলান্ত পর্যন্ত সব কিছু পরীক্ষা করে দেখেছে, এবং জানে যে, এ ছাড়া গত্যন্তর নেই!”
১৩. মহাপুরুষদর্শন-প্রসঙ্গে
স্বামীজী একদিন যে-সব মহাপুরুষকে তিনি দর্শন করিয়াছেন, তাহাদের প্রসঙ্গ করেন। সম্ভবতঃ নাগ মহাশয়ের কথা লইয়া ঐ প্রসঙ্গের অবতারণা হয়। নাগ মহাশয় এই সময়ের কয়েক সপ্তাহ পূর্বে (১৮৯৯ খ্রীঃ) বেলুড় মঠে স্বামীজীকে দর্শন করিতে আসেন। স্বামীজী বহুবার বলিতেন, “নাগ মহাশয় শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের এক অসাধারণ কীর্তি।” আমাদের নিকট স্বামীজী ভক্তির প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে নাগ মহাশয়ের জ্বলন্ত বিশ্বাসের কথা বর্ণনা করেন, কিভাবে তিনি ঈশ্বরকে ভালবাসিতে পারেন নাই বলিয়া নিজের জন্ম ও ভাগ্যকে ধিক্কার দিয়া অন্নজল ত্যাগ করেন। স্বামীজী আমাকে আরও বলেন যে, নাগ মহাশয় একবার জ্বালানী কাঠের অভাবে নিজের ঘরের খুঁটি কাটিয়া অতিথির জন্য রন্ধনের কাঠ হিসাবে ব্যবহার করেন।
ইহার পরেই সম্ভবতঃ সেই যুবকের প্রসঙ্গ আসিয়া পড়ে, যিনি শ্রীরামকৃষ্ণের স্পর্শলাভ করেন এবং তাহার পরে ‘প্রিয়নাথ’ শব্দ ব্যতীত আর কিছু বলিতে পারিতেন না। ঐ ঘটনার পর তিনি দশ বৎসর বঁচিয়া থাকেন, কিন্তু তাহার মুখে অবিরত ভগবানকে ঐরূপে সম্বোধন ব্যতীত আর কিছু শোনা যাইত না। শ্রীরামকৃষ্ণপদাশ্রিত সন্ন্যাসিগণ এমন বহু ব্যক্তির কথা জানেন, যাহারা তাহাদের গুরুদেবের জীবিতকালে দক্ষিণেশ্বরে আগমন করিয়া তাহার কৃপাম্পৰ্শলাভে তৎক্ষণাৎ সমাধি-অবস্থা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। বহুক্ষেত্রে এই ধরনের ঘটনা ব্যতীত ঐ সকল ব্যক্তির সম্বন্ধে আর কিছু কেহ জানিত না। এক মহিলা সম্পর্কে একথা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। তিনি গাড়ি করিয়া দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে আসেন। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে দেখিয়াই বলেন, আদ্যাশক্তির অংশে তাহার জন্ম। জগন্মাতাজ্ঞানে তিনি তাহাকে প্রণাম করিয়া ধূপধুনা ও পুষ্পচন্দনাদি দ্বারা পূজা করিবামাত্র ঐ মহিলা গভীর সমাধিস্থ হইয়া পড়েন। হয়তো ইহাতে বিস্ময়ের কিছু ছিল না, কিন্তু তাহার সমাধি কিছুতেই ভঙ্গ হয় না দেখিয়া সকলেই অতীব বিস্মিত হন। দুই-তিন ঘণ্টা পরে সমাধি ভঙ্গ হইল। শোনা যায়, সমাধি-অবস্থায় তাহার ভাবভঙ্গি মাতালের ন্যায় বোধ হইয়াছিল। যাহা হউক, শেষ পর্যন্ত সব ভালভাবে মিটিয়া গেল দেখিয়া সকলে আশ্বস্ত হয়, কারণ আশঙ্কা হইয়াছিল, হয়তো সমাধি-অবস্থা আরও দীর্ঘকাল স্থায়ী হইতে পারে, এবং সেক্ষেত্রে তাহার আত্মীয়স্বজনগণের (তাহারা যেখানেই থাকুন) চিন্তিত হইবার যথেষ্ট কারণ থাকিবে। অতঃপর সকলে মিলিয়া কালীমন্দির হইতে অপরিচিত মহিলার যাত্রার ব্যবস্থা করিয়া দিলেন। তাহার নাম কি, বাড়ি কোথায় ইত্যাদি প্রশ্ন করিবার কথা কাহারও মনে হয় নাই। তিনিও আর কখনও আসেন নাই। সুলক্ষণা, সাধ্বী, পুত্রবৎসলা রমণীকে মাতৃজ্ঞানে শ্রীরামকৃষ্ণের পূজা করিবার পরিচায়কস্বরূপ এই মনোহর উপাখ্যানের মতো এই রমণীর স্মৃতি রামকৃষ্ণসঙ্ঘের নিকট চির সমাদৃত। শ্রীরামকৃষ্ণ কি বলেন নাই, “এই রমণীর আদ্যাশক্তির অংশে জন্ম!”
