মনে মনে তিনি কোন একটি বিষয় লইয়া চিন্তা করিতেছিলেন, যাহার সহিত শ্লোকের এই অংশগুলি সংশ্লিষ্ট ছিল। ক্ষণকাল পরে সহসা তাহার গভীর চিন্তাভঙ্গ হইল এবং তিনি বলিলেন, “হাঁ, বুদ্ধ ঠিকই বলেছেন। কার্যকারণসম্পর্কই সর্বপ্রকার কর্মের মূল। পৃথক ব্যক্তিগত সত্তা বলে যা আমরা দেখছি তা নিশ্চয়ই ভ্রমাত্মক।” পরদিন প্রাতঃকালে তিনি চেয়ারে হেলান দিয়া বসিয়াছিলেন, আমার মনে হইতেছিল তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন, এমন সময়ে সহসা তিনি বলিয়া উঠিলেন, “দেখ তো, এক জীবনের স্মৃতিই যেন মনে হয়, লক্ষ লক্ষ বছরের কারাবাস; আবার লোকে পূর্ব পূর্ব জন্মের স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে চায়! এই জন্মেরই ধাক্কা কে সামলায় তার ঠিক নেই, আবার অন্য জন্ম!”
একদিন সকালে চা খাইবার পূর্বে আমাকে ডেকের উপর দেখিতে পাইয়া তিনি বলিলেন, “এইমাত্র আমি তুরীয়ানন্দের সঙ্গে রক্ষণশীল ও উদারনীতিক ভাবসম্পর্কে কথা বলছিলাম।” তারপরই তিনি গভীর ভাবে ঐ বিষয়ে আলোচনা আরম্ভ করিলেন।
“রক্ষণশীল ব্যক্তির একমাত্র আদর্শ বশ্যতাস্বকার। তোমাদের আদর্শ সংগ্রাম। সুতরাং আমরাই জীবনকে উপভোগ করে থাকি, তোমরা কখনো তা পার না। তোমরা সর্বদা চেষ্টা করছ, আদর্শটা বদলে একটা নূতন কিছু করবার, আর ঐ পরিবর্তনের লক্ষভাগের একভাগ ঘটবার পূর্বেই তোমরা ইহলোক পরিত্যাগ কর। পাশ্চাত্যবাসীর আদর্শ—উন্নতির জন্য একটা কিছু কর; প্রাচ্যবাসীর আদর্শ–নির্বিবাদে সহ্য করে যাও। কিছু করা এবং সহ্য করে যাওয়া—এই উভয়ের মধ্যে অপূর্ব সামঞ্জস্য-বিধান থাকলেই তা হবে সর্বাঙ্গসুন্দর জীবন। কিন্তু তা হওয়া অসম্ভব।
“আমাদের ধর্ম মেনেই নেয় যে, মানুষের সব বাসনা পূর্ণ হতে পারে না। জীবনে অনেক অপ্রীতিকর জিনিসকে সংযত করতে হবে। এটা অপ্রীতিকর সন্দেহ নেই, কিন্তু এর দ্বারাই শক্তি ও আলো পাওয়া যায়। উদারনীতিক ব্যক্তিগণ এর মন্দ দিকটাই দেখেন, এবং ভেঙেচুরে ফেলতে চান। কিন্তু পরিবর্তে তারা যা প্রবর্তন করেন, তাও তেমনি মন্দ এবং ঠিক ভাল ফল পেতে গেলে পুরানো প্রথায় আমাদের যতদিন লেগেছিল, নূতন রীতিনীতির সাহায্যে অগ্রসর হলে ঠিক ততদিন সময় লাগবে।
“পরিবর্তনের দ্বারা ইচ্ছাশক্তির বল বৃদ্ধি পায় না, বরং আরও দুর্বল ও পরনির্ভর হয়ে পড়ে। কিন্তু আমাদের সর্বদা সব জিনিস আত্মসাৎ করতে হবে—অর্থাৎ নিজের করে নিতে হবে। এর দ্বারা ইচ্ছাশক্তি প্রবলতর হয়ে ওঠে। আর জ্ঞাতসারে অথবা অজ্ঞাতসারে হোক, জগতে ইচ্ছাশক্তিই একমাত্র জিনিস, আমরা যার আদর করে থাকি। সমগ্র জগতের দৃষ্টিতে সহারণপ্রথা এত মহৎ কেন? তার কারণ ওর দ্বারা। ইচ্ছাশক্তির বিকাশ ঘটে।
“আমাদের স্বার্থপরতা বিসর্জন দিতে শিখতে হবে। আমি দেখতে পাই, যখনই জীবনে আমি কোন ভুল করেছি, তার একমাত্র কারণ—তাতে স্বার্থগন্ধ মিশ্রিত ছিল। যেখানে স্বার্থের কোন সংস্রব নেই, সেখানে আমার বিচারবুদ্ধি ঠিক লক্ষ্যস্থলে পৌঁচেছে।
“এই স্বার্থ না থাকলে জগতে কোন ধর্মমতই থাকত না। মানুষ নিজের জন্য যদি কিছু না চাইত, তাহলে তুমি কি মনে কর, সে প্রার্থনা, পূজা, আরাধনা প্রভৃতি কখননা করত? কখনো না। ঈশ্বর সম্বন্ধে সে চিন্তাই করত না বললে হয়। হয়তো কদাচ কখনো কোন সুন্দর স্বাভাবিক দৃশ্য অথবা অন্য কিছু দেখে একটু আধটু স্তুতিবাদ মাত্র করত। ঈশ্বর সম্পর্কে আমাদের ঐ রকম দৃষ্টিভঙ্গিই থাকা উচিত—কেবল গুণগান ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন। আমরা নিঃস্বার্থ হতে পারলেই তা সম্ভব, নচেৎ নয়।”
তিনি আবার বলিলেন, “তোমরা মনে কর, লড়াই করাটা শ্রীবৃদ্ধির লক্ষণ। এটা সম্পূর্ণ ভুল। অপরকে নিজের করে নেওয়াই প্রকৃত উন্নতির লক্ষণ। এ ব্যাপারে হিন্দুধর্ম সিদ্ধহস্ত। আমরা কোনকালে যুদ্ধবিগ্রহের ধার ধারিনি। অবশ্য গৃহপরিজন রক্ষার জন্য কখনো কখনো উত্তম মধ্যম দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের ছিল। কিন্তু যুদ্ধের জন্য যুদ্ধ করার পক্ষপাতী আমরা কদাচ ছিলাম না। প্রত্যেককেই তা শিক্ষা করতে হতো। সুতরাং এই সব আগন্তুক জাতির দল আসুক! নিজের নিজের পথে চলুক! কালচক্রের আবর্তনে সকলেই শেষে হিন্দুধর্মের অঙ্গীভূত হয়ে যাবে।”
তাহার মাতৃভূমি অথবা মাতৃরূপা হিন্দুধর্মকে মহাপ্রভাবশালী ব্যতীত অন্য কোনরূপ চিন্তা করিতে পারিতেন না। কোন নির্দিষ্ট পরিকল্পনা সম্পর্কে চিন্তা করিতে গিয়া বার বার তিনি স্বভাবগত খেয়ালী ভাষায় বলিয়া উঠিলেন, “হাঁ, একথা সত্য। ভারতে কোন ইউরোপীয় পুরুষ অথবা নারীকে কিছু করতে গেলে, তাঁকে কালা ভারতবাসীর অধীনেই তা করতে হবে।”
সমগ্র জাতি হিসাবে ভারত কি মহাকাৰ্য সাধন করিয়াছে, সে বিষয়ে তিনি যথেষ্ট চিন্তা করিতেন। মধ্যে মধ্যে বলিতেন, “দেখ, আমরা একটা জিনিস করেছি, যা অন্য কোন জাতি কখনো পারেনি। একটা সমগ্র জাতিকে আমরা দু-একটা ধারণার বশবর্তী করতে পেরেছি—যেমন গোমাংস বর্জন। কোন হিন্দু গোমাংস আহার করবে না।, এটা ইউরোপীয়দের বিড়ালের মাংস আহার না করার মতো নয়, কারণ গোমাংস প্রাচীনকালে এদেশের খাদ্য ছিল।”
একদিন তাহার জনৈক প্রতিপক্ষের সম্পর্কে আমরা আলোচনা করিতেছিলাম, এবং আমি বলি যে, তিনি তাহার সম্প্রদায়কে তাঁহার দেশের উর্ধ্বে স্থাপন করিয়া অন্যায় করিতেছেন। স্বামীজী সানন্দে উত্তর দিলেন, “এটা এশিয়ার লক্ষণ, এবং চমৎকার জিনিস। কেবল ব্যাপারটা যথার্থভাবে ধারণা করবার মতো তার মাথা নেই, এবং অপেক্ষা করবার ধৈর্যও নেই।” তারপরেই তিনি আপন মনে মা কালীর চিন্তায় ডুবিয়া গেলেন।
