আমাদের গুরুর আর্বিভাব এবং তিরোভাব উভয়ই আজ অতীতের ঘটনা, কিন্তু যে অমূল্য স্মৃতিসম্ভার তিনি অন্তরঙ্গগণের হৃদয়ে রাখিয়া গিয়াছেন, তাহার মধ্যে তাঁহার এই বিশ্বমানবপ্রেম অপেক্ষা মহত্ত্বর আর কিছুই নাই।
একদিন কোন ইউরোপীয় নরমাংসভোজন কোন কোন জাতির মধ্যে নিত্যকার ব্যাপার, এই উক্তি করিলে, তিনি যে ক্রোধ প্রকাশ করেন, তাহা কখনও ভুলিবার নয়। ঐ ব্যক্তির সমস্ত বক্তব্য শুনিবার পর তিনি বলেন, “এটা সত্য নয়। ধর্মভাবের প্রেরণায় পূজা উপলক্ষে বলিদান অথবা যুদ্ধে প্রতিহিংসা গ্রহণ, এই উভয় স্থল ব্যতীত কোন জাতি কোথাও নরমাংস আহার করে না। বুঝতে পারছনা, ওটা দলবদ্ধ বা সমাজবদ্ধ জীবদের রীতি নয়?
“ঐ প্রকার কার্যের দ্বারা সামাজিক জীবনের মূলোচ্ছেদ করা হবে যে!” এই কথাগুলি যখন বলা হয়, তখন পর্যন্ত ক্রপটকিনের “পারস্পরিক সাহায্য (Mutual Aid)” সম্পর্কে মূল্যবান পুস্তকখানি বাহির হয় নাই। বিশ্বমানবের প্রতি প্রেম এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার দেশকাল-অবস্থা অনুযায়ী বিচার করিবার স্বাভাবিক প্রেরণা স্বামীজীকে এই প্রকার গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।
তিনি লোকের ধর্মপ্রবণতার বিষয় আলোচনা করিতেছিলেন। সহসা বলিয়া ওঠেন, “অধিকাংশ ধর্মের মূলে স্ত্রী-পুরুষের পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ এবং বংশবৃদ্ধির আকাঙক্ষা বিদ্যমান। ভারতবর্ষে এই মত বৈষ্ণবধর্ম এবং পাশ্চাত্যে খ্রীস্টধর্ম রূপে অভিহিত। মৃত্যুকে, অথবা মা কালীকে উপাসনা করতে অতি অল্প লোকেই সাহসী হয়েছে। এস, আমরা মৃত্যুর উপাসনা করি। এস, আমরা ভয়ঙ্করকে ভয়ঙ্কর বলেই আলিঙ্গন করি, তাকে কোমল হবার জন্য প্রার্থনা করে নয়। এস, আমরা দুঃখের জন্যই দুঃখকে বরণ করি।”
সাগরসঙ্গমে উপস্থিত হইবার পর আমরা বুঝিতে পারিলাম, সমুদ্রকে কেন ‘কালাপানি’ (কালোজল) এবং নদীকে সাদাপানি বলা হয়। স্বামীজী বুঝাইয়া দিলেন, সমুদ্রের প্রতি হিন্দুদের প্রগাঢ় ভক্তিই তাহাদের উহাকে লঙ্ঘন করিয়া অপবিত্র করিতে বাধা দিয়াছে এবং তাহার ফলেই বহু শতাব্দী ধরিয়া সমুদ্রযাত্রাকে জাতিচ্যুত হইবার অপরাধ বলিয়া গণ্য করা হইয়া থাকে। জাহাজ নদীর সীমা অতিক্রম করিয়া প্রথম সাগর স্পর্শ করিবামাত্র স্বামীজী বলিলেন, “নমঃ শিবায়! নমঃ শিবায়! ত্যাগবৈরাগ্যভূমি পরিত্যাগ করে ভোগৈশ্বর্যভূমিতে পদার্পণ করতে চললাম!”
বড় হইতে গেলে বহু দুঃখভোগ সহ্য করিতে হয়, এবং কাহারও কাহারও অদৃষ্ট এইরূপ যে, ইহজগতের সকল সুখই জ্বলিয়া পুড়িয়া ভস্মে পরিণত হয়–এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করিয়া স্বামীজী বলিলেন, “সারা জীবনটাই দুঃখের বিনিময়ে অল্প সুখভোগ! এই কথাগুলি কখনও ভুলো না—মর্মান্তিক আঘাত পেলেই সিংহ ভীষণভাবে গর্জন করে ওঠে; মাথায় আঘাত পেলেই সাপ তার ফণা তুলে দাঁড়িয়ে ওঠে; তেমনি মানুষ নিদারুণ মর্মবেদনা পেলেই আত্মার বিপুল মহিমা প্রকাশ পায়।”
কখনও তিনি অসীম ধৈর্যসহকারে কোন প্রশ্নের উত্তর দিতেছেন, পরক্ষণেই ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক কল্পনা-জল্পনায় মাতিয়া উঠিতেছেন। আবার বার বার তাঁহার মন বৌদ্ধযুগের প্রতি আকৃষ্ট হইত, কারণ ভারতীয় ইতিহাসের সম্যক জ্ঞানলাভের জন্য প্রয়োজন বৌদ্ধযুগের সবিশেষ অধ্যয়ন।
একদিন তিনি বলেন, “বৌদ্ধধর্মের তিনটি যুগ-বিভাগ আছে—পিচশ বছর তন্ত্রপ্রাধান্য। মনে করো না যে, ভারতে কোনকালে বৌদ্ধধর্ম নামে কোন পৃথক ধর্ম ছিল, এবং তার নিজস্ব মন্দির ও পুরোহিত প্রভৃতি ছিল। মোটেই তা নয়! বৌদ্ধধর্ম চিরকাল হিন্দুধর্মেরই অন্তর্ভুক্ত! কেবল এক সময়ে বুদ্ধের প্রভাব একাধিপত্য লাভ করার ফলে সমগ্র জাতি সন্ন্যাসমার্গ অবলম্বন করেছিল।” বৌদ্ধধর্মের অভ্যুদয়ে কাশ্মীরের নাগগণ (যে সকল মহাসৰ্প কুণ্ডের অভ্যন্তরে বাস করে বলিয়া লোকের বিশ্বাস ছিল) বলপূর্বক দেবত্বপদবী হইতে বিচ্যুত হয়। পরবর্তী শীতকালে অত্যধিক শীত পড়ায় তাহারাই আবার বৌদ্ধসম্প্রদায়ের সিদ্ধপুরুষ হিসাবে বৌদ্ধধর্মের অঙ্গীভূত হইয়া যায় কি না—এই বিষয় লইয়া স্বামীজী আলোচনা করিতেছিলেন।
প্রসঙ্গতঃ সোমলতার কথা আসিয়া পড়ে। স্বামীজী বর্ণনা করিতে লাগিলেন কিভাবে ‘হিমালয়’-যুগের সহস্র বৎসর পর্যন্ত ঐ লতা ভারতের প্রতি গ্রামে প্রতি বৎসর রাজার ন্যায় অভ্যর্থনা লাভ করিত, এক নির্দিষ্ট দিনে গ্রামবাসিগণ সমবেতভাবে মহাসমারোহে উহাকে গ্রামের ভিতর লইয়া আসিত। আর এখন লোকে উহাকে চিনিতেও পারে না।
আবার তিনি শের শা সম্পর্কে বলিতে লাগিলেন—যিনি হুমায়ুনের রাজত্বকালে ত্রিশবৎসর ধরিয়া এক বিচ্ছেদ ঘটাইয়া দেন। “বাল্যকালে তিনি বাংলার পথে পথে দৌড়াদৌড়ি করিতেন”—এই কথা বলিবার সময় তিনি কিরূপ আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া উঠিয়াছিলেন তাহা এখনও আমার মনে আছে। তিনি এই বলিয়া প্রসঙ্গ শেষ করেন যে, চট্টগ্রাম হইতে পেশোয়র পর্যন্ত বিস্তৃত এ্যাণ্ড-ট্রাঙ্ক নামক রাজপথ, ডাক বিভাগের বন্দোবস্ত এবং সরকারী ব্যাঙ্কস্থাপন—প্রভৃতি শের শার কীর্তি। তারপর কয়েক মিনিট নীরব থাকিয়া তিনি গুরু গীতা হইতে আবৃত্তি আরম্ভ করিলেন
“গুরুব্রহ্মা গুরুবিষ্ণুগুরুদেবো মহেশ্বরঃ।
গুরুরেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ ॥”
***
“গুরুরাদিরনাদি গুরুঃ পরমদৈবত।
গুরোঃ পরতরং নাস্তি তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ ॥”
