বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে উপলব্ধ সত্যসমূহের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সমন্বয়সাধন লইয়া মহাপুরুষগণের মনে যে দ্বন্দ্ব চলিতে থাকে, পূর্বোক্ত ঘটনাগুলি সেই সম্পর্কে আমাদের কিছু কিছু আভাস দেয়। একদিকে জগন্মাতা, অন্যদিকে ব্রহ্ম। বহুদিন পূর্বে স্বামীজীর নিকট শোনা তাহার কথাগুলি মনে পড়ে, “ইন্দ্রিয় জ্ঞানের অস্পষ্ট কুহেলিকার মধ্যে দিয়ে দেখলে নির্গুণ ব্রহ্মই সগুণরূপে প্রতিভাত ইন। প্রকৃতপক্ষে এই উভয় ভাবের মধ্যে সমন্বয়সাধন করা যায় কি না সন্দেহ। একই সময়ে দুইটি ধারণা সমভাবে সত্য হইতে পারে না। এ-কথা সহজেই বোঝা যায় যে, অনুভূতির ক্ষেত্রে অবশেষে হয় শক্তিকে ব্ৰহ্ম হইতে হইবে, নতুবা ব্ৰহ্মই শক্তিতে পরিণত হইবে। উভয়ের মধ্যে একটিতে. অপরের মধ্যে বিলীন হইতে হইবে। কোনটি কাহার মধ্যে লয় প্রাপ্ত হইবে, তাহা বিশেষ ক্ষেত্রে সাধকের অদৃষ্ট ও পূর্বজন্মের সংস্কারের উপর নির্ভর করে।
আমার নিজের কথা বলিতে গেলে, পূর্বোক্ত কথাবার্তা আমার জীবনে এক নূতন যুগের সূচনা করিয়াছে। সেইদিন হইতে স্বামীজীর সকল আচরণে আমি লক্ষ্য করিয়া দেখিয়াছি, তিনি যেন অপর কাহারও নিকট দায়স্বরূপ প্রাপ্ত কোন বিশেষ কার্যভার বহন করিয়া আসিতেছেন। কালীমূর্তির ব্যাখ্যা করিতে অনুরোধ করিলে তিনি বলিতেন—মা যেন একখানি মহাগ্রন্থ; যাহা পাঠ করিয়া মানব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে; পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টাইয়া অবশেষে দেখে, উহাতে কিছুই নাই। আমার মনে হয় ইহাই চরম ব্যাখ্যা। ভারতের ভাবীযুগের বংশধরের একমাত্র উপাস্য হইবেন মা কালী। তাহার নাম লইয়াই মাতৃভক্ত সন্তানগণ নানা অভিজ্ঞতার শেষ সীমায় উপনীত হইতে সমর্থ হইবেন। তথাপি সর্বশেষে তাহাদের হৃদয়ে সেই সনাতন জ্ঞানের বিকাশ ঘটিবে, এবং প্রত্যেক মানব নিজ নিজ শুভ মুহূর্ত উদয় হইলে জানিতে পারিবে যে, সমগ্র জীবন ছিল এক স্বপ্নমাত্র।
গীতার সেই বেদতুল্য বাক্য কাহার স্মৃতিপথে না উদিত হয়?
“ন কর্মণামনারম্ভান্নৈষ্ক্ররম্যং পুরুষোহশ্নুতে।
ন চ সংন্যসনাদেব সিদ্ধিং সমধিগচ্ছতি ॥”
অর্থাৎ, কর্মের আরম্ভমাত্র না করিয়া কোন ব্যক্তিই নৈষ্কর্ম লাভ করিতে পারে না। শুধু কর্মত্যাগ করিলেই সিদ্ধি করতলগত হয় না। সেইরূপ আমরাও কি নিশ্চিতভাবে জানি না যে, এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়া না যাইলে অন্তিমে সত্যের সাক্ষাৎকার ঘটে না? শক্তির মাধ্যমে ব্রহ্মে উপনীত হইতে হইবেনূতন জীবন, নব নব জ্ঞান, বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়া, অদূর ভবিষ্যতের দ্বন্দ্ব-সংঘাত, জয়-পরাজয়ের মধ্য দিয়া অবশেষে আমরা সেই আত্মারূপী চিরধামে উপনীত হইব, যেখানে সব এক অখণ্ড সত্তারূপে বিরাজমান এবং শান্তিতে পরিপূর্ণ। যে আচার্যশ্রেষ্ঠকে আমি অনুসরণ করিয়া আসিয়াছি, তাহার জীবনের প্রতি যতই গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করি, ততই প্রতিদিন আমি অধিকতর স্পষ্টরূপে দেখিতে পাই যে, তিনি স্বয়ং অভিজ্ঞতারূপ মহাগ্রন্থের পৃষ্ঠাগুলি উল্টাইয়া যাইতেছিলেন, এবং অবশেষে শেষ শব্দটি পড়া হইয়া যাইবামাত্র শ্রান্ত শিশুর ন্যায় মাতৃক্রোড়ে শয়ন করিয়া মহাসমাধিতে মগ্ন হইলেন। আর তখনই তাঁহার জ্ঞান হইল, এই অনন্ত বৈচিত্র্যময় জীবন স্বপ্নমাত্র।
———
(১) কোথাও কোন দেবস্থানেই সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হইতে দেওয়া উচিত নহে। যে ব্যক্তি নিজের দেবস্থানের পবিত্রতা ও মাহাত্ম্যরক্ষার জন্য বদ্ধপরিকর না হয়, সে সকলের অশ্রদ্ধার পাত্র।
১২. দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
১৮৯৯ খ্রীস্টাব্দের ২০ জুন স্বামীজী ও তাহার গুরুভ্রাতা স্বামী তুরীয়ানন্দের সহিত এক জাহাজে আমি কলিকাতা ত্যাগ করিয়া লণ্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি, এবং ৩১ জুলাই প্রাতঃকালে লণ্ডনে উপনীত হই। কয়েক সপ্তাহ পরে স্বামীজী ইংলণ্ড পরিত্যাগ করিয়া আমেরিকা যাত্রা করেন এবং সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে আমি সেখানে আর একবার তাহার সাক্ষাৎলাভ করি। তাহার সহিত একই ভবনে অতিথিরূপে যে পাচ-ছয় সপ্তাহ এবং পর বৎসর (১৯০০ খ্রীস্টাব্দে) ব্রিটানিতে যে একপক্ষ কাল অতিবাহিত করি, তাহার পর আর দীর্ঘকাল ধরিয়া তাহার সহিত একত্র বাসের সুযোগ আমার ভাগ্যে ঘটে নাই। ১৯০০ খ্রীস্টাব্দের শেষভাগে তিনি ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন, কিন্তু আমি ১৯০২ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত পাশ্চাত্যেই অবস্থান করি। অতঃপর যখন ভারতবর্ষে আসিয়া পৌঁছিলাম, তখন যেন তাহার জীবননাট্যের শেষ দৃশ্যের অভিনয়ে উপস্থিত থাকিবার জন্য, তাহার শেষ আশীর্বাদ গ্রহণ করিবার জন্যই। এই দেড়মাসব্যাপী সমুদ্রযাত্রা আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা বলিয়া মনে করি। এই কালে স্বামীজীর সহিত মিশিবার যে-কোন সুযোগ উপস্থিত হইলে গ্রহণ করিতাম। অপর কাহারও সহিত একপ্রকার মিশিতাম না বলিলেই চলে। অবশিষ্ট সময় লেখা ও সূচীকর্মে কাটিত। এইরূপে দীর্ঘকাল অবিচ্ছিন্নভাবে তাহার অপূর্ব চরিত্র ও মনের সংস্পর্শ লাভে ধন্য হইয়াছিলাম। এ সম্পদের কি তুলনা হয়?
.
এই সমুদ্রযাত্রার প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত ভাব ও গল্পের একটা অবিরাম স্রোত চলিয়াছিল। কেহই জানিত না, কখন সহসা স্বামীজীর উপলব্ধির দ্বার উদঘাটিত হইবে, এবং তাহার ফলে আমরা জ্বলন্ত ভাষায় নূতন নূতন সত্যের বর্ণনা শুনিতে পাইব। প্রথম দিন অপরাছে আমরা ভাগীরথীবক্ষে জাহাজে বসিয়া কথাবার্তা বলিতেছি, এমন সময়ে সহসা তিনি বলিয়া উঠিলেন, “যত দিন যাচ্ছে, তত আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে, পৌরুষই (manliness) জীবনের সার বস্তু। এই আমার নূতন বার্তা। পাপ করবে, তাও যথার্থ মানুষের মতো কর। যদি দুষ্টই হতে হয়, তবে বড় রকমের দুষ্ট হও।” এই কথাগুলির সঙ্গে সঙ্গে আর একদিনের কথা মনে পড়িতেছে। আমি তাহাকে মনে করাইয়া দিই যে, ভারতে অপরাধীর সংখ্যা খুব অল্প। আমার দিকে ফিরিয়া দুঃখিত অন্তঃকরণে তিনি উত্তর দিলেন, “ঈশ্বরের ইচ্ছায় আমার দেশে যদি এর বিপরীত হতো! কারণ প্রকৃতপক্ষে এ ধর্মভীরুতা মৃত্যুর লক্ষণ!” শিবরাত্রির গল্প, পৃথ্বীরাজ, বিক্রমাদিত্যের বত্রিশ সিংহাসন, বুদ্ধ ও যশোধরার গল্প এবং অনুরূপ শত শত গল্প তিনি অবিরত বলিয়া যাইতেন। লক্ষ্য করিবার বিষয় এই যে, একই কাহিনী কদাপি দুইবার কেহ শোনে নাই। জাতিবিভাগ সম্পর্কে আলোচনা তো সর্বদাই ছিল; ইহা ব্যতীত ছিল অবিরত নানা চিন্তার বিশ্লেষণ ও পুনর্বিন্যাস; অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মপ্রণালী সম্পর্কে নানা কথা এবং সর্বোপরি দৃঢ়ভাবে আপামর জনসাধারণের পক্ষ সমর্থন; কদাপি এই প্রসঙ্গে তিনি বিরত হইতেন না। যাহাদের সমর্থন করিবার কেহ নাই, সেই দুর্বল ব্যক্তি অথবা জাতিকে রক্ষা করিবার জন্য সর্বদা অগ্রসর হইতেন, তাহাদের দোষ উদঘাটন করিয়া অধিকতর দুর্বল করিয়া ফেলিতেন না, শতমুখে তাহাদের গুণ বর্ণনা করিতেন।
