তথাপি এমন একদিন আসিল, যখন তিনি শক্তিপূজা সম্বন্ধে তাহার নিজের মত সুস্পষ্টরূপে জানাইয়া দিবার প্রয়োজন অনুভব করিলেন। আমার কালীঘাটে বক্তৃতা দিবার কথা ছিল। তিনি আমাকে জানাইলেন, আমার বিদেশীয় বন্ধুগণ যোগদান করিতে ইচ্ছা করিলে অন্য শ্রোতাদের মতো তাহাদিগকেও জুতা খুলিয়া যাইতে হইবে এবং মেঝের উপর বসিতে হইবে। সেই মহাপীঠে কাহারও জন্য যেন সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম না ঘটে। আমার উপরেই এই বিষয়টি দেখিবার ভার রহিল।(১)
এই কথা বলিয়া চলিয়া যাইবার পূর্বে তিনি আরও কিছুক্ষণ রহিয়া গেলেন। তারপর যেন একটু অনিচ্ছুকভাবে কর্ণেল হের রক্ষাকারী দেবগণ (Guardian Angels) নামক কবিতার উল্লেখপূর্বক বলিলেন, “ব্ৰহ্ম ও দেবদেবীগণ সম্পর্কে আমারও ঠিক ঐ মত। ব্ৰহ্ম ও দেবদেবীগণেই আমি বিশ্বাস করি। অন্য কিছুতে আমার বিশ্বাস নেই।”
স্পষ্টই বুঝা গেল, তাহার আশঙ্কা তাঁহার নিজের যেরূপ অসুবিধা হইয়াছিল, আমারও যুক্তির দ্বারা বুঝিতে গেলে সেইরূপ অসুবিধা ঘটিবার সম্ভাবনা—কোন এক বিশেষ অঙ্গের পূজাকে সর্বোচ্চ জানিয়া তাহার গুণগান, এবং বেদান্তের চরম ব্রহ্মবাদ এই উভয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান এক সমস্যা, এবং যুক্তি সহায়ে উহার সমাধান কঠিন। স্বামীজী জানিতেন না, অন্তরঙ্গ ভক্তগণের নিকট তিনি স্বয়ং ছিলেন এইসকল বিপরীতলক্ষণ বিশিষ্ট ধর্মের সমন্বয়স্থল, এবং তাহাদের প্রত্যেকটি যে সত্য তাহার সাক্ষিস্বরূপ। সুতরাং ঐ বিষয়টি চিন্তা করিতে করিতে তিনি যেন কিছুক্ষণ আপন মনেই কথা বলিতে লাগিলেন; কতকটা অসংলগ্ন, যেন কতকগুলি প্রশ্নের উত্তর দিতেছেন, নিজের মতটি সহজবোধ্য করিবার চেষ্টা করিতেছেন, তথাপি যেন নিজের অন্তরে কিছু দেখিয়া তাহাতেই অধমগ্ন, চেষ্টা করিয়াও উহার প্রভাব হইতে নিজেকে মুক্ত করিতে পারিতেছেন না।
অবশেষে বলিলেন, “ওঃ! মা কালী ও তার লীলাকে আমি কি ঘৃণাই করেছি! ছবছর ধরে ঐ নিয়ে সংগ্রাম করেছি, কিছুতেই তাকে মানবনা। শেষে কিন্তু আমাকে মানতেই হলো! শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব আমাকে তার কাছে উৎসর্গ করেছিলেন, আর এখন আমি বিশ্বাস করি, অতি সামান্য কাজেও সেই মা আমাকে পরিচালনা করছেন, আমাকে নিয়ে যা খুশি তাই করছেন!…বহুদিন তাকে মানব না বলে আমি জেদ করেছিলাম। ঠাকুরকে ভালবাসতুম কি না, তাই ছাড়তে পারিনি। তার অদ্ভুত পবিত্রতা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। তার অসাধারণ ভালবাসা প্রাণে প্রাণে অনুভব করেছি। তিনি কত বড় ছিলেন, তখন তা আমার ধারণা হয়নি।…সে সব পরে হয়–যখন আমি বশ্যতা স্বীকার করি। সে সময়ে আমি তাকে এক উদ্ভ্রান্ত-মস্তিস্ক শিশু বলে মনে করতাম—সব সময়ে বাজে খেয়াল দেখছেন! ও-সব আমি ঘৃণা করতাম। কিন্তু শেষে আমাকেও মা কালীকে মানতে হলো!
“কেন আমাকে মানতে হলো, তা অত্যন্ত গুহ্য ব্যাপার, জীবনে কাউকে তা আমি বলব না। তখন আমার অতি দুঃসময়।…মা সুবিধা পেলেন, আমাকে গোলাম করে ফেললেন। ঠাকুরের নিজের মুখের কথা, “তুই মায়ের গোলাম হবি।’ রামকৃষ্ণ পরমহংস আমাকে মায়ের হাতে সমর্পণ করলেন। …আশ্চর্য! ঐ ঘটনার পর তিনি মাত্র দুই বছর জীবিত ছিলেন, অধিকাংশ সময় আবার অসুখে ভুগছিলেন। ছ-মাস যেতে না যেতেই তার স্বাস্থ্যভঙ্গ হলো, সে প্রফুল্লতা কোথায় চলে গেল!
“জান, গুরু নানকেরও ঐ রকম হয়েছিল। তিনি অনুসন্ধান করেছিলেন, কে তার সেই শিষ্য, যার মধ্যে তিনি নিজের শক্তির সঞ্চার করবেন। নিজের পরিবারবর্গকে তিনি উপেক্ষা করে গেলেন তার সন্তানগণ যেন তার কাছে কিছুই নয়! অবশেষে সেই বালকের সন্ধান পেলেন, যাকে তিনি ঐ শক্তি গ্রহণের অধিকারী মনে করলেন। তাকে ঐ শক্তি দান করে তবে তিনি নিশ্চিন্ত হয়ে মরতে পেরেছিলেন।
“তুমি মনেকরছ, ভাবীযুগ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসকে মা কালীরই অবতার বলবে?, আমারও মনে হয়, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, মা তার নিজ প্রয়োজন সিদ্ধির উদ্দেশ্যে শ্রীরামকৃষ্ণশরীরে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
“দেখ, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, কোথাও এমন এক মহাশক্তি আছেন, যিনি নিজেকে প্রকৃতি-সত্তা বলে মনে করেন। তারই নাম কালী, তারই নাম মা!…আবার আমি ব্রহ্মেও বিশ্বাস করি।…কিন্তু এই রকমই সর্বদা হয় না কি? শরীর মধ্যস্থিত অসংখ্য কোষ (cells) মিলিত হয়েই এক ব্যক্তি সৃষ্টি করে না কি? এক নয়, বহু মস্তিষ্ককেন্দ্রই কি মনের অভিব্যক্তি ঘটায় না? বহু বৈচিত্র্যের মধ্যেই একত্ব—এই আর কি! তবে ব্রহ্মের বেলায় অন্যরূপ হবে কেন? ব্রহ্মই একমাত্র সৎ পদার্থ, তিনি অদ্বিতীয়, কিন্তু তিনিই আবার দেবদেবীতে পরিণত!”
অনুরূপভাবে কাশ্মীর-তীর্থযাত্রা হইতে প্রত্যাবর্তনান্তে তিনি বলিয়াছিলেন, “এই-সব দেবদেবী কেবল মনগড়া জিনিস নয়! ভক্তেরা যে-সকল ঈশ্বরীয় রূপ প্রত্যক্ষ করেছেন, সেই সব রূপই দেবদেবীর মূর্তি বলে গৃহীত হয়েছে।” শ্রীরামকৃষ্ণ সম্পর্কেও শোনা যায় যে, সমাধি হইতে উখিত হইবার পর কখন কখনও তাহার শরীর মন অবলম্বন করিয়া যিনি অবস্থান করিতেছেন, তাঁহার সম্পর্কে বলিতেন, “বাম ও কৃষ্ণরূপে যিনি অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তিনিই এখন (নিজ শরীর দেখাইয়া) এই শরীরে আবির্ভূত।” তারপর প্রধান শিষ্যের দিকে চাহিয়া হাসিতে হাসিতে বলিতেন, “কিন্তু, নরেন, তা বলে তোর বেদান্তের দিক দিয়ে নয়।”
