কোন কিছু লইয়া খুঁতখুঁত করার প্রতি তাঁহার আন্তরিক ঘৃণা ছিল। মন্দিরে পশুবলি সম্পর্কে অভিযোগ লইয়া একবার তাহার নিকট উপস্থিত হই। তিনি অনায়াসে বলিতে পারিতেন, আমাদের অনেকেই বলিদানের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ জানাইলেও নিজেদের রসনার পরিতৃপ্তির জন্য পশুহত্যায় বিন্দুমাত্র ইতস্ততঃ করি না। কিন্তু তিনি তাহার উল্লেখ করিলেন না। আধুনিক প্রথায় কসাই ও কসাইখানার যে দুর্গতি ঘটিয়াছে, যুক্তি দ্বারা তিনি তাহা প্রতিপন্ন করিতে পারিতেন, কিন্তু তাহারও উল্লেখ করিলেন না। আমার বিরুদ্ধ যুক্তিগুলির উত্তবে তিনি শুধু স্পষ্টভাবে বলিলেন, “চিত্রটি নিখুঁত করবার জন্য হলোই বা একটু রক্তপাত!” পরে তাহার এবং নিকটে উপবিষ্ট আর একজনশ্রীরামকৃষ্ণ-শিষ্যের নিকট হইতে উচ্চাঙ্গের কালীপূজার প্রকৃত তথ্যগুলি সংগ্রহ করিতে আমাকে বিলক্ষণ বেগ পাইতে হয়। প্রকৃত কালীপূজা বহু কৃচ্ছসাধ্য এবং সেখানে জীবহিংসার স্থান নাই। যাহা হউক, তিনি বলেন, মা কালীর অনুচর ভূতপ্রেতগণের উদ্দেশ্যে বলিদান বা রক্তপাত তাহার সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত। তাঁহার মতে উহা ভূতেপাসনা এবং ঐ বিষয়ে তাহার আদৌ সমর্থন নাই। তাহার নিরন্তর প্রচেষ্টা ছিল, অন্তর হইতে ভয় ও দুর্বলতা দূর করিয়া দিয়া যেমন মাধুর্য ও আনন্দের মধ্যে আপনা হইতেই জগজ্জননীর প্রকাশ দেখা যায়, সেইরূপ অশুভ, ভয়ঙ্কর, দুঃখ ও বিনাশের মধ্যেও তাহার প্রকাশ পাবণা করিতে শেখা। সুতরাং সেই মহান আদর্শকে ছোট করিয়া দেওয়া তিনি কোনক্রমেই সই। করিতে পারিতেন না। একদিন ভয়ঙ্করা মূর্তির পূজা এবং উহার সহিত একাত্বতালাভেব প্রসঙ্গে শান্তভাবে কথা বলিতে বলিতে তিনি সহসা উত্তেজিতভাবে বলিয়া উঠেন, “মুণ্ডমালা পরায়ে তোমায়, ভয়ে ফিরে চায়, নাম দেয় দয়াময়ী’। মুখ তারা!” এই কথা বলিবার সঙ্গে সঙ্গে শ্রোতার হৃদয়ঙ্গম হইল যে, ভূমিকম্প বা অগ্ন্যুৎপাতরূপে প্রকাশিত যে ঈশ্বর, তাঁহাকে ভাল না বাসিয়া যে ঈশ্বর দয়াময়, যিনি পালনকর্তা, শোকে-দুঃখে যাহার নিকট সান্ত্বনালাভ করা যায়, তাহার উদ্দেশে নিবেদিত যে পূজা, তাহার মূলে অহংজ্ঞানই বিদ্যমাণ বৃঝিতে পারিলেন, এই ধরনের পূজা হিন্দুরা যাহাকে প্রকৃতপক্ষে ’দোকানদারি’ বলিয়া অভিহিত করেন, তাহা ব্যতীত আর কিছুই নহে। উপলব্ধি করিলেন, মঙ্গলের মধ্যে তাহার যেরূপ প্রকাশ, অমঙ্গলের মধ্যেও সেইরূপ, এবং এই শিক্ষা পূর্বোক্ত শিক্ষা অপেক্ষা বহুগুণ নির্ভীক ও সত্য। দেখিলাম, কাঁচা আমির গণ্ডি অতিক্রম করিতে হইলে যে মনোভাব ও ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন, তাহা বস্তুতঃ দৃঢ়সঙ্কল্প, স্বামীজী কঠোর ভাষায় যাহা প্রকাশ করিয়াছেন, ‘জীবন না চাহিয়া মৃত্যুকে অনুসন্ধান করিতে হইবে, নিজেকে তরবারিমুখে নিক্ষেপ করিতে হইবে, চিরকালের জন্য ভয়ঙ্করা মূর্তির সহিত একাত্ম হইতে হইবে।’
নিজের ধারণাগুলি স্বামীজী কখনও শিষ্যদের উপর জোর করিয়া চাপাইবার চেষ্টা করিতেন না, কারণ উহা দ্বারা স্বাধীনতা বলিতে তাহার যে আদর্শ বা ভাব তাহার সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণ করা হইত। কিন্তু শিক্ষকরূপে আমার অতীত জীবনের অভিজ্ঞতার ফলে আমি স্পষ্টরূপে বুঝিয়াছিলাম যে, আমাকে ভারতীয়ভাবে চিন্তা করিবার অভ্যাস করিতে হইবে। ঐ ভাবধারায় ভারতের বিভিন্ন উপাসনা প্রণালীর বিশিষ্ট স্থান লক্ষ্য করিয়া আমি কতখানি বিস্ময়বিমূঢ় বোধ করিয়াছিলাম, তখ, অমরনাথ যাত্রার সহিত অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত থাকিয়া উহার সাক্ষ্য বহন করিতেছে। উহা কদাপি ভুলিবার নহে। সুতরাং যে ভাবে কোন ব্যক্তি কোন নূতন ভাষা শিক্ষা করিতে আরম্ভ করে, অথবা সম্ভবপর হইলে ইচ্ছাপূর্বক কোন নূতন জাতির মধ্যে জন্মগ্রহণ করিতে চেষ্টা করে, সেইভাবে আমি কালীপূজার রহস্য অনুধাবনের চেষ্টা করিতে লাগিলাম। এই চেষ্টার ফলেই আমি স্বামীজীর জীবন ও চিন্তাধারা কতকটা বুঝিতে সক্ষম হই। ধীরে ধীরে একটু একটু করিয়া আমি বুঝিতে পারিলাম। বলা বাহুল্য,ধর্মসংক্রান্ত ব্যাপারে স্বামীজী নিজে ছিলেন আজন্ম শিক্ষক, যদিও তিনি নিজে এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন না। যে চিন্তা নির্দিষ্ট রূপ লইবার চেষ্টা করিতেছে, তাহাকে তিনি কখনও বাধা দিতেন না। একদিন তাহার নিকট বসিয়া আছি, এমন সময়ে ঐ স্থানে একখানি কালী প্রতিমা আনীত হয়। প্রতিমার মধ্যে কোন একটি ভাব চকিতের মতো লক্ষ্য করিয়া আমি সহসা বলিয়া উঠিলাম, “স্বামীজী, হয়তো মা কালী সদাশিবেরই ধ্যানযোগে উপলব্ধ মূর্তিবিশেষ। তাই কি?” তিনি মুহূর্তের জন্য আমার দিকে চাহিলেন। পরে সস্নেহে বলিলেন, “বেশ, তাই হোক, তোমার নিজের ভাবেই ওটি প্রকাশ কর!”
.
আর একদিন আমাকে সঙ্গে লইয়া তিনি প্রবীণ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তাহার জোড়াসাঁকোর নির্জন বাড়িতে দর্শন করিতে যাইতেছিলেন। পূর্বরাত্রে একজনের জীবনের অন্তিমকালের দৃশ্য আমি প্রত্যক্ষ করি। যাত্রার পূর্বে স্বামীজী আমাকে ঐ বিষয়ে প্রশ্ন করেন। উত্তরে আমি সাগ্রহে বলি, “আমার হঠাৎ উপলব্ধি হইয়াছে, বিভিন্ন ধর্ম যেন বিভিন্ন ভাষা, আর আমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির সহিত তাহার নিজের ভাষাতেই কথা বলা উচিত।” তাহার সমগ্র মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। তিনি বলিয়া উঠিলেন, “হাঁ, একমাত্র শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসই এ কথা শিক্ষা দিয়ে গেছেন। একমাত্র তিনিই সাহস করে বলে গেছেন যে, আমাদের সকল লোকের সঙ্গে তাদের নিজ নিজ ভাষায় কথা বলা উচিত।”
