শ্রীরামকৃষ্ণ-সঙ্ঘের তিনি যে সংজ্ঞা নির্দেশ করেন, তাহাতেও ঐ উদ্দেশ্যই প্রকাশ পাইয়াছে—”প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শ্রেষ্ঠ আদর্শগুলির আদান-প্রদান ঘটানো ও ঐগুলি কার্যে পরিণত করা।” এই সংজ্ঞার পূর্ণতা ও ভারতের বর্তমান অবস্থায় উহার বিশেষ উপযোগিতা সময়ের সঙ্গে ক্রমশঃ বুঝা যাইতেছে। নিজস্ব মতবাদ লইয়া নিশ্চল থাকিলে চলিবে না; হিন্দুধর্মকে উহা প্রমাণ করিতে হইবে যে, সমগ্র আধুনিক উন্নতিকে আলিঙ্গন ও সাদরে গ্রহণ করিবার ক্ষমতা তাহার মধ্যে বিদ্যমান। ইহাই ছিল তাহার মনোভাব। হিন্দুধর্ম কতকগুলি বিভক্ত সম্প্রদায়ের সমষ্টিমাত্র নহে, পরন্তু এক অখণ্ড, সজীব এবং সকল ধর্মের মাতৃস্থানীয়; হিন্দুধর্ম হইতে উদ্ভূত সকল সম্প্রদায়কেই সে মাতার ন্যায় স্বীকার করিয়া লয়, কোন নূতন ধর্ম সম্পর্কে হিন্দুধর্ম নির্ভীক, যেখানেই হউক, সকল সন্তানের ভালবাসা লাভ করিবার জন্য উন্মুখ, প্রাজ্ঞ, অনুকম্পায় পূর্ণ, স্বপরিচালিত, সতত ক্ষমাশীলা এবং সকল প্রকার বিরোধ দূর করিয়া পরস্পরের মধ্যে সমন্বয় সাধনে তৎপর। সর্বোপরি, তাহার নিজের নির্দিষ্ট উপলব্ধি আছে এবং জগতের অন্যান্য জাতির নিকট প্রচার করিবার জন্য তাহার একটি বিশেষ বার্তাও আছে। কিন্তু হিন্দুধর্মকে এইরূপে প্রতিপন্ন করিবার জন্য স্বামীজী চারিত্রিক বল ব্যতীত অন্য কোন শক্তির উপর নির্ভর করিতেন না। একথা সত্য, তাহার নিজস্ব ধর্মমতরূপ মন্দির নির্মাণ করিয়া তোলাই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু উহার জন্য অনন্তকাল পড়িয়া রহিয়াছে, এবং জগতের স্বাভাবিক গতিও মনে হয় অনুকূল। এ বিষয়ে তাহার নিজের দায়িত্ব কেবল সুদৃঢ় ইষ্টক নির্বাচন। যাহারা নির্বাচিত হইত, তাহাদের তিনি বুদ্ধি, আকর্ষণ শক্তি অথবা শক্তির পরিমাণের দিকে দৃষ্টি রাখিয়া নির্বাচন করিতেন না; তাহার দৃষ্টি থাকিত একমাত্র সরল আন্তরিকতার প্রতি। একবার গ্রহণ করিবার পর তাহাদের সামনে তিনি একই আদর্শ স্থাপন করিতেন—মুক্তি নহে, ত্যাগ; আত্মানুভূতি নহে, আত্মত্যাগ। আবার ইহাও যেন অনেকটা মানুষের পক্ষ হইতে—ভগবানের নিকট নিবেদন নহে। তাহার শিষ্যদের নিকট তিনি দৃঢ়ভাবে মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপন করিতেন। শিষ্যগণের মধ্যে একজন যেন কদাপি মঠে একদিনের পুণ্য অনুষ্ঠানের কথা বিস্মৃত না হন। সেদিন তাহার জীবনের প্রথম উন্মেষরূপেই যেন স্বামীজী তাহাকে শিবপূজা করাইতে শিখান। অতঃপর ভগবান বুদ্ধের চরণে পুস্পাঞ্জলি প্রদানপূর্বক শুভ অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়। একজনকে লক্ষ্য করিয়া, তিনি যেন তাহার নিকট যে-কেহ উপদেশ লইতে আসিবে, তাহাকেই সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “যাও, যিনি বুদ্ধত্বলাভের পূর্বে পাচশতবার অপরের জন্য জন্মগ্রহণ ও প্রাণ বিসর্জন করেছিলেন, সেই বুদ্ধকে অনুসরণ কর!”
———
(১) এখানে বলা আবশ্যক যে, উক্ত বিদ্যালয়টি আমি যেরূপ ভাবিয়াছিলাম, তাহা অপেক্ষাও অস্থায়ী রকমের হইয়াছিল। ১৯০৩ খ্রীস্টাব্দের শরৎকালে সিস্টার ক্রিস্টিন নামে স্বামীজীর জনৈকা আমেরিকান শিষ্যা ভারতীয় স্ত্রীশিক্ষা কার্যের সমগ্র ভার গ্রহণপূর্বক প্রণালীবদ্ধভাবে উহার পরিচালনা করেন। একমাত্র তাহার চরিত্র, একনিষ্ঠতা ও উদ্যম আজ ইহার উন্নতির কারণ : ১৮৯৮হইতে ১৮৯৯ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত পরীক্ষামূলক ভাবে আমি যে বিদ্যালয়ের কার্য পরিচালনা কবি, তাহাতে বিশেষ শিক্ষালাভ আমারই হইয়াছিল।
(২) ইহার পূর্বে প্রধানতঃ একবাব চৌদ্দ বৎসর বয়সে কামারপুকুরে তিনি কিছুদিন রামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে বাস করেন।–অনুঃ
১১. শক্তিপূজা ও স্বামীজী
স্বামীজীর জীবনের এই অংশের যে পরিচয় আমি কিছুটা লাভ করিয়াছি, তাহার শক্তিপূজার উল্লেখ ব্যতীত উহার বিবরণ নিতান্তই অসম্পূর্ণ থাকিয়া যাইবে। আমি সর্বদা অনুভব করিয়াছি, তাহার আধ্যাত্মিক চেতনার মধ্যে দ্বিবিধ উপাদান ছিল। নিঃসন্দেহ, তিনি ছিলেন আজন্ম ব্ৰহ্মজ্ঞানী; শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস বারবার উহার উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। যখন তিনি আট বৎসরের বালক মাত্র, খেলা করিতে বসিয়াই তাহার মধ্যে সমাধিতে মগ্ন হইবার অন্তর্নিহিত শক্তির বিকাশ দেখা যায়। ধর্ম সম্বন্ধে তাহার মনের স্বাভাবিক গতি ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দার্শনিক ভাবাপন্ন; সাধারণতঃ ‘পৌত্তলিক’ বলিয়া অভিহিত ভাবের সম্পূর্ণ বিপরীত। যৌবনে, এবং খুব সম্ভবতঃ শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হইবার কিছুকাল পরে, তিনি সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের যথারীতি সদস্য হন। ইংলণ্ড ও আমেরিকায় তিনি এমন কিছু প্রচার করিয়াছেন বলিয়া জানা যায় না, যাহা কোন বিশেষ মূর্তি বা সাকার ভাবের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাহার নিকট ব্ৰহ্ম সাক্ষাৎকারই ছিল একমাত্র লক্ষ্য, অদ্বৈতদর্শন সর্বোত্তম মতবাদ, এবং বেদ ও উপনিষদ্ একমাত্র প্রামাণ্য গ্রন্থ।
.
কিন্তু ইহাও সত্য, সঙ্গে সঙ্গে ভারতবর্ষে জগন্মাতাবো।ধক ‘মা’ শব্দ সর্বদা তাহার মুখে লাগিয়া থাকিত। আমরা যেমন পারিবারিক জীবনে অত্যন্ত পরিচিত কাহারও সম্পর্কে কথা বলিয়া থাকি, জগন্মাতাকে তিনি ঠিক সেইভাবে উল্লেখ করিতেন। সর্বদা তিনি জগন্মাতার চিন্তায় তন্ময় থাকিতেন। জগন্মাতার অপর সন্তানগণের ন্যায় তিনি সব সময়ে শান্তশিষ্ট ছিলেন না। কখন কখনও দুষ্ট ও বিদ্রোহী হইয়া উঠিতেন, কিন্তু সকল সময়ে তাহারই অনুগত। শুভ অশুভ যাহাই ঘটুক সকলই জগন্মাতার ইচ্ছায়, অপর কাহাকেও তিনি দায়ী করিতেন না। কোন এক ভাব-গাম্ভীর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি তাহার এক শিষ্যকে একটি মাতৃ-প্রার্থনা শিখাইয়া দেন, ঐ প্রার্থনা তাঁহার নিজের জীবনে মন্ত্রশক্তির ন্যায় কার্য করিয়াছিল। তারপরে সহসা অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে শিষ্যের দিকে ফিরিয়া তিনি বলিয়া উঠিলেন, “আর দেখ, শুধু প্রার্থনা করা নয়, তাঁকে জোর করে ওটা পূরণ করাতে হবে। মায়ের কাছে ও-সব দীন-হীন ভাব চলবে না।” মধ্যে মধ্যে প্রায়ই তিনি হঠাৎ কোন নূতন বর্ণনার আংশিক অবতারণা করিতেন। মায়ের দক্ষিণ হস্ত বরাভয় প্রদানের জন্য উত্তোলিত, বামহস্তে ধৃত খড়গ। তন্ময়ভাবে দীর্ঘকাল চিন্তা করিতে করিতে সহসা তিনি বলিয়া উঠিতেন, “তার শাপই বর।” অথবা ভাবাবেগে কখনও কবির ভাষায় বলিতেন, “অন্তরঙ্গ ভক্তগণের নিভৃত হৃদয়কন্দরে মায়ের রুধিররঞ্জিত অসি ঝম করে। এঁরা আজন্ম মায়ের অসি-মুণ্ড বরাভয়করা মূর্তির উপাসক!” এই সময়ে আমি ‘জগন্মাতার বাণী (Voice of the Mother’) নাম দিয়া যে ক্ষুদ্র স্তোত্রটি রচনা ও প্রকাশ করি, তাহার প্রায় প্রত্যেকটি ছত্র ও বর্ণ তাহারই শ্রীমুখ হইতে এই সব মুহূর্তগুলিতে সংগৃহীত। তিনি সর্বদা বলিতেন, “আমি ভয়ঙ্কর রূপের উপাসক!” একবার বলিয়াছিলেন, “এ কথা মনে করা ভুল যে, সকলেই সুখের আশায় কর্মে প্রবৃত্ত হয়। বহুলোক আছে যারা জন্মাবধি দুঃখকে খুঁজে বেড়ায়। এস, আমরা ভয়ঙ্করা মায়ের জন্যই তার ভয়ঙ্করা মূর্তির উপাসনা করি।”
