কিন্তু ঠিক প্রয়োজনের মুহূর্তে এই ধরনের রহস্য কেহই আবিষ্কার করিতে পারে; তাহার সহজ কারণ হইল, নিজের মনের পরিধির যথেষ্ট বাহিরে নিজেকে লইয়া যাইবার অক্ষমতা, যাহাতে বুঝিতে পারা যায়, কেবল যে পৃথক পৃথক সংস্কার লইয়া অন্যেরা জন্মগ্রহণ করিয়াছে তাহা নহে, পরন্তু ঐ সকল সংস্কারের মূল্য সম্পর্কে তাহাদের জন্মগত পৃথক ধারণাও আছে।সৌভাগ্যক্রমে স্বামীজীকে লক্ষ্য করিয়া এবং তাহার মধ্যে অজ্ঞাতসারে যে পরস্পরবিরোধী ভাবের প্রকাশ ঘটিত, সেগুলি লইয়া মাথা ঘামাইয়া অবশেষে আমি এই তথ্য আবিষ্কারে সমর্থ হই, এবং ফলে বহু জিনিস আমার নিকট স্বচ্ছ হইয়া যায়। অন্যের অপেক্ষা তিনি বিশেষ অবহিত ছিলেন যে, চরিত্রই সব, অথবা তাহার ভাষায় “দেশাচার কিছুই নয়।” তথাপি যেসব আচার-ব্যবহারের সহিত তিনি ঘনিষ্ঠ পরিচিত ছিলেন, তাহাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও তাৎপর্য বর্ণনা করিতে গিয়া কেহই তাহার ন্যায় আত্মহারা হইয়া যাইত না। স্বদেশবাসীর আচার ব্যবহার তিনি কবির দৃষ্টিতে ও ভবিষ্যদ্রষ্টার কল্পনা-সহায়ে দেখিতেন। যে সকল জাতির নারীর মধ্যে বহুবিবাহ প্রচলিত, তাহাদের মধ্যেও আদর্শ নারীচরিত্র ও নিষ্ঠাব পরিচয় বিদ্যমান, এবং পাশ্চাত্য দেশের সান্ধ্য পরিচ্ছদেও যথেষ্ট রুচি ও লজ্জাশীলতার চিহ্ন দেখিয়াই তিনি উপলব্ধি করেন যে,”দেশাচার কিছুই নয়।” কিন্তু এই সব দেখিয়াও স্বদেশের লোকাঁচার বা অনুষ্ঠানের প্রতি তাহার শ্রদ্ধা হ্রাস পায় নাই। বিধবার নিরাভরণ শ্বেত অবগুণ্ঠন ছিল তাহার নিকট শোক এবং সেই সঙ্গে পবিত্রতার চিহ্ন। সন্ন্যাসীর কৌপীনবহির্বাস, মেঝের উপরে মাদুরের শয্যা, থালার পরিবর্তে কলাপাতায় ভোজন, হাত দিয়া আহার এবং জাতীয় পরিচ্ছদ পরিধান—এ সবই তাহার নিকট যথার্থ মহাপবিত্র বলিয়া বোধ হইত। ইহাদের প্রত্যেকটি তাহার নিকট কোন আধ্যাত্মিক শক্তি অথবা মানব হৃদয়ের কোমল ভাবের রহস্যপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করিয়া আনিত। তাহার কথায় এইগুলির প্রতি এরূপ নিষ্ঠা ও আনুগত্য প্রকাশ পাইত যে, মনে হইত, সম্ভব হইলে তিনি সমগ্র জগৎ জয় করিয়া উহাদের পদানত করিয়া দিতে প্রস্তুত, এবং ব্যর্থ হইলে ভাবিতেন, তাহাদের পরাজয়ে অংশ গ্রহণের মধ্যেই ইহজীবনের স্বর্গসুখ নিহিত।
আমাকেও তিনি এই মধুর সঙ্গীত গাহিতে শিখাইয়াছিলেন; সত্য বটে, ক্ষীণ ও কম্পিতকণ্ঠেতথাপি এই মহান সঙ্গীতের অপরাপর গায়কগণের সহিত কতকটা একসুরে। গাহিতে গাহিতে ঐ সঙ্গীতের মাধ্যমে আমি নিবিষ্টচিত্তে লক্ষ্য করিতে শিখিলাম, কেমন করিয়া একটি জাতির আদর্শ ও হৃদয় রহস্য উদঘাটিত হয়।
.
১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দের নভেম্বর হইতে ১৮৯৯ খ্রীস্টাব্দের জুন পর্যন্ত কয়েকটি মাস বেশ আনন্দে পূর্ণ ছিল। আমার ক্ষুদ্র বিদ্যালয়টি আরম্ভ হয় কালীপূজার দিন। শ্রীশ্রীমা স্বয়ং প্রতিষ্ঠাকালীন পূজাদি সম্পন্ন করিলেন। পূজান্তে তিনি মৃদুস্বরে বিদ্যালয়ের ভাবী ছাত্রীগণের উদ্দেশ্যে আশীর্বাণী করিলেন; গোলাপ-মা স্পষ্ট করিয়া উহা সমবেত সকলকে শুনাইয়া দিলেন, “শ্রীশ্রীমা প্রার্থনা করছেন, যেন এই বিদ্যালয়ের ওপর জগন্মাতার আশীর্বাদ বর্ষিত হয়, এবং এখান থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত মেয়েরা যেন আদর্শ বালিকা হয়ে ওঠে।” কেন জানি না, শ্রীশ্রীমায়ের উচ্চ মন ও হৃদয়ে এই আর কার্যের বিষয় বর্তমান আছে, এবং তিনি ইহার কল্যাণ কামনা করিতেছেন, এইটুকু জানাই আমার নিকট আশীর্বাদস্বরূপ, এবং হৃদয় ভরিয়া গিয়াছিল। ভবিষ্যতের শিক্ষিতা হিন্দু নারীজাতির পক্ষে শ্রীশ্রীমায়ের আশীর্বাদ অপেক্ষা কোন মহত্তর শুভ লক্ষণ আমি কল্পনা করিতে পারি না।
সাধারণতঃ স্বামীজী কলিকাতার বাহিরে তিন-চার মাইল দূরে গঙ্গার অপর তীরে অবস্থিত মঠে বাস করিতেন। কিন্তু প্রায়ই তিনি কলিকাতায় আসিতেন এবং প্রত্যেকবারই মধ্যাহে অথবা সন্ধ্যায় তাহার সহিত আহার করিবার জন্য আমাকে ডাকিয়া পাঠাইতেন। আমার প্রতি যাহারা অনুগ্রহ প্রকাশ করিতেন, তাহাদের তিনি সর্বদাই নিমন্ত্রণ করিয়া বেলুড় মঠে লইয়া যাইবার বিশেষ চেষ্টা করিতেন।
তাহার অতি সামান্য কার্যও অর্থপূর্ণ ছিল, যাহা নূতন লোকের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে। একদিন যখন তিনি আমাকে কোন একটি পথ্য প্রস্তুত করিয়া দিতে বলেন, আমি তখন স্বপ্নেও ভাবি নাই যে, ঐ অনুরোধের বিশেষ কোন উদ্দেশ্য ছিল। পরে যখন শুনিলাম, তাঁহার নিকট ঐ পথ্য লইয়া গেলে তিনি উহার সামান্য অংশ স্বয়ং গ্রহণ করিয়া বাকিটা উপস্থিত সকলের মধ্যে ভাগ করিয়া দিয়াছেন, তখন প্রকৃতই নিরাশ হইয়াছিলাম। এই কার্যের মধ্যে যে ধর্মানুষ্ঠানের একটা তাৎপর্য আছে, তাহা বুঝিতে পারি নাই। কী গভীর চিন্তা ও অনুকম্পার সহিত তিনি এবং তাহার পক্ষ হইয়া স্বয়ং শ্রীশ্রীমাও সর্বদা আমাকে হিন্দুসমাজে (আমি তো একজন বিদেশী) আশ্রয় দিবার জন্য চেষ্টা করিতেন, তাহা অনুধাবন করিতে আমার অনেক মাস লাগিয়াছিল। কাশ্মীরে তিনি আমাকে বলেন যে, তাহার সমগ্র জীবনের উদ্দেশ্য “খ্রীস্টীয় ও ইসলাম ধর্মের ন্যায় হিন্দু ধর্মকে সক্রিয় এবং অপরের উপর প্রভাবশালী করা” আর যে সকল উপায় অবলম্বনে তিনি ঐ উদ্দেশ্য কার্যে পরিণত করিবার চেষ্টা করিতেন, এইটি তাহার অন্যতম।
