শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী ও তাহার স্ত্রীভক্তগণের সঙ্গে আমি যে কয়মাস অতিবাহিত করি, তাহার মধ্যে গোপালের মা কখনও কলিকাতায় অবস্থান করিতেন, কখনও বা কয়েক সপ্তাহ কামারহাটিতেই কাটাইতেন। এক পূর্ণিমা রজনীতে আমরা কয়েকজন তাঁহাকে দর্শন করিতে যাই। ক্ষুদ্র নৌকাখানি যখন ধীর গতিতে অগ্রসর হইতে লাগিল, তখন গঙ্গাবক্ষে কি অপূর্ব লোভা! জলের মধ্য হইতে যে দীর্ঘ সোপানশ্রেণী উঠিয়া গিয়াছে, এবং উচ্চ মানের ঘাট, শম্পাবৃত প্রাঙ্গণ অতিক্রম করিয়া দক্ষিণের বারান্দা পর্যন্ত চলিয়া গিয়াছে,তাহারই বা কি সুন্দর শোভা! বারান্দার এক প্রান্তে গোপালের মার ক্ষুদ্র কক্ষ সম্ভবতঃ পার্শ্বে অবস্থিত বৃহৎ অট্টালিকার কোন কর্মচারীর জন্য প্রথমতঃ নির্মিত হইয়াছিল। এই ক্ষুদ্র কক্ষে গোপালের মা জপে মগ্ন থাকিয়া বহু বর্ষ কাটাইয়াছেন। বৃহৎ অট্টালিকা এখন জনশূন্য। গোপালের মার ছোট ঘরটিতে আসবাবপত্রের কোন বালাই নাই। ঘরের পাথরের মেঝেই তাহার শয্যা। অতিথিদের বসিতে দিবার জন্য যে মাদুর পাতিয়া দিলেন, তাহা তাকের উপব গুটানে ছিল। শিকায় ঝুলানো মাটির পাত্র হইতে মুড়ি ও বাতাসা পাড়িয়া খাইতে দিলেন। অতিথিদের সংবর্ধনা করিতে উহাই তাহার একমাত্র সম্বল। কিন্তু জায়গাটি নিখুঁতভাবে পরিষ্কার; তিনি নিজেই কষ্ট করিয়া গঙ্গাজল আনিয়া সর্বদা ধুইয়া রাখেন। হাতের কাছে কুলুঙ্গীতে একখানি অতি পুরাতন রামায়ণ, তাহার বৃহৎ জীর্ণ চশমা ও হরিনামের ঝুলি। এই মালা জপ করিয়াই গোপালের মা সিদ্ধিলাভ করেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন, কত দীর্ঘ বৎসর তিনি দিবারাত্র ঐ মালা জপে তন্ময় হইয়া থাকিতেন।
শুভ্র চন্দ্রালোকে বাহিরের নানাবিধ বৃক্ষ ও পুষ্পরাজিকে মনে হইতেছিল কাল কাল ছায়া মূর্তি—যেন শ্বেত মর্মরের স্বপ্নরাজ্যে তাহারা ধীরে ধীরে বিচরণ করিতেছে ও অস্ফুট স্বরে কথা বলিতেছে। কিন্তু আমাদের সদা কর্মব্যস্ত ও চঞ্চল জগতের মধ্যে গোপালের মার এই শান্ত, নীরব ক্ষুদ্র কক্ষটির চিন্তার ন্যায় আর কিছুই যেন স্বপ্নবৎ প্রতীয়মান হইতে পারেনা। ঐ স্থানটি আমরা দর্শন করিয়া আসিয়াছি শুনিয়া স্বামীজী বলিয়াছিলেন, “আহা! তোমরা প্রাচীন ভারতকে দেখে এসেছ, উপাসনা ও অশ্রুবর্ষণ, উপাসনা ও রাত্রিজাগরণ—সে ভারত চলে যাচ্ছে, আর কখনো ফিরে আসবে না।”
কলিকাতার বাড়িতে একজন ইউরোপীয় মহিলার অবস্থানে সম্ভবতঃ অপরের অপেক্ষা গোপালের মার আশী বৎসরের সংস্কারে বিশেষ আঘাত লাগিয়াছিল, ইহাতে অস্বাভাবিক কিছু নাই। কিন্তু একবার ঐ ভাবটিকে জয় করিবার পর তিনি যেন উদারতার প্রতিমূর্তি ছিলেন। রক্ষণশীল তিনি বরাবর ছিলেন, কিন্তু কখনও জেদ করিয়া কুসংস্কার ধরিয়া থাকিতেন না। আমাদের প্রতিদিন যে ভাবে কাটিত, তাহাতে গঙ্গাতীরে অবস্থিত তাহার আশ্রম ও মাতাঠাকুরানীর গৃহে পূজা অর্চনা প্রভৃতি দৈনন্দিন কর্মের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য তিনি বোধ করিতেন না। দিনগুলি ছিল শান্তি ও মাধুর্যে পূর্ণ। সূর্যোদয়ের বহু পূর্বেই সকলে নীরবে শয্যাত্যাগ করিতেন, এবং মাদুর হইতে চাদর ও বালিশ সরাইয়া রাখিয়া মালা হস্তে দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরাইয়া জপে বসিতেন। অতঃপর ঘর ঝাট দেওয়া ও স্নান আরম্ভ। বিশেষ বিশেষ দিনে শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী ও অপর একজন পালকি করিয়া গঙ্গাস্নানে যাইতেন, এবং তাহার পূর্ব পর্যন্ত রামায়ণপাঠে সময় অতিবাহিত হইত।
তারপর শ্রীশ্রীমা নিজের ঘরে পূজায় বসিতেন। অল্পবয়স্কা মেয়েরা দীপ জ্বালা, ধূপ-ধুনা দেওয়া, গঙ্গাজল আনা, এবং পুষ্প, নৈবেদ্য সাজানো প্রভৃতি কার্যে ব্যস্ত থাকিতেন। এমনকি, গোপালের মা পর্যন্ত এই সময়ে ফলমূল ও তরকারি কাটিয়া সাহায্য করিতেন। মধ্যাহ্নভোজনের পর অপরাহ্নে বিশ্রাম। তারপর সন্ধ্যা হইবামাত্র ঝি ঘরে ঘরে প্রদীপ দেখাইত, এবং সঙ্গে সঙ্গে আমাদের গল্পগুজব থামিয়া যাইত। সকলেই উঠিয়া পড়িতেন, এবং দেবমূর্তি অথবা পটের সামনে প্রণাম করিয়া গোপালের মা ও শ্রীশ্রীমার পাদবন্দনা করিতেন। অথবা ছাদে যেখানে তুলসীতলায় প্রদীপ দেওয়া হইয়াছে, সেখানে শ্রীশ্রীমার সঙ্গে যাইতেন। আর যিনি কন্যার ন্যায় শ্রীশ্রীমার সান্ধ্যধ্যানকালে পার্শ্বে বসিবার অনুমতি লাভ করিয়া তাহার গুরুপ্রণাম শ্রবণ করিতেন, তিনি সত্যই পরম ভাগ্যবতী! শ্রীশ্রীমার প্রতি পূজার প্রথমে ও অন্তে এই গুরুপ্রণাম থাকিত।
ভারতের পরিবারমাত্রই যেন সর্বদা প্রচলিত আচার-অনুষ্ঠানের মনোহর স্তোত্রগানে রত। তাহার নিকট গৃহস্থালীর প্রত্যেকটি তুচ্ছ কর্ম, বিস্তৃত প্রণালী, দৈহিক শুচিতার অভ্যাস যেন অনির্বচনীয় মূল্যবান ও পবিত্র; জাতির চিরন্তন সম্পদ, সুদুর অতীত হইতে পুরুষানুক্রমে অর্পিত, নিখুঁত অবস্থায় রক্ষা করিয়া উহাকে ভাবী যুগের হস্তে সমৰ্পণ করিতে হইবে। আদর্শ পবিত্রতার তীব্র আকাঙক্ষা ও মাতৃপূজার সহিত ওতপ্রোতভাবে জড়িত হইয়া এই চিন্তাপ্রণালী সমগ্র ভারতীয় চরিত্রের একাধারে পরিচালনা ও সংযত করার শক্তিরূপে পরিণত হইয়াছে। প্রাচ্য দেশ সরলতার উপাসক—এবং এই কারণেই কোন ইতরজনোচিত ভাব প্রাচ্য জাতির মধ্যে স্থান পাইতে পারে না।
