তথাপি তাহার জনৈক শিষ্যা সঙ্গীতে তাহার সহজাত ক্ষমতা সম্বন্ধে যাহা বলেন, বাস্তবিক তাহার প্রকৃতি সেইরূপ সঙ্গীতে ভরপুর’, কোমলতা ও কৌতুকে পূর্ণ। আর তাঁহার পূজার কক্ষটি সত্যই মাধুর্যে পূর্ণ।
শ্রীশ্রীমা পড়িতে জানেন, এবং তাহার অধিকাংশ সময় রামায়ণপাঠে অতিবাহিত হয়। তিনি লিখিতে পারেন না। কিন্তু কেহ যেন মনে না করেন, তিনি অশিক্ষিত স্ত্রীলোক মাত্র। দীর্ঘকাল ধরিয়া তিনি শুধু সংসার পরিচালনা এবং ধর্মজগৎ সম্পর্কে কঠোর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিয়াছেন তাহা নহে; ভারতবর্ষের অধিকাংশ স্থান তিনি ভ্রমণ করিয়াছেন এবং প্রায় সমস্ত প্রধান তীর্থগুলি দর্শন করিয়াছেন। আর মনে রাখিতে হইবে, শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিণীরূপে ব্যক্তিগত চরিত্রে যতখানি উৎকর্ষ লাভ সম্ভব, তিনি তাহার পূর্ণ সুযোগ লাভ করিয়াছিলেন। প্রতি মুহূর্তে তিনি অজ্ঞাতসারে এই মহাপুরুষ-সংসর্গের পরিচয় দিয়া থাকেন। কিন্তু কোন নূতন ধর্মীয় ভাব বা অনুভূতিকে মুহূর্ত মধ্যে হৃদয়ঙ্গম করিয়া লইবার ক্ষমতার মধ্যেই ইহার যেরূপ সুস্পষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায়, এমন আর কিছুতেই নহে।
কয়েক বৎসর পূর্বে একবার ঈস্টারের দিন অপরাহ্নে তিনি যখন আমাদের গৃহে পদার্পণ করেন, তখন আমি শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর মধ্যে এই শক্তির প্রথম পরিচয় পাই। ইতিপূর্বে যখনই তাঁহার নিকট গিয়াছি, জীবনে তিনি যে আদর্শ স্থাপন করিয়াছেন, তাহা আয়ত্ত করিবার চেষ্টায় একান্তভাবে তন্ময় থাকিতাম। বিপরীত অবস্থায় তাঁহাকে লক্ষ্য করিবার কথা ভাবি নাই। যাহা হউক, ঐ দিন শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী ও তাহার সঙ্গিনীগণ আমাদের সমস্ত বাড়িটি ঘুরিয়া দেখিবার পরে ঠাকুরঘরে গিয়া বসিবার এবং খ্রীস্টানদের এই উৎসবের অর্থ শুনিবার আগ্রহ প্রকাশ করেন। অতঃপর আমাদের ক্ষুদ্র ফরাসী অর্গ্যান সহযোগে ইস্টাব দিনের গান-বাজনা হইল। খ্রীস্টের পুনরুত্থানসম্পৰ্কীয় স্তোত্রগুলি বিদেশী এবং শ্রীশ্রীমার সম্পূর্ণ অপরিজ্ঞাত, তথাপি উহাদের সূক্ষ্ম মর্মগ্রহণ ও গভীর সহানুভূতি প্রকাশের মধ্যে আমরা সর্বপ্রথম ধর্মজগতে শ্রীসারদাদেবীর অসাধারণ উন্নতিলাভের এক অতীব হৃদয়গ্রাহী চিত্র দেখিতে পাইলাম। শ্রীরামকৃষ্ণের স্পর্শলাভে ধন্য শ্রীশ্রীমার অন্তরঙ্গ স্ত্রীভক্তগণের মধ্যেও কিছু পরিমাণে এই শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু তাহার শক্তির মধ্যে যে দৃঢ়তা ও নিশ্চয়তা আছে, তাহা কেবল উচ্চদরের সুগভীর পাণ্ডিত্যেই দেখা যায়।
আর এক সন্ধ্যায় তাহার এই বৈশিষ্ট্যের পরিচয় আমরা পাইয়াছিলাম। অল্প কয়েকজন অন্তরঙ্গ স্ত্রীভক্তপরিবৃত হইয়া তিনি বসিয়াছিলেন, এমন সময়ে আমাকে ও আমার গুরুভগিনীকে ইউরোপের বিবাহ-অনুষ্ঠান বর্ণনা করিতে বলেন। যথেষ্ট হাস্য ও কৌতুকের সহিত তাহার নির্দেশমতো আমরা একবার পুরোহিতের, পরক্ষণে বরকন্যার ভূমিকা অভিনয় করিয়া দেখাইলাম। কিন্তু বিবাহের শপথ বাক্য শ্রবণে মাতাঠাকুরানীর চিত্তে যে ভাবের উদয় হইল, তাহার জন্য আমরা কেহই প্রস্তুত ছিলাম না।
“সম্পদে-বিপদে, ঐশ্বর্যে-দারিদ্র্যে, রোগে-স্বাস্থ্যে—যাবৎ মৃত্যু আমাদের বিচ্ছিন্ন করে”—এই কথাগুলি শুনিয়া উপস্থিত সকলেই আনন্দ প্রকাশ করিয়া উঠিলেন। কিন্তু শ্রীশ্রীমার মতো অপর কেহই ঐ কথাগুলির যথার্থ মর্ম গ্রহণ করিতে পারেন নাই। বারংবার তিনি ঐ কথাগুলি আবৃত্তি করাইলেন এবং বলিলেন, “আহা, কি অপূর্ব ধমভাবের কথা! কি ন্যায়পূর্ণ কথা!”
শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর গৃহে এই সময়ে প্রায় সর্বদা যে সকল মহিলা বাস করিতেন—গোপালের মা, যোগীন-মা, গোলাপ-মা, লক্ষ্মীদিদি প্রভৃতি এবং আরও কয়েকজন তাহাদের অন্যতম। ইহারা সকলেই বিধবা; গোপালের মা এবং লক্ষ্মীদিদি আবার বালবিধবা ছিলেন; ইহারা সকলেই ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের সাক্ষাৎ শিষ্যা—যে সময়ে তিনি দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে বাস করিতেন সেই সময়ের। লক্ষ্মীদিদি ছিলেন তাহার ভ্রাতুস্পুত্রী, অপেক্ষাকৃত অল্পবয়স্কা। অনেকে তাহার নিকট দীক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করিয়া থাকেন। প্রকৃতই তিনি বিশেষ গুণসম্পন্না, এবং কথাবার্তার দ্বারা অপরকে আকৃষ্ট করিতে পারেন। কখনও তিনি কোন যাত্রার পালা হইতে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ধর্মভাবপূর্ণ কথোপকথন আবৃত্তি করেন, কখনও বা বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি নকল করিয়া নীরব কক্ষ হাস্যমুখরিত করিয়া তোলেন। একবার হয়তো কালীমূর্তি ধারণ করিলেন, পরক্ষণেই সরস্বতীমূর্তি, কখনও বা জগদ্ধাত্রী, আবার হয়তো বা কদম্বতলে শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি এবং নাটকীয় উপাদানের স্বল্পতা সত্ত্বেও ঐ সকলের দ্বারা বেশ আসর জমাইয়া তুলিতেন।
শুনা যায়, এই প্রকার আমোদ-প্রমোদ শ্রীরামকৃষ্ণেরও অনুমোদিত ছিল। স্ত্রীভক্তগণের নিকট শুনিয়াছি, তিনি নিজেই ধর্মমূলক কোন নাটক, ঘণ্টা পর ঘণ্টা আবৃত্তি করিয়া যাইতেন, পর্যায়ক্রমে নাটকের প্রত্যেক পাত্রের ভূমিকা অভিনয় করিয়া কাব্যনিহিত স্তব ও পূজার গৃঢ় মর্ম সমবেত সকলকে হৃদয়ঙ্গম করাইতেন।
গোপালের মা ছিলেন অতি বৃদ্ধা। পনের কুড়ি বৎসর পূর্বে যখন তিনি তাঁহার কামারহাটির গঙ্গাতীরে অবস্থিত কুটির হইতে একদিন মধ্যাহ্নে পদব্রজে দক্ষিণেশ্বব উদ্যানে শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রথম দর্শন করিতে আসেন, তখনই তিনি বার্ধক্যে উপনীত। শুনা যায়, শ্রীরামকৃষ্ণ নিজ কক্ষের দরজায় দাঁড়াইয়া তাহাকে অভ্যর্থনা করেন—যেন তিনি তাহার প্রতীক্ষায় ছিলেন। দীর্ঘকাল ধরিয়া গোপালের মা বালগোপাল মূর্তির উপাসনা করিতেন, শ্রীরামকৃষ্ণের সমীপবর্তী হইবামাত্র তাহার মধ্যে তিনি নিজের ইষ্টমূর্তি দর্শন করেন। এই বিষয়ে সর্বদা, তাঁহার কি অপবিসীম নিষ্ঠাই ছিল! শ্রীরামকৃষ্ণ তাহাকে মাতারূপে গ্রহণ করিয়াছিলেন, এবং ইহার পর গোপালের মা তাহার জীবিতকালে কদাপি শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রণাম করেন নাই। শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর উল্লেখকালে ‘বউমা’ ছাড়া তাহাকে অপর শব্দ প্রয়োগ করিতে শুনি নাই।
