সৌভাগ্যক্রমে এই ব্যাপারে স্বামীজীর প্রভাব সবার উপরে জয়ী হইল—এবং আমি সমাজে গৃহীত হইলাম। আট-দশ দিনের মধ্যেই অতি নিকটে একটি বাড়ি পাওয়া গেল। কিন্তু তখনও আমি প্রতি অপরাহু শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর ঘরেই কাটাইতাম। গ্রীষ্মকাল আসিলে তাহার বিশেষ আদেশে বিশ্রামের জন্য তাহার গৃহেই আসিতাম। সেখানে অপেক্ষাকৃত ভাল ব্যবস্থা ছিল। আমার জন্য আর পৃথক কক্ষ নির্দিষ্ট ছিল না, অপর সকলের সহিত শীতল ও সাদাসিধা ঘরটিতেই শয়ন করিতাম। পালিশ করা লাল মেঝের উপর সারি সারি মাদুর বিছানো, তাহার উপর এক-একটি বালিশ ও মশারি।
আমি যে পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হইলাম, তাহা এক অভূত ধরনের। একতলায় প্রবেশ পথে দুই দিকে দুটি ঘর ছিল। একটি ঘরে এক সাধু বাস করিতেন। যৌবনের প্রারম্ভ হইতে কঠিন তপস্যার ফলে ক্ষয় রোগে আক্রান্ত হইয়া পূর্ণ যৌবনেই তিনি মৃত্যুর দ্বারে উপস্থিত। বাংলা শিখিবার জন্য আমি তাহার ঘরে যাইতাম। পিছনের রন্ধন কক্ষে তাহার এক শিষ্য এবং এক ব্রাহ্মণ পাচক কাজকর্ম করিতেন। ছাদ ও বারান্দা সমেত সমস্ত উপরতলা আমাদের মেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। অদূরেই গঙ্গা; উপর তলা হইতে গঙ্গদর্শন হইত।
আমাদেব ক্ষুদ্র সংসারটির কী সম্বন্ধে কিছু বলিতে যাওয়া ধৃষ্টতা বলিয়াই মনে হয়। তাহার কথা সকলেই জানেন। পাঁচ বৎসর বয়সে তাহার বিবাহ হয়, কিন্তু বিবাহের পর আঠারো বৎসর(২) বয়স পর্যন্ত স্বামী তাহার কথা ভুলিয়া যান। পরে মাতার অনুমতি লইয়া পল্লীগ্রাম হইতে পদব্রজে গঙ্গাতীববর্তী দক্ষিণেশ্বরে কালীবাড়িতে স্বামিসকাশে উপস্থিত হইলে পতির দাম্পত্যবন্ধনের কথা স্মরণ হইল। কিন্তু তিনি জীবনের যে আদর্শ গ্রহণ করিয়াছেন তাহার কথা বলিলেন। পত্নীও প্রত্যুত্তরে দাতার সহিত তাহার ঐ জীবনে সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ কামনা করি কেবল শিষ্যার ন্যায় তাহার নিকট শিক্ষালাভের প্রার্থনা জানাইলেন। তাঁহার জীবনের এই সকল ঘটনা আমরা পুর্বে বহু বার শুনিয়াছি। তখন হইতে সেই উদ্যানেরই একটি গৃহে বহু বৎসর তিনি স্বামীর নিকট পতিতা স্ত্রীর ন্যায় বাস করেন। একাধারে ধর্মপত্নী ও সন্নাসিনী, আবার শ্রীরামকৃষ্ণ-শিষ্যগণের মধ্যে তিনিই সর্বদা সর্বশ্রেষ্ঠ। শিক্ষা-আরম্ভকালে তাহার বয়স ছিল অল্প; পরে কথাপ্রসঙ্গে কখন কখনও তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষাদান কত বিভিন্নমুখী ছিল তাহাব উল্লেখ কবিতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ সব জিনিস গুছাইয়া বাখাব পক্ষপাতী ছিলেন এবং নিতান্ত তুচ্ছবিষয়েও তাহাকে শিক্ষা দিতেন—যেমন প্রদীপ জ্বালিবার সাজসরঞ্জাম দিনের বেলায় কোথায় রাখিতে হইবে। কোন বিষয়ে অপরিচ্ছন্নতা তিনি সহ্য কবিতে পাবিতেন না, এবং উগ্র কঠোরতা সত্ত্বেও লালিত্য, সোন্দর্য ও চালচলনে শান্ত-গাম্ভীর্য পছন্দ করিতেন। শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর সম্বন্ধে এই কালের একটি গল্প শুনা যায়। একদিন তিনি আনন্দে উৎফুল্ল শিশুর ন্যায় আগ্রহ ও গর্বের সহিত একঝুডি ফলমূল শ্রীরামকৃষ্ণেব নিকট আনয়ন করিলে, তিনি গম্ভীরভাবে উহার দিকে চাহিয়া বলিলেন, “কিন্তু এত বেশি বেশি কেন?” অপ্রত্যাশিত নিরাশায় বালিকা পত্নীর সমস্ত আনন্দ অন্তর্হিত হইয়া গেল। “অন্ততঃ এ-সব আমার জন্য নয়” –এই মাত্র বলিয়া তিনি নীরবে অশ্রুপূর্ণ চক্ষে চলিয়া গেলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ কিন্তু এই দৃশ্য সহ্য করিতে পারিলেন না। নিকটে যে সব বালক বসিয়াছিল, তাহাদের দিকে ফিরিয়া বলিলেন, “ওকে ফিরিয়ে নিয়ে এস। ওকে কাঁদতে দেখলে আমার ঈশ্বরভক্তি পর্যন্ত উড়ে যাবে।”
তিনি তাহার এত প্রিয় ছিলেন! তথাপি শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানীর একটি উল্লেখযোগ্য গুণ এই যে, তাহার আরাধ্য পতির সম্পর্কে কথা বলিবার সময় তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক করিয়া রাখেন তিনি যেন কেহই নহেন। তাহার সকল ভক্তই বলেন যে, শ্রীরামকৃষ্ণের প্রত্যেকটি বাক্য যে সত্য হইবে, এ বিষয়ে শ্রীশ্রীমা সম্পদে-বিপদে ‘অটল সুমেরুবৎদৃঢ়। গুরুদেব শ্রীগুরু’ বলিয়া তিনি তাহার উল্লেখ করেন, তাহার কথাবার্তায় এমন একটি শব্দ কদাপি থাকে না, যাহাতে, ‘আমি তাহার অমুক’ এই বলিয়া কোন আত্ম-অধিকার প্রকাশ পায়। তাহার পরিচয় জানে না, এমন কেহ তাহার কথাবার্তা হইতে বিন্দুমাত্র অনুমান করিতে পারিবে না যে, উপস্থিত অপর সকলের অপেক্ষা শ্রীরামকৃষ্ণের উপর তাহার অধিকতর স্বত্ব বা দাবী আছে, অথবা তাহাদের অপেক্ষা তাঁহার সম্পর্ক নিকটতর। মনে হয়, পূর্বের ন্যায় পত্নীর নিষ্ঠাটুকু ব্যতীত পত্নীভাব তাহার মধ্য হইতে বহুকাল চলিয়া গিয়াছে—সেখানে আছে শুধু ‘আমি শিষ্যা’ এইভাব। তথাপি সকলে তাহাকে এরূপ প্রগাঢ় ভক্তি করিয়া থাকেন যে, তাহার সহিত একত্র ভ্রমণকালে রেলগাড়িতে কেহই তাহার বেঞ্চির উপরের বার্থে আরোহণ করিবেন না। একটি মাত্র দৃষ্টান্ত এখানে উল্লেখ করা হইল। তাহার উপস্থিতিই সকলের নিকট পরম পবিত্রতাস্বরূপ।
আমার সব সময় মনে হইয়াছে, তিনি যেন ভারতীয় নারীর আদর্শ সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণের শেষ বাণী। কিন্তু তিনি কি একটি পুরাতন আদর্শের শেষ প্রতিনিধি, অথবা কোন নূতন আদর্শের অগ্রদূত? তাহার মধ্যে দেখা যায়, অতি সাধারণ নারীরও অনায়াসলভ্য জ্ঞান ও মাধুর্য; তথাপি আমার নিকট তাহার শিষ্টতার আভিজাত্য ও মহৎ উদার হৃদয় তাহার দেবীত্বের মতোই বিস্ময়কর মনে হইয়াছে। কোন প্রশ্ন যত নূতন বা জটিল হউক না কেন, উদার ও সহৃদয় মীমাংসা করিয়া দিতে তাহাকে ইতস্ততঃ করিতে দেখি নাই। তাহার সমগ্র জীবন একটানা নীরব প্রার্থনার মতো। তাহার সকল অভিজ্ঞতার মূলে আছে বিধাতার মঙ্গলময় বিধানে বিশ্বাস। তথাপি তিনি সর্বপ্রকার পারিপার্শ্বিক অবস্থার উর্ধ্বে বিরাজ করেন। তাহার পরিবারের কেহ যদি দুবুদ্ধিবশতঃ তাহাকে পীড়ন করে, তবে তাহার মধ্যে এক অদ্ভুত শান্ত ও প্রগাঢ়ভাব প্রকাশ পায়। তাহার বুদ্ধির অতীত কোন নূতন সামাজিক ব্যবস্থা হইতে উদ্ভূত জটিল চক্রে আবর্তিত অথবা উৎপীড়িত হইয়া কেহ যদি তাহার নিকট আসে, তিনি তৎক্ষণাৎ অভ্রান্ত অন্তদৃষ্টিসহায়ে প্রকৃত তথ্য হৃদয়ঙ্গম করিয়া প্রশ্নকর্তাকে বিপদ হইতে উদ্ধারের পথ নির্দেশ করেন। যদি কোন কারণে কঠোর হইবার প্রয়োজন হয়, অর্থহীন ভাবপ্রবণতার দ্বারা তিনি কদাপি বিচলিত হইয়া ইতস্ততঃ করিবেন না। কোন ব্রহ্মচারীকে মাধুকরী করিয়া এত বৎসর কাটাইতে হইবে বলিয়া আদেশ দিলে, তাহাকে এক ঘণ্টার মধ্যে সে স্থান ত্যাগ করিতে হইবে। কোন ব্যক্তি তাহার সামনে শ্লীলতার ও মর্যাদার সীমা অতিক্রম করিলে আর কখনও তাহাকে মুখ দেখাইতে পারিবে না। এই ধরনের অপরাধ করিয়াছিলেন এমন এক ব্যক্তিকে শ্রীরামকৃষ্ণ বলিয়াছিলেন, “দেখতে পাচ্ছ না, তুমি ওর নারীত্বকে আঘাত করছ? এরূপ করা মহা অনর্থকর।”
