১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দের নভেম্বর মাসের প্রথম দিকে কলিকাতায় আসিবার পরে স্বামীজীর শিষ্যারূপে আমি যে জগতের মধ্যে প্রবেশ করিলাম, তাহার সম্বন্ধে আমার ক্রমলব্ধ অভিজ্ঞতা কতকটা পূর্বোক্ত ধরনের। ঐ দিন হইতে পরবর্তী জুলাই মাস পর্যন্ত আমি তাঁহাকে সর্বদা তাঁহার স্বদেশবাসিগণের মধ্যেই দেখিতে পাইতাম। এমনকি, সেখানে কোন ভক্ত ইউরোপীয় পরিবারের ব্যবধান পর্যন্ত ছিল না। আমিও তাঁহাদের একজন বলিয়া গণ্য হইলাম, এবং স্বামীজীর প্রতিভাসৃষ্ট অনুকূল পরিবেশের মধ্যে বাস করিতে লাগিলাম। এইরূপে, প্রতিপদে তাহারই ভাবরাজি দ্বারা পরিবৃত, তাঁহারই প্রগাঢ় স্বজাতিপ্রেমের দ্বারা প্রভাবিত হইয়া আমি যেন কোন দেবলোকের স্নিগ্ধ জ্যোতির মধ্যে বিচরণ করিতে লাগিলাম, যেখানে প্রত্যেক নরনারীর আকৃতি তাহাদের স্বভাবের অপেক্ষা বড় হইয়া দেখা দিত।
প্রথম হইতেই স্থির ছিল যে, যত শীঘ্র সম্ভব সুবিধামত, আমি কলিকাতায় একটি বালিকা বিদ্যালয় খুলিয়া দিব। স্বামীজীর কার্যপ্রণালীর বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, কার্য আরম্ভ করিবার জন্য কোনরূপ তাড়া না দিয়া ভ্রমণ এবং মানসিক প্রস্তুতির জন্য তিনি আমাকে যথেষ্ট অবকাশ দিয়াছিলেন। আমি বেশ জানিতাম, বিদ্যালয়টি খোলা হইলে উহা প্রথমে সাময়িক ও পরীক্ষামূলক হইবে। আমাকে প্রথমে মেয়েদের প্রয়োজন সম্পর্কে জানিতে হইবে, আমার স্থান কোথায় তাহা নির্ধারণ করি৩ হইবে, এবং যে সমাজের উন্নতিকল্পে আমার সমগ্র প্রচেষ্টা প্রয়োগ করিব, তাহার সম্বন্ধেও বিশেষ জ্ঞান প্রয়োজন। একটি মাত্র জিনিস আমার জানা ছিল, তাহা হইল, শিক্ষাসংক্রান্ত সকল প্রচেষ্টা অবশ্যই শিক্ষার্থীর বিদ্যাবুদ্ধি অনুযায়ী আরম্ভ হওয়া চাই; এবং যাহাতে সে নিজের ভাবে উন্নতি করিতে পারে, সেজন্য তাহাকে সাহায্য করিতে হইবে। আমাকে শিক্ষাবিষয়ক এমন একটি উপায় আবিষ্কার করিতে হইবে, যাহা ভারতীয় নারী-সমাজের আধুনিক শিক্ষার যথার্থ উপযোগী এবং সর্বাবস্থায় কার্যকরী হয়। ইহা ব্যতীত আমার কোন নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অথবা প্রত্যাশা ছিল না।(১)
সম্ভবতঃ অনেকে এ বিষয়ে আমার অপেক্ষা অনেক বেশি চিন্তা করিয়াছিলেন; এবং প্রায়ই শুনিতাম, সকল সম্প্রদায়ের গণ্ডির উর্ধ্বে থাকাই আমার পক্ষে বাঞ্ছনীয়। কিন্তু একদিন সন্ধ্যাকালে কাশ্মীরে বেরনাগ বনের তাঁবুতে এই সকল প্রশ্নের শেষ মীমাংসা হইয়া গেল। আমরা একখানা জ্বলন্ত গুড়ির চারিপাশে উপবিষ্ট ছিলাম, সহসা স্বামীজী আমার দিকে তাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “বিদ্যালয় সম্পর্কে এখন তুমি কি করবে ভাবছ?” আমি সাগ্রহে উত্তর দিলাম, “আমি চাই আমার কোন সহকারী না থাকেন। অতি সামান্যভাবে কাজের আরম্ভ হবে, এবং ছোট ছেলেমেয়ে যেমন বানান করে পড়তে শেখে, আমিও ক্রমে ক্রমে নিজের প্রণালী ঠিক করে নেব। তাছাড়া, আমার ইচ্ছা, এই শিক্ষার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ধর্মভাব থাকে। আমার মনে হয়,সাম্প্রদায়িক ভাব বিশেষ উপকারী।”
স্বামীজী মনোযোগ দিয়া সব কথা শুনিলেন এবং মানিয়া লইলেন; এবং যেহেতু আমার কোন ইচ্ছাতে তিনি কখনও বাধা দিতেন না, এখানেও তাহাই হইল। অতঃপর তিনি যেন আমার শিষ্য এবং আমি তাহার শিক্ষক হইলাম! কেবল একটি বিষয়ে তিনি দৃঢ় রহিলেন। ভারতীয় নাবীগণেব যে শিক্ষাকার্যে তাহার নাম জড়িত থাকিবে, আমি ইচ্ছামত তাহা সাম্প্রদায়িক করিতে পারি—আমার উক্তির এই অংশের উওব তিনিকেবল বলিলেন, “একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মাধ্যমে তুমি সকল সম্প্রদায়ের বাইরে যেতে চাও।” একজন মহিলা আমার কার্যে সাহায্য করিতে প্রস্তুত ছিলেন কিন্তু তাহার সম্বন্ধে আমি বিন্দুমাত্র ইতস্ততঃ করিবামাত্র তিনি সে নাম প্রত্যাহার করিয়া লইলেন। কিন্তু ইতিপূর্বে যে অল্প কয়েকজনের সহিত আমার পরিচয় ঘটিয়াছিল, তাহাদের সহায়তা লইবার প্রস্তাব তিনি কিছুতেই সমর্থন করিলেন না। ভাবতীয় চরিত্রের সমুদ্রতুল্য গভীরতা মাপ করিবার কোন যন্ত্র তখনও পর্যন্ত আমার নিকট ছিল না, সুতরাং প্রথম হইতেই ভুল করা অপেক্ষা কাহাবও সাহায্য না লইয়া অগ্রসর হওয়া তাহার মতে শতগুণ নিরাপদ।
এই পরিকল্পনা কার্যে পরিণত করিবার জন্য আমি নভেম্বর মাসের প্রথমে একাকী কলিকাতায় পৌঁছিলাম। স্টেশন হইতে শহবের উত্তর প্রান্তে রাস্তা চিনিয়া যাইতে সমর্থ হইলাম। যাহারা দ্বীপে বাস করেন, তাহারা স্বভাবতই কতকটা সামাজিক কঠোরতার পক্ষপাতী। বোধ হয় সেই কারণে আমি মহিলাগণের সহিত এক বাস করিবার জন্য জেদ করিতে লাগিলাম। ঘটনাক্রমে, স্বামীজী সেই সময় কলিকাতায় এক বিশিষ্ট ভক্তের গৃহে অবস্থান করিতেছিলেন। তাহারই মাধ্যমে কথাবার্তা চলিতে লাগিল। শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিণী সারদা দেবী’ অথবা ভক্তগণের পরমারাধ্যা শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী স্ত্রীভক্তগণসহ নিকটে বাস করিতেন। সেইদিনই আমি তাহার নিকট একটি কক্ষে বাস করিবার অনুমতি লাভ করি। আমাদের জীবনে এমন কতকগুলি ঘটনা ঘটে, যাহাদের প্রতি বহুদিন পরে পিছন ফিরিয়া তাকাইলে বুঝিতে পারা যায় যে, তৎকালীন সাহস আমাদের অজ্ঞতারই ফল। বলা যায়, ইহা বিধাতারই কৃপা। কারণ, ইহা ব্যতীত অন্য কোন প্রকারে ঐ সকল সমস্যার সমাধান হওয়া কঠিন ছিল। আবার একটা কিছুসমাধান করা ব্যতীত গত্যন্তরও ছিল না। তথাপি, যদি আমি ঐ সময় যথার্থ হৃদয়ঙ্গম করিতাম যে, আমার এই হঠকারিতা কেবল আমার নিরপরাধ আশ্রয়দাত্রীকে নহে, পরন্তু সুদূর পল্লীগ্রামে তাহার আত্মীয় কুটুম্বগণকেও সামাজিক গোলযোগের মধ্যে ফেলিবে, তাহা হইলে আমি কখনই ঐরূপ আচরণ করিতাম না। সেরূপ ক্ষেত্রে আমি যেভাবে হউক, ঐ সঙ্কল্প হইতে নিবৃত্ত হইতাম। কিন্তু যেহেতু আমার ধারণা ছিল, জাতিভেদ ব্যক্তিগত নির্বোধ কুসংস্কার মাত্র—বিদেশী মাত্রেই অনাচারী, এইরূপ ভ্রান্ত ধারণাই উহার কারণ, এবং প্রকৃত সত্যের উদঘাটনে উহার অবসান হইবে—অতএব সব অজ্ঞতা তাহার উপর চাপাইয়া হৃষ্টচিত্তে জোর করিয়া আমি এই ভারতীয় মহিলার গৃহে অতিথি হইলাম।
