এই গানটি তিনি বহুক্ষণ ধরিয়া বার বার গাহিলেন। গানের সঙ্গে সঙ্গে সেই ভক্তজন চিত্তহারিণী শ্যামা মায়ের মূর্তি আমাদের মনে উজ্জ্বল হইয়া উঠিতে লাগিল।
নিজের কবিতা হইতে তিনি আবৃত্তি করিলেন–
“দুঃখরাশি জগতে ছড়ায়,
নাচে তারা উন্মাদ তাণ্ডবে; মৃত্যুরূপা মা আমার আয়!
করালি! করাল তোর নাম, মৃত্যু তোর নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে;
তোর ভীম চরণ-নিক্ষেপ প্রতিপদে ব্রহ্মাণ্ড বিনাশে।”
মাঝখানে তিনি থামিয়া বলিলেন, “দেখেছি, সব বর্ণে বর্ণে সত্য!”–
“সাহসে যে দুঃখ দৈন্য চায়, মৃত্যুরে যে বাধে বাহুপাশে,
কাল-নৃত্য করে উপভোগ, মাতৃরূপা তারি কাছে আসে।”
“মা সত্যসত্যই তার কাছে আসেন। আমি নিজ জীবনে এটি প্রত্যক্ষ করেছি। কারণ, আমি মৃত্যুকে সাক্ষাত্তাবে আলিঙ্গন করেছি!”
ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে তিনি কথা বলিলেন। বলিলেন, “গঙ্গাতীরে মৌনী কৌপীনমাত্রধারী পরিব্রাজকজীবন যাপন ছাড়া আর কোন কামনা নেই। আব কিছুরই আমার প্রয়োজন নেই। স্বামীজী চিরদিনের মতো মরে গেছে। আমি কে যে জগৎকে শিক্ষা দেবার দায়িত্ব আমার বলে মনে করছি? এ কেবল বৃথা আস্ফালন ও অহঙ্কার। জগন্মাতার আমাকে কোন প্রয়োজন নেই আমারই জগন্মাতাকে প্রয়োজন। এই অবস্থা যিনি উপলব্ধি করেছেন, তার কাছে নিষ্কাম কর্মও মায়া ব্যতীত আর কিছু নয়।
“প্রেমই একমাত্র পথ। লোকে যদি আমাদের প্রতি অন্যায় করে থাকে, তাহলেও আমাদের তাদের ভালবেসে যেতে হবে, অবশেষে তারা এই ভালবাসায় বশ না হয়ে থাকতে পারবে না। এই আর কি।”
.
তথাপি এই কথাগুলি লিপিবদ্ধ করিতে গিয়া আমি বেশ বুঝিতেছি, ইহারা যে বিশাল হৃদয়ের ভাষা, তাহার বিন্দুমাত্র আভাস আমি দিতে পারিব না। জগতের যে-কোন ব্যক্তির সামান্য আঘাতও যেন আমাদের গুরুদেবের হৃদয়কে স্পর্শ না করিয়া যাইত না; কোন যন্ত্রণাই, এমনকি মৃত্যু-যন্ত্রণাও যেন তাহার নিকট হইতে প্রেম ও আশীর্বাদ ব্যতীত আর কিছু বাহির করিতে পারিত না।
তিনি আমাদের বশিষ্ঠ ও বিশ্বামিত্রের কাহিনী বলিলেন; বশিষ্ঠের শতপুত্র বিশ্বামিত্র কর্তৃক নিহত, পুত্ৰশোকভারাক্রান্ত ঋষিকে কিরূপ জীবন যাপন করিতে হইয়াছিল তাহাও বলিলেন। অতঃপর স্বামীজী চন্দ্রালোকে বৃক্ষরাজির মধ্যে অবস্থিত কুটিরের বর্ণনা করিলেন কুটিরের মধ্যে বশিষ্ঠ এবং তাহার স্ত্রী অরুন্ধতী। ঋষি তাহার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিরচিত অমূল্য গ্রন্থপাঠে নিবিষ্টচিত্ত, এমন সময়ে অরুন্ধতী নিকটে আসিয়া মুহূর্তের জন্য নত হইয়া দেখিলেন তিনি কি করিতেছেন, তারপর বলিয়া উঠিলেন, “দেব, আজ চন্দ্রের কি উজ্জ্বল শোভা!” ঋষি না তাকাইয়া বলিলেন, “প্রিয়ে, বিশ্বামিত্রের প্রতিভা তার চেয়ে দশ হাজার গুণ উজ্জ্বল!”
সব ভুলিয়া গিয়াছেন! শতপুত্রের নিধন, নিজের অপমান, ক্লেশ-সমস্ত বিস্মৃত হইয়া তিনি তাহার শত্রুর প্রতিভার প্রশংসায় তন্ময়!
“আমাদের প্রেমও ঐরূপ হওয়া চাই, বিশ্বামিত্রের প্রতি বশিষ্ঠের যেরূপ ছিল—তাতে ব্যক্তিগত ভালমন্দের স্মৃতির লেশমাত্র থাকবে না” –স্বামীজী বলিলেন।
এই সময়ে একজন কৃষক কতকগুলি পল্লবসমেত নাশপাতি ফুল আনিয়া আমরা যে টেবিলে বসিয়াছিলাম, তাহার উপর রাখিয়া দিল। আমাদের মধ্যে একজন সেগুলি তুলিয়া লইয়া বলিলেন, “স্বামীজী, পূজার জন্যই এ ফুলগুলির সৃষ্টি, কারণ এদের ফল হবে না।” কিন্তু তিনি তাঁহার দিকে স্মিত হাস্যের সহিত দৃষ্টিপাত মাত্র করিলেন, আর তিনিও স্বামীজীর প্রগাঢ় তন্ময়ভাব ভঙ্গ করিতে না পারায় ইচ্ছা সত্ত্বেও ফুলগুলি তাহাকে নিবেদন করিতে পারিলেন না।
স্বামীজী সত্যই চলিয়া গেলেন। ভৃত্য, মাঝি, বন্ধু, শিষ্য, পিতামাতা ও সন্তানসকলে মিলিয়া আমরা তাহার নিকট বিদায় লইবার জন্য বড় রাস্তার উপর টাঙ্গা পর্যন্ত গেলাম। স্বামীজীর প্রতি যাহার অনুরাগ আমরা বহুদিন লক্ষ্য করিয়াছি, তাহার সর্দার মাঝির সেই চার বৎসরের ছোট শক্তসমর্থকালো মেয়েটি যাত্রাপথে ব্যবহার করিবার জন্য এক বারকোশ ফল মাথায় করিয়া দৃঢ়চিত্তে ছোট ছোট পা ফেলিয়া স্বামীজীর পাশে পাশে চলিল এবং হাসিমুখে তাহাকে বিদায় দিয়া দাঁড়াইয়া তাঁহার গাড়ি চলিয়া যাওয়া দেখিতে লাগিল। এই ক্ষুদ্র শিশু অপেক্ষা আমরা কম অভিভূত না হইলেও চিন্তা ও অনুভূতি বাড়িলে যে জটিলতার সৃষ্টি হয়, তাহার ফলে তাহার ও আমাদের মধ্যে নিঃস্বার্থতায় অত্যন্ত ব্যবধান ছিল। পুনরায় কখন তাহার দর্শনলাভ করিব তাহা কেহই জানিতাম না, কিন্তু একথা বুঝিতে পারিয়াছিলাম, সেদিন তাহার সঙ্গে আমরা যে কয়েক ঘণ্টা কাটাইয়াছি, তাহার উজ্জ্বল আলোকচ্ছটায় আমাদের সমগ্র ভবিষ্যৎ অতিবাহিত হইবে।
———–
(১) স্বামীজী একটি মঠ ও সংস্কৃত কলেজ স্থাপনের উপযোগী একখণ্ড জমি মনোনীত করিবার জন্য কাশ্মীব-মহারাজের বিশেষ আমন্ত্রণে আগমন করেন। তাঁহাকে উক্ত জমি মনোনীত করিবার প্রস্তাবটি দুইবার উত্থাপন করা হয়, কিন্তু তদানীন্তন রেসিডেন্ট স্যার অ্যালবার্ট ট্য:লবট দুইবারই উহা কাউন্সিলের কার্যতালিকা হইতে বাদ দেন। সুতরাং ঐ সম্বন্ধে আলোচনা পর্যন্ত হইতে পারে নাই।
(২) শ্ৰীযুক্ত সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকৃত অনুবাদ।–অনুঃ
(৩) এখানে ইহা বলা অপ্রাসঙ্গিক হইবে না যে, আমার নিজের কথা বলিতে গেলে, আমি কোনক্রমে বুঝিতে পারি নাই, কিরূপে এই ব্যক্তি গীতা হইতে এই বিশেষ উপদেশটি সংগ্রহ কবেন।
১০. কলিকাতা ও স্ত্রীভক্ত-পরিবার
স্বামীজীর এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল। যাহারা তাহার নিকট অবস্থান করিতেন, তাহাদের সকলকে তিনি বড় করিয়া তুলিতেন। তাহার সান্নিধ্যে প্রত্যেকে নিজ নিজ জীবনের অনভিব্যক্ত মহৎ উদ্দেশ্য যেন দেখিতে পাইত এবং দেখিয়া উহাকে ভালবাসিত; আর দোষ-ত্রুটিগুলি দেখিতে পাইলে মনে হইত, ঐগুলি বিশেষ দোষাবহ নহে—উহাদেরও যেন যথেষ্ট কারণ আছে। বলা বাহুল্য, জাগতিক বস্তুজ্ঞানের ব্যাপারে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে পার্থক্য থাকে। কেহ কেহ মানুষের দৈহিক গঠন এবং কার্যকলাপই দেখিতে পায়, এবং বুঝিতে পারে। কেহ বা তাহার আকৃতি পরীক্ষা দ্বারা নির্দেশ করে সাধারণভাবে সে কোন্ শ্রেণীভুক্ত, এবং তাহার বাহ্য অবয়বে বিভিন্ন জটিল ভাবপ্রবাহের ঘাত-প্রতিঘাতের চিহ্ন দেখিতে পায়। কিন্তু এমন কিছু মানুষও আছেন, যাহারা মানব জীবনের পশ্চাতে অবস্থিত অসংখ্য কারণপরম্পরার সমাবেশ সম্পর্কে অবহিত—প্রত্যেকটি জীবন উহাদের এক খণ্ড পরিণাম মাত্র। আমাদের কথা ও কার্য কতটা জ্ঞানের বহির্বিকাশ, তাহা আমরা নিজেরা অনুমান করিতে পারি না।
