আমরা নিস্তব্ধ বসিয়া রহিলাম। কথা বলিবার চেষ্টা করিলেও পারিতাম না। এমন কিছুতে স্থানটি এরূপ ভরপুর হইয়া গিয়াছে যে, চিন্তাস্রোতও যেন থামিয়া গিয়াছে। তিনি আবার বলিলেন, “আমার সব স্বদেশপ্রেম ভেসে গেছে। আমার সব গেছে। এখন কেবল ‘মা’, ‘মা’!”
ক্ষণকাল নীরবতার পর তিনি কেবল বলিলেন, “আমার খুব অন্যায় হয়েছে। মা আমাকে বললেন, “যদিই বা ম্লেচ্ছরা আমার মন্দিরে প্রবেশ করে, আমার প্রতিমা অপবিত্র করে, তোর তাতে কী? তুই আমাকে রক্ষা করিস, না আমি তোকে রক্ষা করি? সুতরাং আমার আর স্বদেশপ্রেম বলে কিছুই নেই। আমি তো ক্ষুদ্র শিশু মাত্র!”
তারপর তিনি নানা বিষয়ে এবং অবিলম্বে কলিকাতা যাত্রার কথা বলিলেন। গত সপ্তাহের নানারূপ মানসিক দুশ্চিন্তার ফলে তাঁহার যে শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়, তাহারও উল্লেখ করিলেন। সস্নেহে বলিলেন, “এখন আমি এর চেয়ে বেশি বলতে পারব না; নিষেধ আছে।” বিদায় লইবার পূর্বে আবার বলিলেন, “কিন্তু আধ্যাত্মিকতার দিক থেকে আমি কোনরূপ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইনি।”
পরবর্তী কয়দিনে আমরা স্বামীজীকে অতি অল্পই দেখিয়াছিলাম। তবে পরদিন প্রাতরাশের পূর্বে আমাদের মধ্যে দুইজন অতি অল্পক্ষণের জন্য তাহার সঙ্গে নদীতীরে উপস্থিত ছিলেন, এমন সময় নাপিতকে আসিতে দেখিয়া তিনি বলিলেন, “এ সব আর থাকবে না।” তিনি চলিয়া গেলেন এবং আধ ঘণ্টা পরে ফিরিয়া আসিলেন একেবারে মুণ্ডিত মস্তকে। গত সপ্তাহে কঠোর তপস্যা ও সাধনার দ্বারা তিনি যে দিব্যদর্শন লাভ করিয়াছিলেন, তাহার বিশেষ বিবরণ আমরা মধ্যে মধ্যে তাহার কথা বা আচরণের মাধ্যমে অনুমান করিয়া লইতাম—এখন ঐ সকল স্মরণ করিয়া বর্ণনা করা অসম্ভব বলিয়াই মনে হয়। তাহার উপবাস, কুণ্ডে প্রত্যহ পায়স ও বাদাম ভোগ নিবেদন এবং প্রতিদিন প্রাতে এক ব্রাহ্মণপণ্ডিতের শিশুকন্যাকে কুমারী উমারূপে পূজা করা—এসকল আমরা কল্পনানেত্রে দেখিতে পাইতাম। আবার এই সকল অনুষ্ঠান এরূপ পূর্ণ অহংশূন্যতায় সম্পন্ন হইয়াছিল যে, উহার ফলে তাহার বিশেষ শারীরিক অনিষ্ট হইলেও সেজন্য কখনও তাঁহার মনে বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায় নাই।
একদিন এক ব্যক্তি একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে আসেন। স্বামীজী সন্ন্যাসীর পরিচ্ছদে ও মুণ্ডিতমস্তকে ঠিক সেই সময়ে আসিয়া পড়েন। “ন্যায়ের সমর্থন করিতে গিয়া মৃত্যুও শ্রেয়ঃ অথবা গীতার উপদেশ(৩) গ্রহণ করা উচিত, যাহাতে কোন কিছুর প্রতিকার না করিতে হয়?”–তাহার নিকট এই সমস্যাটি উপস্থাপিত করা হয়। বহুক্ষণ নিস্তব্ধ থাকিয়া স্বামীজী ধীরে ধীরে বলিলেন, “আমি কোন প্রতিকারের পক্ষপাতী নই।” তারপর আবার বলিলেন, “এটি সন্ন্যাসীর জন্য। গৃহীর পক্ষে আত্মরক্ষাই বিহিত।”
স্বামীজীর অন্তর্মুখ ভাব ক্রমশঃ গভীর ও গাঢ় হইতে লাগিল। এই সময়টিকে ‘তাহার জীবনের সঙ্কট-মুহূর্ত বলিয়া তিনি একবার উল্লেখ করেন। আবার জগন্মাতার ক্রোড়স্থিত শিশু বলিয়া নিজেকে তিনি অভিহিত করেন, মা তাহাকে আদর করিতেছেন। আর আমাদেরও স্বতই মনে হইল, হয়তো জগন্মাতার এই আদর মানবের স্নায়ু ও মনে দুঃসহ যন্ত্রণারূপে প্রকাশ পায়; তথাপি তাহারই স্নেহপ্রসূত বলিয়া পরমানন্দে স্বীকৃতি লাভ করে। তিনি কি বলেন নাই, “তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেও পরম আনন্দ থাকতে পারে?”
সকল ব্যবস্থা হইয়া যাইবামাত্র আমরা বারামুল্লা যাত্রা করিয়া ১১ অক্টোবর, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পৌঁছিলাম। পূর্বেই স্থির হয় যে, তিনি পরদিন অপরাহ্নে লাহোর যাত্রা করিবেন এবং আমরা আরও কিছুদিন বারামুল্লায় অবস্থান করিব। নদীপথে আসিবার সময় আমরা তাঁহাকে অতি অল্পই দেখিতে পাইয়াছিলাম। তিনি প্রায় সর্বদাই মৌনাবলম্বী থাকিতেন এবং একাকী নদীতীরে দীর্ঘকাল ধরিয়া ভ্রমণ করিতেন-কদাচিৎ আমাদের বজরায় তাহার পদার্পণ ঘটিত। ভারত-প্রত্যাবর্তনের পর দীর্ঘকালব্যাপী পরিশ্রমে তাঁহার স্বাস্থ্য একেবারে ভাঙিয়া যায়। আবার সাম্প্রতিক মহান উপলব্ধির ফলে তাঁহার শারীরিক অবনতি তাহাকে এতদূর অবসন্ন করিয়া তোলে যে, তিনি নিজে উহা তেমন বুঝিতে পারেন নাই! নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করিলে যন্ত্রণার যেমন আর উপলব্ধি হয় না, তেমন শরীরও অনির্দিষ্ট কাল ধরিয়া মাত্রাতিরিক্ত আধ্যাত্মিক ভাবাবেগ ধারণে অসমর্থ হয়। বোধ হয়, এই সকল কারণে আমাদের মনে হইতেছিল, কে জানে কত দিনের জন্য আমরা তাহার নিকট বিদায় লইতেছি। আর সম্ভবতঃ এই চিন্তা করিয়াই তিনি বুধবার প্রাতে জলযোগ শেষ হইয়া যাইবার পর আমাদের নিকট আগমন করেন এবং কথাবার্তা বলিবার জন্য থাকিয়া যান।
সেদিন সকালে ঘন্টার পর ঘণ্টা কথাবার্তায় কাটিয়া গেল। এখানে তাহার বিশদ বিবরণ দেওয়া অপেক্ষা, আমাদের মনে উহা কিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করিয়াছিল, তাহার একটা সাধারণ আভাস দেওয়া সহজ। কথা শুনিতে শুনিতে আমরা যেন এক অন্তরতম পবিত্র রাজ্যে প্রবেশ করিলাম। মধ্যে মধ্যে তিনি কোন ভক্তিমূলক সঙ্গীতের একাংশ গাহিয়া তাহার অনুবাদ করিতেছিলেন—গানগুলি সবই জগন্মাতার উদ্দেশ্যে।
“শ্যামা মা উড়াচ্ছ ঘুড়ি (ভব সংসার বাজার মাঝে)…
ঘুড়ি লক্ষের দুটো-একটা কাটে, হেসে দাও মা হাত চাপড়ি,”
