সম্ভবতঃ চরম জ্ঞানের অন্বেষণে, অব্যক্ত সত্তাকে এইরূপ ব্যক্তি জ্ঞানে চিন্তা করার পর ঈশ্বর সম্বন্ধে বিপরীত ধারণা—অর্থাৎ ঈশ্বরকে এই পরিদৃশ্যমান জগতের অন্তরালে অবস্থিত শক্তিরূপে চিন্তা করা অনিবার্য হইয়া পড়ে। সহজেই বুঝা যায়, যিনি এই উভয় ভাবের গভীরতম তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করিয়াছেন, তাঁহার পক্ষে প্রতীক সহায়ে ঈশ্বরকে ধারণা করিবার জন্য মানব মনের যে চেষ্টা তাহার প্রত্যেকটির অর্থবোধ করা সম্ভব, কারণ, সকল প্রতীকই শিব বা অনন্ত সত্তা ও শক্তি এই দুই প্রতীকের একটির অন্তর্ভুক্ত হইবেই। মানুষ যদি পরব্রহ্মকে আদৌ চিন্তা করে, তবে অনাদি-অনন্ত সত্তারূপে, অথবা অনাদি-অনন্ত শক্তিরূপে তাঁহার চিন্তা করিতে হইবে। এই তথ্যের অন্তরালে কোন প্রাকৃতিক নিয়ম বিদ্যমান কিনা, সে বিষয়ে চিরকাল অনুমান বা কল্পনার অবকাশ থাকিয়া যাইবে। যাহা হউক, কোন অজ্ঞাত কারণে, ক্ষীরভবানী। আগস্ট মাস হইতে স্বামীজীর চিত্ত শিব হইতে শক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়। সর্বদাই তিনি রামপ্রসাদের গানগুলি গাহিতেন, যেন নিজেকে শিশুরূপে কল্পনা করিয়া সেইভাবে মগ্ন হইতে চাহিতেন। একবার তিনি আমাদের কয়েকজনকে বলেন, যে দিকেই দৃষ্টিপাত করিতেছেন, জগন্মাতার উপস্থিতি অনুভব করিতেছেন—যেন তিনি সাকার রূপ ধারণ করিয়া কমধ্যে বিরাজ করিতেছেন। সর্বদা জগন্মাতা সম্বন্ধে অত্যন্ত সরল ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলা তাঁহার অভ্যাস হইয়া গিয়াছিল। আমাদের দলের মধ্যে যাহারা প্রবীণ ছিলেন, তাঁহারাও এই ধরনে কথাবার্তা বলিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। সুতরাং কোন সযত্নপোষিত উদ্দেশ্য ত্যাগ করিবার প্রয়োজন হইলে তাহারা এই বলিয়া মনকে প্রবোধ দিতেন, “মার যা ইচ্ছা, মা সব জানেন।”
কিন্তু ক্রমে স্বামীজীর তন্ময়ভাব গাঢ়তর হইল। ক্ষোভের সহিত তিনি অভিযোগ করিলেন, চিন্তারূপ ব্যাধির দ্বারা তিনি পীড়িত—যে চিন্তা মানুষকে দগ্ধ করে, নিদ্রা বা বিশ্রামের অবসর দেয় না, এবং বহু সময় ঠিক যেন মানুষের কণ্ঠস্বরের ন্যায় প্রবোচিত করিতে থাকে। তিনি সর্বদা আমাদের নিকট সুখ-দুঃখ, ভাল-মন্দ প্রভৃতি সর্বপ্রকার দ্বন্দ্বের অতীত হইবার আদর্শটি বোধগম্য করিবার চেষ্টা করিতেন—যে ধারণায় হিন্দুর পাপবোধ সমস্যার সমাধান নিহিত। কিন্তু বর্তমানে মনে হইল, তিনি যেন জগতের মধ্যে যাহা কিছু ঘোররূপ, যন্ত্রণাদায়ক ও দুর্বোধ্য, তাহারই উপর সমগ্র মন অৰ্পণ করিয়াছেন। ঐ পথ অবলম্বনে এই জগৎপ্রপঞ্চের পশ্চাতে অবস্থিত অদ্বয় ব্রহ্মকে লাভ করিবার জন্য তাহার দৃঢ় সঙ্কল্প দেখা গেল। কাশ্মীর যাত্রার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হওয়ায় ভীষণের পূজাই এখন তাঁহার মূলমন্ত্র হইয়া উঠিল। রোগ ও যন্ত্রণা তাহাকে মনে করাইয়া দিত, “যেখানে বেদনা অনুভূত হইতেছে, সে স্থান তিনি, তিনিই যন্ত্রণা এবং যন্ত্রণাদাতা। কালী! কালী! কালী!”
একদিন তিনি বলেন, তাহার মাথায় কতকগুলি চিন্তা প্রবল হইয়া উঠিয়াছে এবং উহাকে লেখনী সাহায্যে প্রকাশ না করা পর্যন্ত তাহার অব্যাহতি নাই। সেই সন্ধ্যায় কোন স্থানে ভ্রমণের পরে বজরায় প্রত্যাবর্তন করিয়া দেখিলাম, স্বামীজী আসিয়াছিলেন এবং আমাদের জন্য স্বহস্তে লিখিত Kali the Mother
(মৃত্যুরূপা মাতা’) কবিতাটি রাখিয়া গিয়াছেন। পরে শুনিলাম, দিব্যভাবের তীব্র উন্মাদনায় কবিতাটি লেখা শেষ হইবামাত্র তিনি মেঝের উপর পড়িয়া গিয়াছিলেন।
কবিতাটি এই :
মৃত্যুরূপা মাতা
নিঃশেষেনিভেছে তারাদল, মেঘ এসে আবরিছে মেঘ,
স্পন্দিত, ধ্বনিত অন্ধকার, গরজিছে ঘূর্ণ বায়ুবেগে!
লক্ষ লক্ষ উন্মাদ পরাণ বহির্গত বন্দিশালা হতে,
মহাবৃক্ষ সমূলে উপাড়ি, ফুৎকারে উড়ায়ে চলে পথে!
সমুদ্র সংগ্রামে দিল হানা, উঠে ঢেউ গিরিচূড়া জিনি,
নভস্তল রশিতে চায়! ঘোররূপা হাসিছে দামিনী।
প্রকাশিছে দিকে দিকে তার, মৃত্যুর কালিমা মাখা গায়,
লক্ষ লক্ষ ছায়ার শরীর! দুঃখরাশি জগতে ছড়ায়,
নাচে তারা উন্মাদ তাণ্ডবে; মৃত্যুরূপা মা আমার আয়!
করালি। করাল তোর নাম, মৃত্যু তোর নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে;
তোর ভীম চরণ-নিক্ষেপ প্রতিপদে ব্রহ্মাণ্ড বিনাশে!
কালী, তুই প্রলয়রূপিণী, আয় মাগো, আয় মোর পাশে।
সাহসে যে দুঃখ দৈন্য চায়, মুত্যুরে যে বাধে বাহুপাশে
কাল-নৃত্য করে উপভোগ, মাতৃরূপা তারি কাছে আসে।(২)
এই সময়ের কিছুদিন পূর্ব হইতে স্বামীজী তাহার নৌকা আমাদের নিকট হইতে দূরে সরাইয়া লন। একজন তরুণ ব্রাহ্ম ডাক্তাব ঐ গ্রীষ্মকালে কাশ্মীরে অবস্থান করিতেছিলেন। তিনিই কেবল জানিতেন, স্বামীজী কোথায় আছেন এবং তাহার দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সম্বন্ধেও খোঁজ-খবর লইতে পারিতেন। স্বামীজীর প্রতি তাহার সহৃদয়তা ও ভক্তিপূর্ণ ব্যবহার প্রশংসার অতীত। পরদিন প্রতিদিনের মতো ডাক্তারবাবু স্বামীজীর নিকট গেলেন, কিন্তু তাহাকে ধ্যানমগ্ন দেখিয়া কোন কথা না বলিয়া ফিরিয়া আসেন। পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর স্বামীজী ক্ষীরভবানী নামক কুণ্ডদর্শনে যাত্রা করেন, বলিয়া যান, কেহ যেন তাহার অনুসরণ না করে। সেইদিন হইতে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি অনুপস্থিত ছিলেন।
ঐ দিন অপরাহ্নে দেখিলাম, তিনি নৌকায় ফিরিয়া আসিতেছেন। নৌকা স্রোতের উজানে চলিতেছে। তিনি এক হাতে নৌকার ছাদের বাঁশের খুঁটি ধরিয়া সামনে দাঁড়াইয়া আছেন। তাহার অপর হাতে একছড়া গাঁদাফুলের মালা। তাঁহার আকৃতি যেন পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছে। বজরায় প্রবেশ করিয়া তিনি নীরবে মালাছড়াটি এক এক করিয়া সকলের মস্তকে স্পর্শ করাইয়া আশীর্বাদ করিলেন। অবশেষে মালাটি একজনের হাতে দিয়া বলিলেন, “এটি আমি মাকে নিবেদন করেছিলাম।” তারপর তিনি উপবেশন করিলেন, এবং হাসিতে হাসিতে বলিলেন, “আর ‘হরিঃ ও’ নয়, এবার ‘মা’, ‘মা’!”
