ইসলামাবাদ পরিত্যাগ করিয়া আমরা পথের মধ্যে এক জায়গায় যাত্রিদলের সহিত মিলিত হই এবং তাহাদের সঙ্গে সেই রাত্রির মতো বওয়ান নামক স্থানে তাঁবু ফেলা হয়। বওয়ান কতকগুলি পুণ্য উৎসের জন্য বিখ্যাত। সন্ধ্যাকালে দীর্ঘিকার পরিষ্কার কাল জলে দীপমালার প্রতিচ্ছায়া, এবং অসংখ্য যাত্রীর এক মন্দির হইতে অন্য মন্দিরে গমন—এখনও আমার মনে পড়িতেছে।
পহলগাম মেষপালকগণের গ্রাম—একাদশী পালন করিবার জন্য যাত্রিদল এখানে একদিন বিশ্রাম করিল। অদূরে দুইটি ক্ষুদ্র পাহাড়ের সংযোগস্থলে একটি ক্ষুদ্র পার্বত্য নদী, তাহারই প্রস্তর-সংঘর্ষে সৃষ্ট গর্ভে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুদ্বীপ। সুন্দর দৃশ্য! দুই পার্শ্বে ঢালু জমি সরল বৃক্ষের সারিতে ছাইয়া গিয়াছে। সূর্যাস্তের পর সর্বাপেক্ষা উচ্চ পর্বতের উপর দিয়া চন্দ্র দেখা গেল এখনও পরিপূর্ণ নহে। সুইজারল্যাণ্ড অথবা নরওয়ের সর্বাপেক্ষা সুন্দর ও মনোরম দৃশ্যগুলির অন্যতম। এখানে আমরা শেষ জনবসতির চিহ্ন দেখিলাম—একটি পুল, একটি খামারবাড়ি, তাহার সংলগ্ন ক্ষেত্র কর্ষণ করা হইয়াছে, এবং কতকগুলি ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত কুটির। শেষ পথটুকু অতিক্রম করিবার জন্য যাত্রা আরম্ভ হইলে দেখিলাম, অবশিষ্ট যাত্রিগণের তাঁবুগুলি তখনও শস্পাচ্ছাদিত গোলাকার পাহাড়টির উপর খাটানো রহিয়াছে।
অনির্বচনীয় সৌন্দর্যপূর্ণ দৃশ্যের মধ্য দিয়া আমরা তিন সহস্র যাত্রী সম্মুখস্থিত উন্মুক্ত উপত্যকায় আরোহণ করিতে লাগিলাম। প্রথম দিন আমাদের তাঁবু পড়িল সরল বৃক্ষের বনে; পরদিন তুষারবত্মরেখা অতিক্রম করিয়া একটি তুষার নদীর ধারে আমরা তাঁবু খাটাইলাম। নদীটি জমিয়া গিয়াছে। সে রাত্রে জুনিপার কাঠ দ্বারা ছাউনীর সুবৃহৎ অগ্নি প্রজ্বলিত হইল; পরদিন সন্ধ্যায় আরও উচ্চে অবস্থান করায়, ঐ বিরল ইন্ধনের অনুসন্ধানে ভৃত্যগণকে বহু ক্রোশ ঘুরিতে হয়। অবশেষে প্রকৃত পথের শেষ হইয়া গেল এবং আমরা পাকদণ্ডী (অত্যন্ত উঁচু-নিচু সরু পথ) দিয়া অতিকষ্টে খাড়া খাড়া পাহাড় চড়াই-উত্রাই করিতে লাগিলাম। অবশেষে যে গিরিসঙ্কটে অমরনাথ-গুহা অবস্থিত, সেখানে উপস্থিত হওয়া গেল। চারিদিকে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পাথর ছড়ানো। সামনেই তুষারমণ্ডিত শিখরগুলি সদ্য-পতিও তুষাররূপ শ্বেত অবগুণ্ঠনে আবৃত। গুহার অভ্যন্তরে সূর্যালোক প্রবেশ করিতে পারে না, এমন এক গভীর অংশে মহান তুষারলিঙ্গ বিরাজমান। যে সকল কৃষক ঐ তুষারলিঙ্গের প্রথম দর্শনলাভে বিস্ময়ে অভিভূত হইয়াছিল, তাহাদের নিকট উহা সাক্ষাৎ ভগবানের আবির্ভাব বলিয়াই বোধ হইয়া থাকিবে।
আসিবার পথে স্বামীজী তীর্থযাত্রার প্রত্যেকটি বিধি-নিয়ম পালন করিয়াছেন। মালা-জপ, উপবাস এবং যাত্রার দ্বিতীয় দিনে কঙ্করময় নদী গর্ভগুলি অতিক্রমকালে পরপর চিটি স্রোতস্বিনীর (পঞ্চতরণী) বরফ-গলা জলে স্নান—সবই তিনি যথাবিধি করিয়াছেন। এইবার যখন তিনি গুহা মধ্যে প্রবেশ করিলেন, বোধ হইল, মহাদেব যেন সশরীরে তাহার নিকট প্রত্যক্ষ হইলেন। কোলাহল করিয়া অসংখ্য যাত্রী গুহায় প্রবেশ করিতেছে, মাথার উপর পারাবতকুল ঝটপট শব্দ করিয়া উড়িতেছে; তাহারই মধ্যে স্বামীজী অপরের অলক্ষ্যে দুই-তিন বার ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিলেন; তারপর পাছে ভাবাবেশে আত্মহারা হইয়া পড়েন, এই ভয়ে নিঃশব্দে উঠিয়া দাঁড়াইলেন ও দ্রুতপদে বাহিরে চলিয়া গেলেন। পরে বলিয়াছিলেন, ঐ সংক্ষিপ্ত কয়েক মুহূর্তে তিনি মহাদেবের নিকট ইচ্ছামৃত্যু বব লাভ করেন। আশৈশব যে অস্ফুট ধারণা তাহার মনে দৃঢ়বদ্ধ ছিল যে, পর্বতের মধ্যে কোন শিব-মন্দিরে তাহার মৃত্যু ঘটিবে, সম্ভবতঃ এইরূপে তাহা ব্যর্থ হয়, অথবা সার্থকতা লাভ করে।
গুহার বহির্ভাগে অসহায় যাত্রিগণের উপর পাণ্ডাদের অত্যাচার ছিল না। অনাড়ম্বর এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য অমরনাথের প্রসিদ্ধি আছে। রাখিবন্ধনের পণ্য দিবসেই এই যাত্রাব শ্রেষ্ঠ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অনেকেই আমাদের হাতে রক্ত ও পীতবর্ণের রাখি বাধিয়া দিয়া গেল। অতঃপর কিছুক্ষণ বিশ্রামান্তে আমরা নদীর ধারে কয়েকটি প্রকাণ্ড উচ্চ পাথরের উপর বসিয়া আহার সম্পন্ন করিলাম, পরে তাঁবুতে ফিরিয়া আসিলাম।
স্বামীজী স্থান মাহাত্ম্যে বিভোর হইয়া গিয়াছেন। তাহার বোধ হইল, এরূপ সুন্দর স্থানে ইতিপূর্বে তিনি আর কখনও আসেন নাই। বহুক্ষণ তিনি নীরবে বসিয়া রহিলেন। তারপর স্বপ্নবিষ্টের ন্যায় বলিলেন, “আমি বেশ কল্পনা করতে পারি, কী ভাবে এই গুহাটি প্রথম আবিষ্কৃত হয়। গ্রীষ্মকালের কোন একদিন একদল মেষপালক তাদের নিরুদ্দিষ্ট মেষগুলির সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসে পড়ে। তারপর উপত্যকায় অবস্থিত তাদের ঘরে ফিরে বর্ণনা করে, কী ভাবে তা হঠাৎ মহাদেবের দর্শন লাভ করেছে।”
অন্ততঃ আমার গুরুর নিজের সম্পর্কে এইরূপ কাহিনী বলা চলে। তুষারলিঙ্গের পবিত্রতা ও শুভ্রতা তাহাকে মুগ্ধ এবং বিস্মিত করিয়াছিল। গুহাটি তাঁহাব নিকট কৈলাসের রহস্য উদঘাটিত করে। কীভাবে তিনি একটি পার্বত্য গুহায় প্রবেশ করিয়া সাক্ষাৎ ভগবানকে প্রত্যক্ষ করেন, তাহার স্মৃতি তিনি সারাজীবন হৃদয়ে পোষণ করিতেন।
০৯. ক্ষীরভবানী
অমরনাথ যাত্রার পূর্ব পর্যন্ত আমাদের জীবনের প্রত্যেকটি ঘটনা ছিল শিববিষয়ক চিন্তার সহিত জড়িত; প্রতি পদক্ষেপে মনে হইত, আমরা সেই চিরতুষারমণ্ডিত মহান পর্বতমালার সমীপবর্তী হইতেছি, যাহা একাধারে তাহার প্রতিরূপ এবং আবাসভূমি। সায়াহ্নে তুষারময় গিরিসঙ্কট ও আন্দোলিতসরলবৃক্ষগুলির উপর দিয়া দৃশ্যমান নবীন চন্দ্রমা যেন আমাদের জোর করিয়া মহাদেবের কথা স্মরণ করাইয়া দিত। সর্বোপরি, যে ধ্যানরাজ্যের পরিমণ্ডলে আমরা অবস্থান করিতেছিলাম, তাহার অন্তরতম প্রদেশে ও কেন্দ্রস্থলে সেই মহাদেবই বিরাজ করিয়া থাকেন ধ্যানমগ্ন, নির্বাক—যিনি সর্বগুণের অতীত, মনোবুদ্ধির অগোচর। একদা নিঃসন্দেহ যে, প্রজ্ঞাসহায়ে মানুষ ঈশ্বরকে যতদূর ধারণা করিতে সমর্থ হইয়াছে, হিন্দুর এই শিববিষয়ক ধারণা তাহার সর্বোচ্চ সীমা। তিনিই সর্বোপাধিবর্জিত ঈশ্বর, আবার তাহাকেই অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে লাভ করা যায়।
