এই কথার প্রসঙ্গে ক্রমশঃ প্লেটোর কথা উঠিল, এবং একজন প্লেটোর Ideas বা ভাবাদর্শের মতবাদ সম্পর্কে ব্যাখ্যা শুনিতে চাহিলেন। স্বামীজী উহার ব্যাখ্যা করিলেন এবং অবশেষে প্রসঙ্গের উপসংহার করিতে গিয়া উপস্থিত সকলের মধ্যে একজনকে বিশেষভাবে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “সুতরাং দেখতে পাচ্ছ আমরা যা কিছু দেখছি, সবই সেই মহান ভাবের ক্ষীণ বিকাশমাত্র; সেই ভাবসত্তাই কেবল সত্য ও সম্পূর্ণাঙ্গ। কোন এক জায়গায় একটা আদর্শ ত্বং পদার্থ রয়েছে, আর এই জগতে কেবল তাকেই প্রকাশ করবার চেষ্টা চলছে। এই চেষ্টা অনেক বিষয়ে আদর্শের কাছে যেতে পারছে না। তথাপি এগিয়ে চলো। কোন-না-কোনদিন আদর্শকে ধরতে পারবে।”
.
আর এক উপলক্ষে জীবনের সকল বন্ধন ছিন্ন করা সম্পর্কে স্বামীজীর কোন কথার উত্তরে একজন বলেন, “হিন্দুরা এই জীবনেব হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্য যে আকাঙক্ষা বোধ করেন, আমি তা অনুভব করতে পারি না। আমার মনে হয়, নিজের মুক্তিসাধনের চেয়ে যেসকল মহৎ কাজ আমার প্রীতিকর, তাতে সহায়তা করবার জন্য আবার জন্মগ্রহণ করাই বাঞ্ছনীয়।” স্বামীজী তৎক্ষণাৎ তীব্রস্বরে উত্তর দেন, “তার কারণ তুমি ক্রমোন্নতির ধারণাটি জয় করতে পার না। কিন্তু বাইরের কোন জিনিসই ভাল হয় না। তারা যেমন আছে, তেমনি থাকে। তাদের ভাল করতে গিয়ে আমরাই ভাল হয়ে যাই।”
এই শেষ কথাটি আমার নিকট বেদবাক্যের ন্যায় মূল্যবান মনে হয়—”তাদের ভাল করতে গিয়ে আমরাই ভাল হয়ে যাই।” এইরূপ, আমার মনে আছে, আলমোড়ায় অবস্থানকালে জনৈক নিরীহ প্রকৃতির প্রৌঢ় ব্যক্তি স্বামীজীর নিকট কর্ম সম্বন্ধে একটি প্রশ্ন করেন। প্রশ্নটি ছিল—যদি কেহ কর্মবশতঃ বলবানকে দুর্বলের প্রতি অত্যাচার করিতে দেখে, তবে তাহার কি করা উচিত? স্বামীজী বিস্মিত ও ক্রুদ্ধ হইয়া প্রত্যুত্তরে বলেন, “কেন, বলবানকে উত্তম-মধ্যম প্রহার দেওয়া—এর আর কথা কি আছে? এই কর্ম সম্পর্কে তুমি তোমার নিজের কর্তব্যটুকু ভুলে যাচ্ছ। অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার অধিকার তোমার সর্বদা রয়েছে।”
————-
(১) Scala Santa or Pilate’s Stair case-রোমের ‘ল্যাটারণ প্যালেস’ নামক প্রাসাদের অন্তর্গত সেন্ট জনের গীর্জার উত্তরদিকের বিখ্যাত সোপানাবলী। কথিত আছে, ইহার আটাশটি মার্বেল পাথরের ধাপ এককালে জেরুজালেমে খ্রীস্টের বিচারক পাইলেটের বাড়ির অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই সিঁড়ি দিয়া মধ্যযুগে নির্মিত পোপেদের পূজাগৃহে উঠা যায়, এবং লোকে হামাগুড়ি দিয়া এই সিঁড়ি আরোহণ করিবার ব্রত গ্রহণ করিয়া থাকে।—অনুঃ
০৮. অমরনাথ
আচ্ছাবলের মোগলবাগে একদিন আমরা উন্মুক্ত আকাশের নিচে বসিয়া আহার করিতেছি, এমন সময় স্বামীজী হঠাৎ ঘোষণা করিলেন, তিনি যাত্রিগণের সহিত অমরনাথ যাত্রা করিবেন এবং তাহার কন্যাকেও (লেখিকা) সঙ্গে লইবেন। আমাদের ক্ষুদ্র দলটির সকলেই এই সংবাদে এবং ঐ কন্যার সৌভাগ্যে এত আনন্দ প্রকাশ করিতে লাগিলেন যে, তাঁহার যাত্রা সম্পর্কে কোন আপত্তি উত্থাপিত হইল না। তাহাদের সম্মতিক্রমে, এবং উক্ত যাত্রার ভারপ্রাপ্ত সরকারী কর্মচারীর আনুকূল্যে, এই অভিনব তীর্থদর্শনের আয়োজন চলিতে লাগিল।
সেই কয় সপ্তাহ মনে হইতেছিল কাশ্মীর তীর্থযাত্রীতে পরিপূর্ণ। শেষ বন্দোবস্তের জন্য আমরা আচ্ছাবল পরিত্যাগ করিয়া ইসলামাবাদে আমাদের নৌকায় প্রত্যাবর্তন করিলাম। সর্বত্র নূতন নূতন যাত্রীদল চলিয়াছে। নিস্তব্ধ, সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সব সম্পন্ন হইতেছে। দুই-তিন সহস্র লোক একটি মাঠে ছাউনি ফেলিয়া আবার সূর্যোদয়ের পূর্বেই ঐ স্থান ছাড়িয়া চলিয়া যায়। চুল্লীর ছাই ব্যতীত রাত্রিবাসের আর কোন চিহ্ন দৃষ্ট হয় না। তাহারা সঙ্গে বাজার লইয়া চলিয়াছে, প্রত্যেক বিশ্রামস্থানে তাঁবু-খাটানো ও দোকান-সাজানোর কার্য অসম্ভব ক্ষিপ্রতার সহিত সম্পাদিত হয়। সঙ্ঘবদ্ধভাবে কার্য করা যেন তাহাদের স্বভাবত। ছাউনির এক অংশের মাঝখান দিয়া চওড়া রাস্তা চলিয়া গিয়াছে এবং সেখানে শুষ্ক ফল, দুধ ও চালডাল কিনিতে পাওয়া যায়। তহশীলদারের তাঁবুটি—যাহার এক পার্ধে স্বামীজীর ও অপর পার্শে আমার তাঁবু-সাধারণতঃ এরূপ স্থানে খাটানো হইত, যেখানে সন্ধ্যাকালে আগুন জ্বালানোর সুবিধা হয় এবং এইরূপে উহা স্বামীজীর সান্নিধ্যবশতঃ পরস্পরের মেলা-মেশা করিবার স্থান হইয়া উঠিত।
যাত্রীদের মধ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শত শত সাধু। তাহাদের তাঁবুগুলির রঙ গৈরিক; কতকগুলি আবার আকারে এক একটি বড় ছাতার মতো। এই সাধু সম্প্রদায়ের উপর স্বামীজীর অসীম প্রভাব। তাহাদের মধ্যে যাহারা অপেক্ষাকৃত বিদ্বান, তাহারা প্রত্যেক বিশ্রামস্থলে স্বামীজীকে ঘিরিয়া থাকিতেন। তাঁহার তাঁবুর মধ্যে সর্বদা ভিড়, দিনের আলো থাকা পর্যন্ত সাধুরা কথাবার্তায় মগ্ন থাকিতেন। স্বামীজী পরে আমাদের বলেন, তাহাদের প্রসঙ্গ ছিল শিববিষয়ক, আর মধ্যে মধ্যে তিনি জোর করিয়া তাহাদের মনোযোগ বাহ্যজগতের প্রতি আকর্ষণ করিলে তাহারা গম্ভীরভাবে তাহাকে ভৎসনা করিতেন। তাহাদের বক্তব্য ছিল যে, বিদেশীরাও ‘মানুষ’। তবে স্বদেশ ও বিদেশের মধ্যে পার্থক্য করা কেন? আবার তাহাদের মধ্যে অনেকে মুসলমান ধর্মের প্রতি স্বামীজীর প্রেম ও সহানুভূতির অর্থ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিতেন না। যে পরলোকচিন্তা স্বদেশ-বিদেশকে অভিন্ন জ্ঞান করাইত, সেই চিন্তাই এই সরলান্তঃকরণ ব্যক্তিগণকে হিন্দু ও মুসলমান যে এক অখণ্ড সত্তার দুইটি পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বীরূপ অঙ্গবিশেষ—এই চিন্তায় বাধা দিত। তাহাদের যুক্তি ছিল, ধর্মের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়াছেন, এরূপ বহুলোকের শোণিতে পঞ্চনদের ভূমি প্লাবিত। অন্ততঃ এখানে যেন স্বামীজী প্রচলিত ধর্মের গোড়ামির সঙ্কীর্ণতা মানিয়া চলেন! ইহার উত্তরে সেই সময়ের মতো স্বামীজী কতকগুলি আচরণে বিরত রহিলেন, যাহাতে ভ্রাতৃস্থানীয় সাধুমণ্ডলীর প্রতি তাহার প্রীতির পরিচয় পাওয়া গেল এবং তাহার মূল নীতিগুলি অধিকতর দৃঢ়তার সহিত গভীরভাবে তাহাদের মনে অঙ্কিত হইয়া গেল। এইরূপ আচরণ তাঁহার পক্ষে উপযুক্তই হইয়াছিল। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন ভাবীযুগের, কোনক্রমে পূর্ববর্তী যুগে আসিয়া পড়িয়াছিলেন! যাহা হউক, স্বামীজী যখন এই সকল আলোচনা বর্ণনা করিতেছিলেন, তখন উহার অসংলগ্নতা দর্শনে পাশ্চাত্যবাসীরা কৌতুক অনুভব না করিয়া পারেন নাই। কারণ, এই তীর্থযাত্রা-সংক্রান্ত বহু কর্মচারী ও ভৃত্য এবং তহশীলদার স্বয়ং ছিলেন মুসলমান এবং যথাসময়ে তীর্থস্থানে উপনীত হইয়া তাহাদের গুহায় প্রবেশে যে কোনরূপ বাধা থাকিতে পারে, একথা স্বপ্নেও কাহারও মনে উঠে নাই। বস্তুতঃ পরে তহশীলদার কয়েকজন বন্ধুসহ স্বামীজীর নিকট যথাবিধি শিষ্যত্ব গ্রহণ করিবার জন্য আগমন করেন; এবং এই ব্যাপার কাহারও নিকট বিস্ময়কর বা বিসদৃশ বোধ হইয়াছিল বলিয়া মনে হয় না।
