বাস্তবিক সেই মধুর গ্রীষ্মকালীন-যাত্রায় আমরা সর্বদা ভৃত্যদের নিকট এই কথা শুনিবার জন্য প্রস্তুত থাকিতাম যে, স্বামীজীর নৌকা এক ঘণ্টা পূর্বে নোঙ্গর তুলিয়া চলিয়া গিয়াছে এবং সেদিন আর প্রত্যাবর্তন করিবে না। প্রকৃতপক্ষে তিনি একদিন কি বহুদিন অনুপস্থিত থাকিবেন, তাহার কিছুই স্থিরতা ছিল না। কিন্তু সর্বদাই তিনি এই সকল নির্জনবাস হইতে দিব্য জ্যোতির্ময়রূপে ও শান্তিতে পূর্ণ হইয়া ফিরিয়া আসিতেন, আর তাহার শ্রীমুখ হইতে উচ্চারিত হইত গভীর—অতি গভীর জ্ঞানের কথা। যে-সব ধর্মানুষ্ঠান অপর ধর্মমত কর্তৃক পবিত্ররূপে স্বীকৃত, শ্রীরামকৃষ্ণের সকল শিষ্যের নিকটেই তাহারা বিশেষ অর্থপূর্ণ। তাহাদের মধ্যে একজন বলেন, স্বামীজী রোমের পবিত্র সোপানরাজি’ (Scala Santa)(১) দর্শনে অতীব মুগ্ধ হইয়াছিলেন। অধিকন্তু এই সঙ্ঘের আদর্শ হইল, নিষ্ঠাবান ভক্তগণের ন্যায় সকল অনুষ্ঠানে যোগদান। আমার নিজের গুরুর সম্বন্ধে দেখিয়াছি, তীর্থদর্শনকালে একজন সাধারণ স্ত্রীলোক যেরূপ করিয়া থাকেন, সেইভাবে তিনি পায়সভোগ দিতেন অথবা মালা জপ করিতেন। এই সকল স্থলে তিনি জাগতিক অথবা ধর্মীয় সকল ব্যাপারে আচার-অনুষ্ঠানের তুচ্ছ নিয়মগুলিও যথাযথভাবে পালন করিতেন। এইভাবেই উচ্চতম ভূমিতে আরোহণ করিবার পূর্বে তিনি সাধারণ লোকের সহিত নিজেকে একাত্ম করিয়া ফেলিয়াছিলেন।
কাশ্মীরে দুইটি স্থান অতীব পবিত্র বলিয়া গণ্য করা হয়। একটি ক্ষীরভবানী নামক প্রস্রবণ, যেখানে জগন্মাতার পূজা হইয়া থাকে; অপরটি অমরনাথ নামক পর্বতগুহা, তুষারময় শিবলিঙ্গ যেখানে বিরাজমান। এবং ঐ গ্রীষ্মকালে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা হইল স্বামীজী কর্তৃক ঐ স্থান দুইটি দর্শন। কিন্তু আমরাও উচ্চ আশা পোষণ করিতাম। যথাযথভাবে ধ্যান করিবার আগ্রহ প্রকাশ করিয়া আমরা কোন নির্জন স্থানে কিছুকাল বাসের অনুমতি প্রার্থনা করি—যেখানে নিয়মিত শিক্ষাধীনে থাকিয়া কয়েকঘণ্টা মৌন অবলম্বনপূর্বক ধ্যানাভ্যাসের চেষ্টা করিতে পারিব। এই কারণে, কয়েকটি তাঁবু আনা হইল, এবং সেপ্টেম্বর মাসের প্রথমে এক সপ্তাহের জন্য আচ্ছাবল নামক স্থানে বনের প্রান্তে আমাদের বু পড়িল। অমরনাথ তীর্থযাত্রা হয় আগস্ট মাসের প্রথমে, আর ৩০ সেপ্টেম্বর স্বামীজী আমাদের ছাড়িয়া ক্ষীরভবনী দর্শনে গমন করেন। অবশেষে ১২ অক্টোবর বারামুল্লায় আমরা তাহার নিকট বিদায় গ্রহণ করি। আমাদের যাত্রারও পরিসমাপ্তি ঘটে।
এই সকল মহান উপলব্ধি ও সাক্ষাৎকার ব্যতীত, যে সমুজ্জ্বল জীবনের সংস্পর্শে আমরা বাস করিতাম, তাহার উজ্জ্বলচ্ছটা প্রায়ই আমাদের উপর আসিয়া পড়িত। একবার কয়েকদিন অন্যত্র বাসের পর তিনি সবেমাত্র প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন এবং ভক্তি সম্বন্ধে কথাবার্তা বলিতেছেন, এমন সময়ে ভৃত্য আসিয়া জানাইল, আহার্য প্রস্তুত। কিন্তু আমরা দেখিতে পাইলাম, ভগবৎপ্রেমের উচ্চ শিখরে যিনি অবস্থান করিতেছেন তাহার নিকট আহারের চিন্তা পর্যন্ত কত অসহনীয়! আর একদিন সন্ধ্যার ম্লান আলোকে আমরা কয়েকজন মহিলা আমাদের তত্ত্বাবধায়িকা ধীরামাতার নৌকায় বসিয়া (আমরা সেদিন তাহার অতিথি) মৃদুস্বরে গল্পগুজব করিতেছি, এমন সময় স্বামীজী হঠাৎ আমাদের সহিত কয়েক মিনিট কথা বলিয়া কাটাইবার জন্য আসিলেন। ইউরোপযাত্রার দিন আসন্ন, সুতরাং সেই প্রসঙ্গ উঠিল। কিন্তু শীঘ্রই উহা শেষ হইয়া গেল। তারপর যাহাকে ভারতবর্ষে একাকী থাকিয়া যাইতে হইবে বলিয়া একরূপ স্থির ছিল, তিনি বলেন, অপরের অভাব তাহাকে বিলক্ষণ অনুভব করিতে হইবে। তাঁহার দিকে ফিরিয়া এক অদ্ভুত কোমলতার সহিত স্বামীজী বলিলেন, “কিন্তু, এত গুরুতর কষ্ট মনে করছ কেন? হাসিমুখে কেন বিদায় দাও না? পাশ্চাত্যবাসী তোমরা বড় সহজে বিষণ্ণ বোধ কর। তোমরা দুঃখের উপাসনা কর। তোমাদের সারা দেশে এই আমি দেখেছি। প্রতীচ্যে তোমাদের সামাজিক জীবন বাইরে থেকে হাস্যমুখরিত, কিন্তু ভিতরে গভীর মর্মব্যথা। শীঘ্রই তা কান্নায় পরিণত হয়। আমোদপ্রমোেদ যা কিছু, সব উপরে—আসলে তা গভীর দুঃখে পূর্ণ। কিন্তু এদেশে বাইরের দিকটা দুঃখপূর্ণ ও নিরানন্দ, কিন্তু ভিতরে নিশ্চিন্তভাব ও আনন্দ।
“তোমরা জানো, আমাদের একটা মত হলো, ঈশ্বর ক্রীড়াচ্ছলে নিজেকে জগক্সপে বিকাশ করেছেন বলে কল্পনা করা হয়। অবতারগণ লীলা হেতু এখানে আগমন করেন এবং বাস করেন। খেলা—সব খেলা। খ্রীস্ট ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন কেন? সে কেবল লীলা। জীবন সম্বন্ধেও তাই। ভগবানের সঙ্গে শুধু খেলা করে যাও। বলল, এ সব লীলা, লীলা। তুমি কিছু করেছ কি?” অতঃপর আর একটি কথাও না বলিয়া তিনি নক্ষত্রালোকে বাহির হইয়া পড়িলেন এবং নিজের নৌকায় চলিয়া গেলেন। আমরাও নদীর নিস্তব্ধতার মধ্যে পরস্পরের নিকট রাত্রির মতো বিদায় লইলাম।
নির্জনবাসের সপ্তাহে এক সন্ধ্যায় আমরা নদীর তীরে বিশাল বৃক্ষগুলির নিচে বসিয়াছিলাম, এবং স্বামীজী নেতৃত্ব’ সম্বন্ধে বলিতেছিলেন। তৎকালীন দুইটি প্রসিদ্ধ ধর্মসমাজের তুলনা করিয়া তিনি প্রসঙ্গ আরম্ভ করিলেন। উহার মধ্যে একটি প্রবর্তকের জীবিতকালেই প্রতিদিন সংখ্যা ও আয়তনে বৃদ্ধি পাইতেছিল, অপরটি ক্রমশঃ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগে বিভক্ত হইয়া ভাঙিয়া যাইতেছিল। পরিশেষে স্বামীজী বলেন, “আমার বিশ্বাস, নেতা এক জীবনে গড়ে ওঠে না। নেতা জন্মায়। কারণ, সংগঠন বা পরিকল্পনা করা কঠিন নয়। কিন্তু নেতার প্রকৃত লক্ষণ হলো তিনি অত্যন্ত ভিন্ন মতাবলম্বী ব্যক্তিগণকে একটা সাধারণ সহানুভূতিসূত্রে একত্র করতে পারেন। আর এ কাজ স্বাভাবিক ক্ষমতাবশে আপনি সম্পন্ন হয়, চেষ্টা করে করা যায় না।”
