স্মরণ রাখিতে হইবে, এইকালে আমরা এমন এক সংসর্গে বাস করিতেছিলাম,যেখানে নির্জনতাই আত্মোন্নতির শ্রেষ্ঠ উপায় বলিয়া বিবেচিত হইত। স্বামীজী বলিতেন, তাহার মনে হয়, নিয়োক্ত ঘটনা হইতে প্রাচ্য ও প্রতীচ্য চিন্তা-প্রণালীর পার্থক্য স্পষ্টরূপে বুঝা যায়। ইউরোপীয়দের ধারণা, কুড়ি বৎসর একাকী বাস করিলে মানুষ পাগল না হইয়া যায় না, আর ভারতীয় ধারণা হইল, কুড়ি বৎসর একাকী না থাকিলে কাহাকেও সম্পূর্ণ প্রকৃতিস্থ বলা যায় না। এই বৈপরীত্য কতকটা অতিরঞ্জিত ভাষায় প্রকাশ করিলেও মূলতঃ সত্য। হিন্দুধারণা অনুযায়ী মৌ ও নির্জনবাসের দ্বারাই আমরা সেই আত্মোপলব্ধির আনন্দরস আকণ্ঠ পান করিতে পারি, এবং তাহার ফলে যে আন্তরবিকাশ ঘটে, তাহাতে আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অহমিকার ধার মসৃণ হইয়া যায়। সেজন্যই দেখা যায়, নির্বাণ অবস্থায় বুদ্ধমূর্তিগুলির মুখমণ্ডল সর্বদা প্রশান্ত। যে কোনদিক দিয়াই দেখা যাউক, নানাভাবে পরিদৃশ্যমান এই জগৎ ও জাগতিক সম্পর্কসমূহ চিন্তাপ্রবাহকে শিশুসুলভ বাধা দেয় মাত্র। সকল বস্তুর পশ্চাতে অনুভূত হয় সেই অনির্বচনীয় পূর্ণত্ব, সকল দৃষ্ট বস্তু যাহার অতি তুচ্ছ ও বিকৃত বহিঃপ্রকাশ মাত্র। সকল মানবীয় সম্পর্কের উৎসস্বরূপ সেই চরম সত্তা বা ব্রহ্মে যাহারা অবগাহন করিয়াছেন, তাহাদের আর ঐ প্রকার সম্পর্ক প্রলোভিত করিতে পারে না। আর স্মরণ রাখিতে হইবে যে, ভারতে প্রেম, করুণা অথবা বীরত্বকে মূল কারণ বলিয়া চিন্তা করা হয় না; যদিও উহারা সেই অতীন্দ্রিয় সত্যে উপনীত হইবার বিভিন্ন পথস্বরূপ। কেবল একমেবাদ্বিতীয় বস্তুর সাক্ষাৎকারই ঐ ১ল উৎস। আমার বরাবর ধারণা, এই কারণে নিষ্ঠা, নির্জনবাস ও আত্মবিলোপ হিন্দুমতে প্রধান গুণ বলিয়া বিবেচিত, আর পাশ্চাত্যে অধিকতর সক্রিয় ও আক্রমণাত্মক গুণগুলিই সমাদৃত হইয়া থাকে। ভারতীয় মতে, দেহধারী হইয়াও প্রত্যেক ব্যাপারে আমরা যতটুকু নিজ নিজ দেহবুদ্ধি হইতে ঠিক ঠিক দূরে থাকিতে পারিব, ততটুকুই লাভ।
.
এই সকল চিন্তার প্রভাবে, ১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দের সেই অপূর্ব গ্রীষ্মকালে আমাদের ।সকলের নিকট ইহা স্বতঃসিদ্ধ বলিয়া মনে হয় যে, যাহারা সাকার রূপ ধারণ করিয়া পরিত্রাতা রূপে আবির্ভূত হন, তাহাদের অপেক্ষা অব্যক্ত সত্তায় (পরব্রহ্মে) যাহারা চিরকালের মতো লীন হইয়া গিয়াছেন, আর এই জগতে ফিরিয়া আসিবেন না, তাহারাই শতগুণে শ্রেষ্ঠ। স্বামীজী মধ্যে মধ্যে বলিতেন, “শরীরের কথা চিন্তা করাও পাপ।” অথবা বলিতেন, “শক্তি বা সিদ্ধি লোকের সামনে প্রকাশ করা ভাল নয়।” বুদ্ধের করুণার মধ্যেও ব্যক্তিত্বের স্মৃতি বিদ্যমান ছিল। ঈশার পবিত্রতার মধ্যেও ছিল শক্তিপ্রদর্শনের ভাব।
শেষোক্ত চিন্তাটি, অর্থাৎ অপরের নিকট শক্তি প্রকাশ করা অন্যায় ভারতীয় সাধুসমাজে বিশেষ প্রচলিত বলিয়া মনে হয়। একবার অদূরদর্শিতাবশতঃ আমাদের তবু তীর্থযাত্রীদের তাঁবুর নিকটে ফেলা হইয়াছিল। শত শত লোক উহার প্রতিবাদে কোলাহল করিয়া উঠিল। স্বামীজী তাঁবু সেখানেই রাখিবার জন্য প্রায় জিদ ধরিয়া বসিয়াছিলেন, এমন সময়ে এক অপরিচিত সাধু অগ্রসর হইয়া মৃদুস্বরে তাহাকে বলিলেন, “স্বামীজী, মানি, আপনার ক্ষমতা আছে, কিন্তু ঐ ক্ষমতা প্রকাশ করা আপনার উচিত নয়।” স্বামীজী তৎক্ষণাৎ তাঁবু অন্যত্র সরাইয়া লইতে আদেশ দিলেন।
অতীন্দ্রিয় সত্যোপলব্ধির দ্বারস্বরূপ মৌন ও নির্জনবাসের শক্তি সম্বন্ধে বিচার করিবার বহু সুযোগ আমরা লাভ করিয়াছিলাম। কারণ, স্বামীজী বারবার আমাদের মধ্য হইতে হঠাৎ চলিয়া যাইতেন, আবার অপ্রত্যাশিতভাবে ফিরিয়া আসিতেন। তাহার বিপুল খ্যাতি শ্রবণে আকৃষ্ট হইয়া বহু লোক তাহার বজরায় প্রবেশ করিয়া বসিয়া থাকিত এবং একদৃষ্টে চাহিয়া তাহার কার্যকলাপ নিরীক্ষণ করিত। ফলে একটু সময়ও একাকী থাকিবার উপায় ছিল না। বিশেষতঃ ভক্তবৃন্দের অপলক দৃষ্টির সম্মুখে তিনি অস্থির বোধ করিতেন। সময়ে সময়ে মনে হইত, প্রেমিক যেরূপ তাহার প্রেমাস্পদের চিন্তা করিয়া থাকে, তিনিও যেন সেই ভাবে মৌন, ভস্মাবৃত পরিব্রাজক অথবা নির্জনবাসী সাধুর জীবন চিন্তা করিতেন। যদি কেহ হঠাৎ আসিয়া বলিত, তিনি আজ বা কাল চিরদিনের মতো আমাদের নিকট বিদায় লইয়া যাইবেন, আর শেষবারের মতো আমরা তাহার কণ্ঠস্বর শ্রবণ করিতেছি, তাহা হইলে বিস্মিত হইবার কিছুই ছিল না। তিনি এবং তাহার উপর নির্ভর করিত এমন সব বিষয়ে আমরাও যেন ভগবদিচ্ছার সুরধুনী স্রোতে ভাসমান তৃণের ন্যায় ছিলাম। যে কোন মুহূর্তে ঐ ইচ্ছা তাহার নিকট মৌনরূপে আত্মপ্রকাশ করিতে পারিত। যে কোন মুহূর্তে পৃথিবীতে তাহার বাস শেষ হইয়া যাইতে পারিত।
এই যে মতলব আটিয়া কাজ না করা—ইহা কোন আকস্মিক ব্যাপার নহে। ইহার দুই বৎসর পরে তিনি একদিন আমাকে একটি পত্র দেখিতে দেন, এবং উহার উত্তর দেওয়ার ব্যাপারে আমি যখন অযাচিতভাবে কিছু সাংসারিক উপদেশ দিতে যাই, তখন যে বিরক্তির সহিত তিনি আমাকে উত্তর দেন, তাহা আমি কখনও ভুলিতে পারিব না। সক্রোধে তিনি বলিয়া ওঠেন, “মতলব! কেবল মতলব ভাজা! এইজন্যই পাশ্চাত্যের লোক তোমরা কোনকালে ধর্ম সৃষ্টি করতে পারনি। যদি তোমাদের মধ্যে কেউ কখনো ধর্মপ্রচার করে থাকেন, তো সে জনকয়েক ক্যাথলিক সাধু-যারা মতলব এঁটে কাজ করতে জানতেন না। যারা মতলব এটে কাজ করে, তাদের দ্বারা কোনকালে ধর্মপ্রচার হয়নি, হতে পারে না।”
