স্বামী স্বরূপানন্দের শিক্ষাধীনে আমি সমগ্ৰ মন প্রাণ দিয়া ধ্যান অভ্যাস করিতে আরম্ভ করিলাম। তাঁহার নিকট এই সহায়তা না পাইলে সেই অমূল্য অবসর আমার জীবনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হইয়া যাইত। গুরুর সহিত এইকালে আমার সম্পর্ক ছিল দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষে পূর্ণ। এখন আমি বুঝিতে পারি, শিখিবার বিষয় অনেক ছিল, কিন্তু সময় ছিল কত অল্প। শিক্ষার্থীর অহংনাশই ছিল শিক্ষার প্রথম সোপান। কিন্তু এই সময়ে আমার সযত্নপোষিত সংস্কারগুলির উপর যে নিত্য আক্রমণ ও তিরস্কার বর্ষণ হইত, তাহার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। দুঃখভোগের কারণ অনেক সময় খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। এক অনুকূল ভাবাপন্ন প্রিয় আচার্যলাভের স্বপ্ন ধীরে ধীরে অন্তর্হিত হইয়া তাহার পরিবর্তে উদাসীন এবং হয়তো বা মনে মনে বিরূপ, এইরূপ এক ব্যক্তির চিত্র কল্পনা করিয়া আমি তখন যে পরিমাণে দুঃখ বোধ করিয়াছিলাম, এখন তাহার যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ নির্দেশ করিতে যাওয়া বিড়ম্বনা মাত্র।
সৌভাগ্যবশতঃ সেবাকার্যে যোগদান করিব বলিয়া যে সঙ্কল্প করিয়াছিলাম, তাহা প্রত্যাহার করিবার কথা মুহূর্তের জন্যও আমার মনে উদিত হয় নাই। কিন্তু যত দিন যাইতে লাগিল, আমি হৃদয়ঙ্গম করিলাম, এই সেবাকার্যে কোন ব্যক্তিগত মধুর সম্পর্ক থাকিবে না। অবশেষে এমন সময় আসিল, যখন এই তীব্র যন্ত্রণা অসহনীয় হইয়া উঠিতে পারে, এই কথা চিন্তা করিয়া আমাদের দলের মধ্যে যিনি বয়োজ্যেষ্ঠা,অনুগ্রহপূর্বক স্বামীজীর নিকট এই বিষয় উল্লেখ করিলেন। স্বামীজী নীরবে সব শুনিলেন এবং চলিয়া গেলেন। কিন্তু সন্ধ্যার সময়ে তিনি আবার আসিলেন। আমাদের বারান্দায় একত্র দেখিয়া তিনি তাহার দিকে তাকাইয়া বালকের ন্যায় সরলভাবে বলিলেন, “তোমার কথাই ঠিক, এ অবস্থার পরিবর্তন একান্তই দরকার। আমি একাকী জঙ্গলে যাচ্ছি; নির্জনবাসের ইচ্ছা। আর যখন ফিরব, শান্তি নিয়ে আসব।” তারপর স্বামীজী উপরের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া দেখিলেন, আমাদের মাথার উপর নবীন চন্দ্রের শোভা। সহসা দিব্যভাবে তাঁহার কণ্ঠ আবিষ্ট হইয়া উঠিল, বলিলেন, “দেখ, মুসলমানেরা দ্বিতীয়ার চাদকে বিশেষ সমাদরের চোখে দেখে। এস, আমরাও এই নবীন চন্দ্রমার সঙ্গে নবজীবন আরম্ভ করি।” কথাগুলি শেষ হইবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি হাত তুলিলেন, এবং নীরবে তাঁহার সর্বাপেক্ষা বিদ্রোহী শিষ্যকে হৃদয়ের অন্তস্তল হইতে আশীর্বাদ করিলেন। ইতোমধ্যে শিষ্য তাহার সম্মুখে নতজানু হইয়া বসিয়াছেন। মিলনের অপূর্ব মাধুর্যে সেই মুহূর্তটি নিশ্চিত সমুজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছিল। তথাপি, এই মুহূর্ত ক্ষত আরোগ্য করিতে পারে, কিন্তু যে মোহস্বপ্ন ভাঙিয়া শতখণ্ড হইয়া গিয়াছে, তাহাকে আর ফিরাইয়া আনিতে পারে না। এই ঘটনাটি লিপিবদ্ধ করিবার কারণ, যাহাতে পরের ঘটনাটি বিবৃত করিতে পারি। বহু বহু বৎসর পূর্বে শ্রীরামকৃষ্ণ তাহার শিষ্যগণকে বলিয়াছিলেন, এমন দিন আসিবে, যখন তাহার প্রাণপ্রিয় নরেন্দ্রে’র স্পর্শমাত্রে জ্ঞানবান করিবার যে শক্তি জন্মগত, তাহা বিকাশলাভ করিবে। আলমোড়ায় সেই সন্ধ্যাকালে আমি এই ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতার প্রমাণ পাইয়াছিলাম। কারণ, একাকী ধ্যানে বসিয়া, আমি অনুভব করিলাম, আমি এক অনন্ত মঙ্গলময় সত্তায় মগ্ন হইয়া গিয়াছি, সেই গভীর সত্তার স্বরূপ অহংপূর্ণ বিচারের দ্বারা কখনও জানিতে পারি নাই। ইহা ব্যতীত, আমি একথাও হৃদয়ঙ্গম করিলাম যে, হিন্দুধর্মের যোগশাস্ত্রে যে অনুভূতির উল্লেখ আছে, তাহা এই জড়ভূমিতে সহজভাবে নিত্য প্রত্যক্ষ। আর এই সর্বপ্রথম আমি জানিলাম যে, শ্রেষ্ঠ আচার্য এইরূপেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবসান করেন, উহার পরিবর্তে নিরাকার দর্শনলাভ হইবে বলিয়া।
০৭. তত্ত্বালোকের ঝলক
আমি যে সব উপলব্ধি লাভ করি, তাহার মধ্যে এইটি একমাত্র নহে, কিন্তু কেবল এই উপলব্ধির সম্বন্ধেই বিস্তৃতভাবে বলার প্রয়োজন ছিল। যে পূর্ণ ঘটনাটির ইহা অংশমাত্র, তাহা হইতে আভাস পাওয়া যায়, প্রাচ্যদেশীয় আচার্যগণ শিষ্যের নিকট কিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি অত্যাবশ্যক বলিয়া মনে করেন। সর্বপ্রথম শিষ্যকে সর্বতোভাবে গুরুর আনুগত্য স্বীকার করিতে হইবে। শুনিয়াছি, গুরুর ব্যক্তিগত সেবাও একান্ত আবশ্যক, এবং ঐরূপ স্থলেই গুরুর চিন্তারাশি শিষ্যের মনে বীজাকারে অঙ্কুরিত হয়, বলিতে পারি না। আমার নিজের ক্ষেত্রে এই ধরনের সেবা বলিতে গেলে কালেভদ্রে অতি অল্পক্ষণের জন্য সূচী অথবা লেখনী কার্যেই আবদ্ধ থাকিত। স্বামীজী বলিয়াছেন, কন্যার কখনও এরূপভাবে কাজ করা উচিত নয়, যাহাতে লোকে মনে করে, পিতৃগৃহে ভৃত্যের অভাব ছিল। তথাপি আমার বিশ্বাস—কারণ কয়েকটি ক্ষেত্রে আমি ইহার সত্যতার প্রমাণ পাইয়াছি-প্রীতির সহিত গুরুজনদের সামান্য সেবা দ্বারা তাহাদের সহিত আমাদের মানসিক ও আধ্যাত্মিক একাত্মতা জন্মে; যাহার ফলে আমাদের জীবনে অপূর্ব ও সুন্দর ফল লাভ করি।
পাশ্চাত্যে কোন কোন সম্প্রদায়ের লোক গীর্জার প্রতি যে পূর্ণ বিশ্বাস ও ভক্তির ভাব পোষণ করে, প্রাচ্যে গুরুর প্রতি শিষ্যকে অনুরূপ ভাব প্রদর্শন করিতে হয়। শিষ্যের পশ্চাতে গুরু এবং তাহার সাধনই শক্তিরূপে বর্তমান থাকে। এই ঋণ মানিয়া লইতে অসমর্থ হওয়া বা অস্বীকার করা মহাপাপ এবং অমার্জনীয়। প্রত্যেকেই নিজ নিজ ভাব অনুযায়ী ভক্তি প্রকাশ করিয়া থাকেন। তিনিই শ্রেষ্ঠ গুরু, যিনি শিষ্যের স্বাধীনতা গভীরভাবে উপলব্ধি করিয়াছেন। কিন্তু গুরুর প্রতি শিষ্যের একান্ত ভক্তি অবশ্য প্রয়োজন। যে ব্যক্তি শুধু নিজের শক্তির উপরই আত্মোপলব্ধিকে প্রতিষ্ঠিত করিতে চায়, তাহার অধ্যাত্মজীবন ‘ঘুনধরা’ কাঠের মতো অচিরে জীর্ণ হইয়া পড়ে।
