আমার বক্তব্য বিষয় অতি বিশদভাবে বলিতে চাই। তাহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করার পর বরাবর আমার কাজ ছিল কতকটা যেন অপরের মনের ভাব ধরিতে পারা। আমি কেবল এই দাবি করিতে পারি যে, স্বামীজীর শক্তির বিভিন্ন গতিপথের সহিত আমার এতটা ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল যে, ঐ সম্পর্কে নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হইতে বলিতে পারি। আর যেহেতু আমি বিশ্বাস করি, কোন জড়বস্তুর ন্যায় কোন অভিজ্ঞতাও কতকগুলি সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীন, অতএব যে-সব অবস্থার মাধ্যমে আমার ঐরূপ অভিজ্ঞতা লাভ হয়, তাহাদের যথাযথ বর্ণনা দিবার চেষ্টা করিব।
ব্যক্তিগত ঘটনা বা অনুভূতি সম্পর্কে স্বামীজী ছিলেন অত্যন্ত চাপা প্রকৃতির। অবশ্য, জগতের বিভিন্ন স্থানে বহু ব্যক্তি তাহার নিকট নিজ নিজ দোষ উদঘাটন করিয়াছে, কিন্তু আধ্যাত্মিক গুরুর পদ হইতে নিষ্কৃতি লাভের জন্য কেহই বোধ হয় তাহার মতো ব্যাকুলভাবে চেষ্টা করে নাই। এমনকি, কোন ব্যক্তিবিশেষকে উদ্দেশ্য করিয়া নহে, অথচ নিজ ব্যক্তিগত অনুভূতির ঘনিষ্ঠ প্রকাশ ব্যতীত যাহার উত্তর দেওয়া চলে না, এমন সব প্রশ্নে তাঁহার মুখ আরক্তিম হইয়া উঠিত—এবং অন্তরের ভাব অপরের নিকট ব্যক্ত করিতে সঙ্কোচ বোধ করিতেন। লণ্ডনের ক্লাসগুলিতে কখন কখনও দেখিয়াছি, কতকগুলি প্রশ্ন জোর করিয়া তাহার উপর চাপানো হইয়াছে—যেমন সমাধিকালে কিরূপ অনুভূতি হয় ইত্যাদি। সে সময় উপস্থিত সকলেই বুঝিতে পারিতেন যে, ঐরূপ ধরনের প্রশ্নের পরিবর্তে বরং অসাবধানতাবশতঃ তাহার কোন অনাবৃত স্নায়ু জোরে চাপিয়া ধরিলে উহা সহ্য করা তাহার পক্ষে সহজ ছিল।
স্বামীজী নিজেই তাঁহার দলের সহিত আমার যাইবার কথা উত্থাপন করেন। উদ্দেশ্য, ভারতে আমার উপর যে কার্যের ভার অর্পণ করিবার ইচ্ছা, সে বিষয়ে স্বয়ং শিক্ষা দেবেন। এই শিক্ষাদানের পদ্ধতি ছিল অতি সাধারণ। সকলেই একত্র বারান্দায় অথবা বাগানে উপবেশন করিতাম, কথাবার্তা মনোযোগ সহকারে শুনিতাম; যিনি যতটা পারেন, গ্রহণ করিতেন, এবং পরে ইচ্ছামত আলোচনার স্বাধীনতা ছিল।
আমার যতদূর মনে পড়ে, ১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দের সারা বৎসরের মধ্যে মাত্র একদিন আধ ঘণ্টার জন্য তিনি আমাকে তাহার সহিত একাকী ভ্রমণ করিতে আহ্বান করেন। আমাদের কথাবার্তা ব্যক্তিগত সংক্রান্ত না হইয়া আমার ভাবী কার্যের উদ্দেশ্য ও প্রণালী সম্পর্কেই হয়; তখন গ্রীষ্মকাল প্রায় শেষ হইতে চলিয়াছে এবং আমিও আমার কার্য সম্বন্ধে কিছুটা বুঝিতে আরম্ভ করিয়াছি।
এ বিষয়ে সন্দেহ নাই যে, কোন বিশিষ্ট চিন্তাশীল ব্যক্তিকে কেন্দ্র করিয়া যে দল গড়িয়া উঠে, ঐ দলের সকলের সহিত তাহার একটি নিগূঢ় ভাবসম্বন্ধ স্থাপিত হয়, এবং ঐ সম্বন্ধের মাধ্যমেই তাহার ভাবাদর্শ চারিদিকে পরিব্যাপ্ত ও জনসমাজ কর্তৃক পরিগৃহীত হয়। এমনকি, একজন গণিতবিদ তাহার সমকালীন ব্যক্তিবর্গের উপর সেই পরিমাণে স্বীয় প্রভাব বিস্তার করিতে সমর্থ হন, যে পরিমাণে তাহার চিন্তা ভাবের মাধ্যমে প্রচারিত হয়। কিন্তু এই ভাবসম্বন্ধের কোন নির্দিষ্ট রূপ নাই। বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট উহা বিভিন্ন আকার ধারণ করে। কেহ তাহাকে দাসভাবে, কেহ ভ্রাতা, সখা বা বন্ধুরূপে, কেহ বা সেই অলৌকিক পুরুষকে নিজের প্রাণপ্রিয় সন্তানরূপে দেখিয়া থাকেন। ভারতবর্ষে এই সকল ব্যাপার এক পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞানে পরিণত হইয়াছে, এবং সকলে অসঙ্কোচে বুঝিয়া এবং মানিয়া লয় যে, এইরূপ কোন ভাবসম্বন্ধস্থাপন ব্যতীত সাধারণ ব্যক্তির পক্ষে কোন বিরাট ধর্ম-আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া চিৎকার করিয়া উঠিয়াছিলেন, “ঈশ্বর যদি থাকেন, তবে তিনি কী করছেন? কেন তিনি এই সব ঘটনা রোধ করেন না?”
এই ধরনের দুই-তিনটি ঘটনা এক বৎসরের মধ্যে তাঁহাকে এরূপ তীব্র মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলিয়া দিল যে, জীবনে আর কখনও অটুট স্বাস্থ্য কাহাকে বলে তিনি জানিতেন না। কিন্তু পরে ঐ দুঃখ হইতে নিষ্কৃতিলাভ করিয়া তিনি পরম শান্তি লাভ করেন। জীবনের প্রতি এক অপরিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গিই ঐ শান্তির মূল। তিনি কৃতসঙ্কল্প হইলেন, স্বপ্ন ভাঙিয়া ফেলিতে হইবে–অর্থাৎ, ভগবান বুদ্ধের আবির্ভাবের পূর্বে এবং পরে সহস্র সহস্র ভারতীয় ব্রহ্মচারীর ন্যায় তিনিও একই সিদ্ধান্তে উপনীত হইলেন। ঈশ্বর সিংহাসনের উপর বিরাজ করিতেছেন, এবং মানব নতজানু অবস্থায় তাহার পদতলে উপবিষ্ট—এইরূপ কোন চিত্র কল্পনা করিয়া সমস্যার চরম সমাধানের চেষ্টা অতঃপর তাহার পক্ষে অসম্ভব হইয়া পড়ে। বরং তাহার মনে হইল, অজ্ঞতা এবং স্বার্থপরতাই এই সকল স্বপ্ন ও সুখদুঃখ, ন্যায়-অন্যায় প্রভৃতি অন্যান্য যে সব স্বপ্ন দ্বারা আমাদের এই পরিদৃশ্যমান জগৎ গঠিত, তাহার মূল কারণ। অতঃপর সকল দ্বন্দ্ব হইতে নিষ্কৃতিলাভ ও সেই চরম একত্ব অবস্থা সাক্ষাৎকার করিবার জন্য হিন্দুরা যাহাকে মুক্তি বলিয়া অভিহিত করেন এবং যতদূর সম্ভব অন্তদৃষ্টি ও নিশ্চয়তালাভ করিবার জন্য তিনি দৃঢ় সঙ্কল্প করেন-মায়াকে জয় করিতে হইবে।
এখন হইতে সেই উচ্চতম অবস্থা লাভ করিবার জন্য নিজের সর্বশক্তিনিয়োগ করাই যেন তাহার একমাত্র উদ্দেশ্য হইয়া উঠিল। ইহার পর তাহার পিতৃগৃহে বাসের অবশিষ্ট কয়েক বৎসর মঠবাস অপেক্ষা যে কঠোরতর ছিল, তাহা নানা ভাবে বুঝিতে পারা যায়। বহু বৎসর পরে আলমোড়ায় তাহার নিকট গীতা অধ্যয়নকালে ভগবৎ প্রেমকে আকুল তৃষ্ণার সহিত কেন তুলনা করা হয়, তাহা বুঝিতে পারি।
