আবার এখানে সেখানে ঘাস ও আইরিস পুষ্পের মধ্যে দুই-চারটি গ্রন্থিবহুল আপেল, বা নাসপাতি কিংবা আলুবোখরার গাছ দেখিতে পাওয়া যায়। এক সময়ে প্রত্যেক গ্রামের প্রজাগণ রাজ-সরকার হইতে বিনা ব্যয়ে একটি করিয়া ফলবাগানের উপস্বত্ব ভোগ করিত। বৃক্ষগুলি তাহাদেরই ধ্বংসাবশেষ। একদিন গোধূলি সময়ে উচ্চ নদীতীরে ভ্রমণ করিতে করিতে দেখিতে পাইলাম, একদল মুসলমান রাখাল মাথা কানো লম্বা ছড়ি হাতে কতকগুলি রামছাগল তাড়াইয়া লইয়া গ্রামের দিকে যাইতেছে। কয়েকটি আপেল গাছের নিকট পৌঁছিয়া তাহারা একটু থামিল, এবং প্রার্থনাকালে ব্যবহৃত গালিচার পরিবর্তে কম্বল বিছাইয়া সেই ঘনায়মান গোধূলি-আলোকে সান্ধ্য উপাসনা আরম্ভ করিল। হৃদয় বলিয়া উঠে, এ সৌন্দর্যের অন্ত নাই বাস্তবিক অন্ত নাই।
কিন্তু সত্যসত্যই বর্তমান গ্রন্থে এইসকল বিষয়ের কথা বলাই আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার বর্ণনার বিষয় ভূগোল বা রাজনীতি নহে, এমনকি, কৌতূহলোদ্দীপক অধিবাসিবৃন্দ বা অপরিচিত জাতিসমূহের আচার ব্যবহারও নহে। সৌভাগ্যবশতঃ আধুনিক পরিবর্তনের যুগে শত বিরোধ ও জটিলতার মধ্যে, আমি সেই প্রাচীন যুগের যে বিশাল ধর্মজীবনের উন্মেষ দেখিতে পাইয়াছিলাম, এখানে তাহারই কিঞ্চিৎ আভাস দেওয়া আমার উদ্দেশ্য। আবার এই সকল বিরোধের বিষয় সম্যকরূপে অবগত ছিলেন বলিয়া যে মহাপুরুষ সমধিক মমর্যাতনা ভোগ করিতেন, তাহার সম্বন্ধে বলিবার ইচ্ছা থাকিলেও আমার অক্ষমতাবশতঃ ঐ বর্ণনা অসংলগ্ন ও অস্পষ্টই থাকিয়া যাইবে। স্বামীজী নিজে একবার বলিয়াছিলেন, শ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন, “একটি ফুলেরমতো”। মন্দির সংলগ্ন উদ্যানে স্বতন্ত্রভাবে জীবনযাপন করিতেন; সরল, অর্ধনগ্ন, আচারনিষ্ঠ, প্রাচীন-ভারতের আদর্শস্বরূপ; সহসা তিনি এমন এক জগতে পূর্ণ বিকশিত হইয়া ওঠেন, যে জগৎ তাহার প্রাচীনকালের স্মৃতি পর্যন্ত মুছিয়া ফেলিতে চাহিয়াছিল। আমার গুরুদেবের জীবনে একাধারে মহত্ত্ব ও বেদনার বিষয় এই যে, তিনি নিজে ঠিক ঐ ঘঁচের লোক ছিলেন না। তাহার মনের গঠন ছিল সম্পূর্ণভাবে আধুনিক। মনের যে অবস্থায় মানুষ ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করে–সেই শাশ্বত-প্রজ্ঞালোকে তাহার চিত্তও উদ্ভাসিত থাকিত, কিন্তু সেই সঙ্গে বর্তমান যুগের মনীষী ও কর্মিবৃন্দের সম্মুখে উপস্থিত সকল প্রশ্ন ও সমস্যার উপরেও তাহার আলোক আসিয়া পড়িত। তাঁহার আশা বিংশ শতাব্দীর জনগণের আশাকে আপনার অন্তর্ভুক্ত করিয়া লইতে অথবা বর্জন করিয়া চলিতে পারিত, কিন্তু কদাচ উপেক্ষা করিতে পারিত না। সমুদয় জ্ঞানভাণ্ডার সুসংবদ্ধ হওয়ার ফলে সমগ্র মানবজাতির দুর্দশা ও তাহার প্রতিকূলে সংগ্রামের যে দৃশ্য উজ্জ্বল আলোকছটার ন্যায় সহসা লোকের দৃষ্টিপথে পড়িয়াছিল, তাহা ইউরোপীযগণের ন্যায় তাহাকেও সচেতন করিয়া তোলে। ইউরোপ এ বিষয়ে কি অভিমত প্রকাশ করিয়াছে, তাহা আমরা জানি। গত ষাট বৎসর বা ততোধিক কাল ধরিয়া ইউরোপীয় কলা, বিজ্ঞান ও কাব্য হতাশার ক্রন্দনে পূর্ণ। একদিকে অধিকার প্রাপ্ত জাতিগুলির ক্রমবর্ধমান আত্মতুষ্টি ও ইতরজনোচিত প্রবৃত্তি, অন্যদিকে অধিকারচ্যুত জাতিগুলির ক্রমবর্ধমান বিষাদ ও যন্ত্রণা; আর মানবের অতি উদার প্রকৃতি উহাকে ক্ষতিকর পাপ বলিয়া জানিলেও প্রতিকার বা দমনে অসমর্থ—ইউরোপের শ্রেষ্ঠ মনীষিগণের চক্ষে এই দৃশ্যই পড়ে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও মর্মযাতনা ভোগ করিলেও, ইহা সত্য যে, উপায়ান্তর না দেখিয়া পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষা নিশ্চল অবস্থায় উচ্চৈঃস্বরে কেবল ইহাই বলিতে পারে, “যাহার আছে, তাহাকে আরও দেওয়া হইবে, আর যাহার নাই, তাহার নিকট হইতে সামান্যতম সম্বলটুকুও কাড়িয়া লওয়া হইবে। সাবধান, যে পরাজিত হইবে, তাহারই সর্বনাশ।”
প্রাচ্য জ্ঞানিমণ্ডলীরও কি এই অভিমত? তাহা হইলে মানবজাতির আর আশা কি? আমার গুরুদেবের জীবনে আমি এই প্রশ্নের উত্তর পাই। তাহার মধ্যে একাধারে ভারত ও সমগ্র জগতের অতীতকালের অসংখ্য আচার্য ও ঋষির যে আধ্যাত্মিক আবিষ্কার ও ধর্মলাভের জন্য সংগ্রাম—তাহারই উত্তরাধিকারী এবং এক নূতন ধরনের ভবিষ্যৎ উন্নতির প্রবর্তক ও ঋষির সমাবেশ ঘটিয়াছে দেখিতে পাই। কোন একটি সমস্যাকে তিনি যেভাবে মনের মধ্যে গ্রহণ করিতেন, তাহাতেই আমি উহার সমাধানের ইঙ্গিত পাইতাম; এবং প্রথম হইতেই আমি উহার ঠিক বিপরীত মত দৃঢ়ভাবে পোষণ না করিয়া থাকিলে (সেক্ষেত্রে স্বামীজীই উহা প্রথম আমাকে ধরাইয়া দিতেন) তাহার সমাধান আমার নিকট বিশেষ মূল্যবান বলিয়া বোধ হইত। এইভাবে চিন্তা করিয়াছি বলিয়া আমার বিশ্বাস, যে উন্নততর অসাধারণ চিন্তাধারা ও জ্ঞানরাজ্যে তিনি স্বচ্ছন্দে বিচরণ করিতেন, আধুনিক যুগে তাহার প্রত্যেকটির কোন-না-কোন সার্থকতা আছে। আমার বিশ্বাসবহু জিনিস, যাহা বুঝিতে পাবি নাই বলিয়া আমার দৃষ্টি অতিক্রম করিয়াছে, তাহা অন্য কাহারও জীবনে উপযুক্ত ক্ষেত্ৰ লাভ করিবে। আর প্রার্থনা করি, নিজের মনগড়া কোন কিছু জুড়িয়া না দিয়া, অথবা সত্যের অপলাপ ঘটে এমন রঙ না লাগাইয়া, আমি যেন সর্বদা সত্য সাক্ষ্য প্রদান করিতে পারি।
০৬. জীবের চৈতন্যদাতা
কলিকাতায় অবস্থানকালে শুনিয়াছিলাম, অধ্যাত্মজীবন এক সুনির্দিষ্ট এবং উপলব্ধির বস্তু, বিশেষ বিবেচনাপূর্বক উহা বরণ করিতে হয়, এবং কতকগুলি সুপরিচিত পন্থা অবলম্বনেই উহা লাভ করা যায়। হিমালয়ে পৌঁছিয়া দেখিলাম, উহার মূলকথা হইল-ভগবানের প্রতি গভীর আকুল প্রেমপ্রবল উৎকণ্ঠার সহিত সেই অনন্তের অন্বেষণ—যাহার যথাযথ বর্ণনা দিবার আশাই করিতে পারি না। আর আমার গুরুদেবের ইহাই বিশেষত্ব যে, অপরে যেখানে উপায়ের আলোচনাতেই ব্যস্ত, তিনি সেখানে রীতিমত আগুন জ্বালিতে পারেন। অপরে যেখানে একটা নির্দেশ মাত্র দেন, তিনি সেখানে বস্তুটিকেই ধরাইয়া দেন।
