কিন্তু, পাঞ্জাবে প্রবেশ করিয়াই আমরা স্বামীজীর গভীরতম স্বদেশ প্রেমের পরিচয় পাইলাম। সে সময়ে কেহ তাহাকে দেখিলে ধারণা করিয়া বসিতেন যে, স্বামীজী এই প্রদেশেই জন্মগ্রহণ করিয়াছেন! কত গভীরভাবে তিনি নিজেকে উহার সহিত একাত্ম করিয়াছিলেন। মনে হইত, ঐ প্রদেশের অধিবাসিগণের সহিত তিনি অনেক ভালবাসা ও ভক্তিব বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। যেন তাহাদের নিকট তিনি পাইয়াছেন অনেক, দিয়াছেনও অনেক। কারণ, তাহাদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন যাহারা জোর করিয়া বলিতেন, তাহাদের প্রথম ও শেষ গুরু-গুরু নানক ও গুরু গোবিন্দের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ স্বামীজীর চরিত্রে তাহারা লক্ষ্য করিয়াছেন। এমনকি, তাহাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সন্দেহপ্রবণ ব্যক্তিগণও তাহাকে বিশ্বাস করিতেন। আর যদি তাহার মতামত তাঁহারা মানিয়া লইতে না পারিতেন, অথবা যে ইউরোপীয়গণকে তিনি আপনার করিয়া লইয়াছিলেন–তাহাদের সম্পর্কে তাহার উচ্ছ্বসিত সহানুভূতি অনুমোদন না করিতেন, তাহা হইলে এই উদ্দামহৃদয় ব্যক্তিগণকে তাহাদের অপরিবর্তনীয় মনোভাব ও অটুট কঠোরতার জন্য যেন তিনি অধিকতর ভালবাসিতেন। যে পাঞ্জাবী বালিকা চরকা কাটিবার সঙ্গে সঙ্গে ‘শিবোহম’, ‘শিবোহম’, উচ্চারণ করিত তাহার কথা বর্ণনাকালে তাহার মুখমণ্ডল আনন্দে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিত। ঐ বালিকার সম্পর্কে আমেরিকাবাসী শিষ্যগণ পূর্বেই অবহিত হইয়াছিলেন। আবার এ কথা বলিতে ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে, এই পাঞ্জাব প্রদেশে প্রবেশ করিয়াই তিনি এক মুসলমান মেঠাইওয়ালাকে ডাকিয়া তাহার নিকট মুসলমানী খাবার কিনিয়া খান। জীবনের অপরাহ্নে কাশীতে অবস্থানকালে তিনি পুনরায় ঐরূপ আচরণ করেন বলিয়া জানা যায়।
কোন গ্রামের ভিতর দিয়া যাইবার সময় তিনি আমাদের দরজার মাথায় ঝোলানো গাঁদাফুলের মালাগুলি দেখাইয়া দিতেন। উহা দ্বারা গৃহগুলি হিন্দু পরিবারের বলিয়া বোঝা যাইত। আবার ভারতবাসীরা ‘সুন্দর’ বলিয়া যাহার আদর করেন, গায়ের সেই ‘কাঁচা সোনার বর্ণ’ তিনি দেখাইয়া দিতেন। ইউরোপীয়দের আদর্শ যে ঈষৎ রক্তাভ শ্বেত গাত্রবর্ণ, তাহা হইতে ইহা কত বিভিন্ন। অথবা আমাদের সঙ্গে লইয়া টাঙ্গাযোগে যাইবার সময় সব ভুলিয়া যে শিব-মাহাত্ম্য বর্ণনায় তিনি কদাপি ক্লান্তিবোধ করিতেন না, তাহাতেই মগ্ন হইয়া যাইতেন। লোক সমাগম হইতে বহুদূরে পর্বতশিখরে মহাদেবের অবস্থিতি–মানবের নিকট যাহার প্রার্থনা কেবল নিঃসঙ্গতা—যিনি এক অনন্তধ্যানে সমাহিত।
রাওয়ালপিণ্ডি হইতে গাড়ি করিয়া আমরা মারী যাই, এবং কয়েকদিন সেখানে অতিবাহিত করি। অতঃপর কতক টাঙ্গায়, কতক নৌকাযোগে কাশ্মীরের শ্রীনগর অভিমুখে গমন করি। পরবর্তী কয়েকমাস ভ্রমণকালে কাশ্মীর ছিল আমাদের প্রধান কেন্দ্র।
এই যাত্রাপথের সৌন্দর্যবর্ণনায় সহজেই আত্মহারা হইয়া যাইতে হয়। পার্বত্য অরণ্যানী, গীর্জার আকারে শোভমান বিতস্তা গিরিসঙ্কটের পাহাড়গুলি ও শস্যক্ষেত্ৰমধ্যে অদৃশ্যপ্রায় গ্রামগুলি ঐ পথের অন্তর্গত। ঐ সময়ের কথা স্মরণ করিলে এক সৌন্দর্যময় দৃশ্যপরম্পরা মানসপটে উদিত হয়। ঐ সকল চিত্রের মধ্যে কাশ্মীরের কৃষক রমণীর উপযুক্ত রক্তবর্ণের মুকুট পরিহিতা ও শ্বেত অবগুণ্ঠনযুক্তা সেই প্রাচীন রমণীর স্মৃতিও কম মধুর নয়। ঐ পথ দিয়া যাইবার সময় হার সহিত সাক্ষাৎ করিতে গিয়া দেখিলাম, তিনি এক খামারের মধ্যে অবস্থিত বিশাল চেনার বৃক্ষতলে পুত্রবধূগণ পরিবৃত হইয়া চরকায় সূতা কাটিতেছেন। তাহার সহিত স্বামীজীর এই দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। পূর্ব বৎসব স্বামীজী তাহার নিকট কোন ছোটখাট উপহার লাভ করেন। তাহার সম্বন্ধে এই গল্প করিতে স্বামীজী কখনও ক্লান্তিবোধ করিতেন না যে, বিদায় গ্রহণের পূর্বে তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করেন, “মা, আপনি কোন ধর্মাবলম্বী?” ঐ প্রশ্ন-শ্রবণে বৃদ্ধার মুখ আনন্দ ও গর্বে উদ্ভাসিত হইয়া ওঠে, এবং আনন্দোৎফুল্ল উচ্চকণ্ঠে স্পষ্টভাবে বলেন, “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, প্রভুর কৃপায় আমি মুসলমানী।”
অথবা শ্রীনগরের বহির্ভাগে অবস্থিত সমুন্নত লম্বার্ডিদেশসুলভ পারবীথির কথা এখানে উল্লেখ করিতে পারি। যেন হবিমা (Hobbema)-রচিত বিখ্যাত চিত্রখানির অবিকল অনুরূপ ‘ ভারত ও সনাতন-ধর্ম সম্পর্কে কত প্রসঙ্গই না আমরা এখানে শ্রবণ করিয়াছি!
অথবা ফসল কাটা শেষ হইবার পর শূন্য ক্ষেতগুলিতে গ্রামবাসিগণ যে প্রমোদানুষ্ঠান করিয়া থাকে, তাহার কথা বহুক্ষণ ধরিয়া বর্ণনা করিতে পারি। অথবা ইসলামাবাদের সেই উন্নত পপলার-তরুশ্রেণীতলে যে তাম্রাভ ‘অ্যামারাস্থ শস্য কিংবা সদ্যোজাত হরিদ্বর্ণ ধানগাছগুলি—তাহাদের কথাও বলিতে পারি। বনফুলের মধ্যে উজ্জ্বল নীলবর্ণের একজাতীয় ‘ফরগেট-মিনট’ গ্রীষ্মকালে কাশ্মীরের ক্ষেতগুলিতে অতি সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু শরৎ ও বসন্তকালে ক্ষেত ও নদীতীর ছোট ছোট বেগুনী ‘আইরিস’ ফুলে একেবারে ভরিয়া যায়। ঐ ফুলগুলির বর্শার মতো সুচাল পাতাগুলির মধ্যে বেড়াইতে বেড়াইতে উহাদের ঘাস বলিয়াই ভ্রম হয়। কোথাও পথেব পার্শ্বে ছোট ঘোট পাহাড় দৃষ্টি অবরোধ করিয়া দণ্ডায়মান। বোঝ যায়, ঐগুলি মুসলমানদের গোরস্থান। আইরিস কুসুমে আবৃত ঐ স্থানগুলি কি অসীম করুণ ভাবেরই না ইঙ্গিত করে।
