মে মাসের প্রথম হইতে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত আমরা কি অপরূপ দৃশ্যাবলীর মধ্য দিয়াই না ভ্রমণ করিয়াছি! আর প্রত্যেক নূতন স্থানে আসিবামাত্র কি অনুরাগ ও উৎসাহের সহিত স্বামীজী সেখানকার প্রত্যেক জ্ঞাতব্য বস্তুর সহিত আমাদের পরিচয় করাইয়া দিতেন! শিক্ষিত পাশ্চাত্যগণের ভারত সম্বন্ধে অজ্ঞতা এত অধিক যে, উহাকে প্রায় মূখতা বলা চলে; অবশ্য যাহারা চেষ্টা করিয়া এ বিষয়ে কতকটা জ্ঞান। আহরণ করিয়াছেন, তাঁহাদের কথা স্বতন্ত্র। সন্দেহ নাই, এ বিষয়ে আমাদের হাতে-কলমে শিক্ষার আরম্ভ হইল পাটনা বা প্রাচীন পাটলিপুত্র হইতে। রেলপথে পূর্বদিক হইতে প্রবেশ করিবার মুখে কাশীর ঘাটগুলির যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তাহা জগতের দর্শনীয় দৃশ্যগুলির অন্যতম। স্বামীজী সাগ্রহে উহার প্রশংসা করিতে ভুলিলেন না। লক্ষ্ণৌ শহরে প্রস্তুত শিল্প ও বিলাস দ্রব্যগুলির নাম ও গুণবর্ণনা বহুক্ষণ ধরিয়া চলিল। যে-সকল মহানগরী সৌন্দর্যে স্বীকৃতি ও ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে, শুধু তাহাদের বিষয় যে স্বামীজী আগ্রহের সহিত আমাদের মনে দৃঢ়ভাবে অঙ্কিত করিয়া দিতে প্রয়াস পাইতেন, তাহা নহে। আর্যাবর্তের সুবিস্তৃত খেত-খামার ও গ্রামবহুল সমতল প্রদেশ অতিক্রম করিবার সময় তাহার প্রেম যেরূপ উথলিয়া উঠিত, অথবা তাহার তন্ময়ভাব যেরূপ প্রগাঢ় হইত, এমন আর বোধহয় কোথাও হয় নাই। এইখানে তিনি অবাধে সমগ্র দেশকে অখণ্ডভাবে চিন্তা করিতে পারিতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি বুঝাইবার চেষ্টা করিতেন, কিরূপে ভাগে জমি চাষ করা হয়; অথবা প্রত্যেক খুঁটিনাটি সহ কৃষক-গৃহিণীর দৈনন্দিন জীবন বর্ণনা করিতেন; যেমন, সকালের জলখাবারের জন্য যে খিচুড়ি রাত্রি হইতে উনানে চাপানো থাকিত, তাহার কথাও উল্লেখ করিতেন। এ বিষয়ে সন্দেহ নাই যে, এইসব কথা আমাদের নিকট বর্ণনাকালে তাহার নয়ন যে প্রদীপ্ত হইয়া উঠিত, অথবা কণ্ঠ যে আবেগ ভরে কম্পিত হইত, তাহা নিশ্চিত তাহার পরিব্রাজক জীবনের স্মৃতিবশতঃ। কারণ, সাধুদের নিকট শুনিয়াছি, ভারতের আর কোথাও দরিদ্র কৃষক কুটিরের ন্যায় অতিথি সৎকার হয় না। সত্য বটে, তৃণশয্যা অপেক্ষা কোন উৎকৃষ্টতর শয্যা, এবং মাটির চালাঘর ব্যতীত কোন ভাল আশ্রয় গৃহস্বামিনী অতিথিকে দিতে পারেন না; কিন্তু তিনিই আবার বাটীর অপর সকলে যখন নিদ্রিত, নিজে শেষ মুহূর্তে শয়ন করিতে যাইবার পূর্বে একটি দাঁতন ও একবাটি দুধ এমন জায়গায় রাখিয়া দেন, যাহাতে অতিথি নিদ্রাভঙ্গে সকাল বেলা উহা দেখিতে পান, এবংঅন্যত্র যাত্রাকরিবার পুর্বে যথাযথ ঐগুলির সদ্ব্যবহার করিতে পারেন।
সময়ে সময়ে এরূপ বোধ হইত, যেন স্বদেশের অতীত গৌরবই স্বামীজীর মনঃপ্রাণ সম্পূর্ণভাবে অধিকার করিয়া রহিয়াছে। তাহার ঐতিহাসিক চেতনা অতিমাত্রায় বিকাশলাভ করিয়াছিল। এইরূপে, বর্ষার প্রারম্ভে একদিন যখন আমরা উত্তপ্ত অপরাহ্নে তরাই অঞ্চল অতিক্রম করিতেছি, তখন স্বামীজী যেন আমাদের প্রত্যক্ষ করাইয়া দিলেন যে, এই সেই স্থান, যেখানে ভগবান বুদ্ধের কৈশোরকাল অতিবাহিত হয় এবং বৈরাগ্য দেখা দেয়। বন্য ময়ূরগণ মনে করাইয়া দিল রাজপুতনা ও তাহার চারণদের পল্লীগাথা। কদাচিৎ কোথাও একটি হস্তী স্বামীজীর প্রাচীনকালে যুদ্ধকাহিনী বর্ণনা করিবার উপলক্ষ হইয়া উঠিল। সেই প্রাচীন যুগের ভারত যতনি বিদেশী-আক্রমণের বিরুদ্ধে এই জীবন্ত কামানরূপ সামরিক প্রকার খাড়া করিতে পারিয়াছিল, ততদিন পরাজিত হয় নাই।
বঙ্গদেশের সীমা অতিক্রম করিয়া আমরা যখন যুক্তপ্রদেশে প্রবেশ করিতেছি, তখন স্বামীজী আমাদের কাছে সেই সময়ে যে মহানুভব ইংরেজ তদানীন্তন শাসনকর্তৃপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তাঁহার বিচক্ষণতা ও কার্যপ্রণালীর কথা বলেন। মর্মস্পর্শী ভাষায় তিনি বলেন, “অন্যান্য শাসনকর্তা থেকে তার পার্থক্য এই যে, তিনি বোঝেন, প্রাচ্য দেশগুলিতে জনমত এখনও তেমন প্রবল হয়ে না ওঠায় শাসনভার ব্যক্তিবিশেষের ওপর থাকা আবশ্যক। সেজন্য কোন হাসপাতাল, কলেজ বা অফিসের লোক জানে না, কোন্ দিন তিনি পরিদর্শনের জন্য উপস্থিত হবেন। এবং অতি দরিদ্র ব্যক্তিও বিশ্বাস করে যে, একবার তার সঙ্গে দেখা করতে পারলেই তার কাছে সুবিচার পাবে।” প্রাচ্য দেশসমূহের শাসনব্যাপারে ব্যক্তিগত প্রভাবের গুরুত্ব অধিক, এই ভাবটি স্বামীজীর কথাবার্তায় বিশেষভাবে প্রকাশ পাইত। তিনি সর্বদা বলিতেন যে, বিচারের দৃষ্টিতে দেখিতে গেলে সমগ্র দেশশাসনের পক্ষে গণতন্ত্র বা ডিমক্রেসি সর্বাপেক্ষা অপকৃষ্ট শাসনপ্রণালী। তাহার অন্যতম প্রিয় ধারণা ছিল, এই সত্যটি উপলব্ধি করার ফলেই জুলিয়াস সীজার স্বয়ং সম্রাট-পদবী আকাঙক্ষা করেন। যাহার নিকট সর্বদা সহজে নিজ অভাব জানানো যায়, যাহার হৃদয়ে সহজে দয়ার উদ্রেক হয়, এবং যিনি অপরের মতামত উপেক্ষা করিয়া নিজের বিবেচনা মতো ন্যায়বিচারে সমর্থ-এরূপ কোন শাসনকর্তা বা সম্রাটরূপ ব্যক্তিবিশেষের পরিবর্তে রাজ্যে ক্রমিক বিভাগীয় ও উদাসীন আমলাতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের প্রবর্তন যে ভারতের দরিদ্র অধিবাসীর পক্ষে কত কষ্টকর হইয়া দাঁড়ায়, স্বামীজীর নিকট অনবরত শুনিয়া আমরা মধ্যে মধ্যে তাহা হৃদয়ঙ্গম করিতাম। কারণ, তাহার নিকট আমরা শুনিতে পাইলাম, ব্রিটিশ শাসনের প্রথমভাগে কত সরলচিত্ত ব্যক্তি যে লণ্ডনে উইগুসর প্রাসাদে ভারতেশ্বরী মহারানীর নিকট গিয়া সাক্ষাতে সমস্ত নিবেদন করিবার উদ্দেশ্যে নিজেদের যথাসর্বস্ব ক্ষয় করিয়াছে, তাহার ইয়ত্তা নাই। অধিকাংশ যাত্রীই এই নিষ্ফল যাত্রায় আশাভঙ্গ ও অভাবের মধ্যে নিজ নিজ গ্রাম ও বাড়িঘর হইতে বহুদূরে প্রাণ বিসর্জন করিয়াছে। জন্মভূমির দর্শনলাভ পুনরায় তাহাদের ভাগ্যে ঘটিয়া ওঠেনাই।
