প্রাচ্যে বহুবিধ প্রথা আছে, যাহা অদ্ভুত বলিয়া মনে হয়। ঐ সকল প্রথার মধ্যে আবার জাতির দিক দিয়া উচ্চ নহেন, এরূপ ব্যক্তির রন্ধন করা খাদ্য গ্রহণের বিরুদ্ধে যে সংস্কার, তাহা অতিশয় দৃঢ়মূল। আর এই বিষয়টি স্বামীজীর গুরুদেব মেয়েদের মতোই মানিয়া চলিতেন। কিন্তু তিনি নিজে যাহা খাইতেন না, প্রিয় শিষ্যকে তাহা অনায়াসে দিতেন। কারণ, তিনি বলিতেন, নরেন্দ্র ‘জ্বলন্ত আগুন’, সমস্ত অপবিত্রতা দগ্ধ করিয়া ফেলিবে। আবার বলিতেন, এই বালকের ভিতরে যে ঈশ্বরীয় সত্তা, তাহা পুরুষসত্তা, এবং তাহার নিজের হইল স্ত্রীসত্তা। এইরূপে প্রশংসার ভাব পোষণ করিয়া—যাহার সহিত প্রকৃত শ্রদ্ধার ভাবও মিশ্রিত ছিল, এই বিশিষ্ট বালকের উচ্চ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি একটি বিশ্বাসের সৃষ্টি করিয়া গিয়াছিলেন। তাঁহার দেহত্যাগের পর ঐ বিশ্বাস স্বামীজীর বিশেষ কাজে লাগিয়াছিল—উহাই তাহার সর্ববিধ কর্মকে প্রামাণ্য ও সমর্থন দেয়। কারণ, স্বামীজী ছিলেন সর্বপ্রকার বন্ধন মোচনের কর্তা। ইহাও একান্ত প্রয়োজনীয় ছিল যে, তাহার চারিপার্শ্বে এমন কয়েকজন থাকিবেন, যাহারা স্বামীজীর এবং অলস-আত্মসুখাম্বেষী ব্যক্তিগণের আচার-লঙ্ঘনের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ, তাহা হৃদয়ঙ্গম করিবেন। আমার ভারতবাসের প্রথম দিকে যে বিষয়টি প্রবলভাবে আমাকে বারংবার সর্বাপেক্ষা আকৃষ্ট করিয়াছিল, তাহা হইল, এই সঙেঘর অন্যান্য ভ্রাতৃগণ তাহাদের উপর ন্যস্ত কার্যের এই অংশ যারপরনাই নিষ্ঠার সহিত পালন করিতেন। গোড়া হিন্দুয়ানির কঠোরতম আচার-নিষ্ঠা, অথবা তপস্যার ঘঁচে যে-সকল ব্যক্তির জীবন গঠিত হইয়াছিল, তাহারাও তাহাদের নেতা কর্তৃক শিষ্যরূপে গৃহীত ইউরোপীয়গণের সহিত একত্র ভোজন করিতে রাজি ছিলেন। হয়তো মাদ্রাজে কেহ স্বামীজীকে জনৈক ইংরেজ ও তাঁহার স্ত্রীর সহিত একত্র আহার করিতে দেখিয়াছিল; হয়তো কেহ বলিল, পাশ্চাত্যে অবস্থানকালে তিনি কখন কখনও মদ্য-মাংস স্পর্শ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন; কিন্তু এই সকল কথায় তাহার গুরুভ্রাতৃগণের মুখে বিন্দুমাত্র উদ্বেগের চিহ্ন দেখা যাইত না। স্বামীজীর ঐ প্রকার আচরণের ভাল-মন্দ বিচার করা, কারণ দেখাইয়া বুঝাইয়া দিবার চেষ্টা করা, এমনকি, আদৌ উহার সঙ্গত কারণ বা যুক্তি ছিল কি না, তাহা জিজ্ঞাসা করাও তাহারা নিজেদের কর্তব্য বলিয়া মনে করিতেন না। তিনি যাহাই করুন, যেখানেই তাহাদের লইয়া যান, তাহাদের কাজ হইল, অবিচলিতভাবে তাঁহার পার্শ্বে স্থান গ্রহণ করা। আর একথা নিঃসন্দেহ যে, যিনিই এই দৃশ্যের আলোচনা করিবেন, তিনিই হৃদয়ঙ্গম না করিয়া থাকিতে পারিবেন না যে, স্বামী বিবেকানন্দ ব্যতীত শ্রীরামকৃষ্ণ-সঙ্ঘ যেমন অর্থহীন হইয়া দাঁড়াইত, এই গুরুভ্রাতাগণ পশ্চাতে না থাকিলে বিবেকানন্দের জীবন এবং পরিশ্রমও বিফল হইয়া যাইত। প্রাচীন সাধুগণের মধ্যে একজন সম্প্রতি আমাকে বলেন যে, স্বামী বিবেকানন্দকে তৈয়ারি করিবার তাই শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনধারণ। বাস্তবিক কি তাই! অথবা জগন্মাতার অখণ্ড মহত্তর বাণীর এক অংশকে অপর অংশ হইতে নিশ্চয়পূর্বক পৃথক করিয়া দেখা যেমন অসম্ভব, এই দুই মহাজীবনকেও পৃথক করিয়া দেখা কি তেমনই অসম্ভব নয়? এই সকল জীবন সম্যকরূপে আলোচনা করিতে গিয়া প্রায়ই আমার এইরূপ মনে হইয়াছে যে, শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ নামক একটি আত্মা আমাদের মধ্যে আবির্ভূত হইয়াছিলেন, এবং তাহারই জীবনালোকে বহুমূর্তি দৃষ্টিগোচর হইয়াছিল; কয়েকজন এখনও আমাদের মধ্যে বর্তমান; আর তাহাদের কাহারও সম্পর্কে পূর্ণ সত্যতার সহিত একথা বলা চলে না যে, তাহার নিজের অথবা অপর সকলের সহিত জড়াইয়া যে কর্মক্ষেত্র, তাহার এখানেই শেষ।
———–
(১) Ignatius de loyola (১৪৯১-১৫৫৬ খ্রীঃ)-ইউরোপের বিখ্যাত জেসুইট সম্প্রদায়ের প্রবর্তক। ইনি স্পেনের এক সম্ভ্রান্ত বংশোব সন্তান ছিলেন। প্রথম জীবনে যুদ্ধবিদ্যার চর্চা করেন। পরিশেষে একবার আহত হইয়া দীর্ঘকাল হাসপাতালে থাকেন। সেখানে উপন্যাসাদি নিঃশেষ হওয়ায় মহাপুরুষগণের জীবনী পাঠ কবিতে বাধ্য হন। এই পুস্তক পাঠের ফলে তাহার জীবনে প্রবল ধর্মভাব জাগরিত হয়। ১৫২২ খ্রীস্টাব্দে তিনি জেরুজালেমে তীর্থযাত্রা করেন। এই যাত্রাপথে তাহার মধ্যে অপূর্ব সেবাভাব ও তপস্যার বিকাশ দেখা যায়। ১৫৩৪ খ্রীস্টাব্দে তিনি ঈশা সমিতি (Society of Jesus) স্থাপন করেন। ১৫৪০ খ্রীস্টাব্দে এই সমিতি পুষ্টিলাভ করিয়া পোপ তৃতীয় পল কর্তৃক অনুমোদিত হয়। ১৬২২ খ্রীস্টাব্দে ইনি ‘সেন্ট’ আখ্যায় ভূষিত হন।–অনুঃ
(২) “স্বর্গে ঈশ্বরের নাম জয়যুক্ত হউক, এবং পৃথিবীতে মানবগণের মধ্যে শান্তি ও সদ্ভাব বিবাজ করুক!” –দেবদূতগণের গীতি
(৩) ১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দে এই যোগী হোমাগ্নিতে নিজ দেহ আহুতি দিয়া মানবলীলা সংবরণ করেন।
০৫. উত্তরভারত-ভ্রমণ
১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দের গ্রীষ্মকালটি আমার স্মৃতিপটে কতকগুলি চিত্রের ন্যায় বিরাজ করিতেছে। ঐ চিত্রগুলি যেন প্রাচীনকালের বেদীর পশ্চাতে অবস্থিত পর্দার উপর ধর্মানুরাগ ও সরলতারূপ সোনালী জমির উপর অঙ্কিত। আর প্রত্যেকটি চিত্রই একজনের উপস্থিতির দ্বারা মহিমান্বিত; তিনি আমাদের অন্তরঙ্গ ভক্তমণ্ডলীর মধ্যবিন্দু। আমরা ছিলাম চারজন পাশ্চাত্য নারী; একজন ম্যাসাচুসেটসের অন্তর্গত কেমব্রিজ-নিবাসী মিসেস ওলিবুল, এবং অপর একজন কলিকাতার উচ্চপদস্থ এ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান কর্মচারিবৃন্দের অন্যতম। গুরুভ্রাতা ও শিষ্যগণ-পরিবৃত স্বামীজী আমাদেরই পাশাপাশি ভ্রমণ করিতেছিলেন। আলমোড়ায় পৌঁছিয়া তিনি দলবলসহ সেভিয়ার-দম্পতির আতিথ্য গ্রহণ করেন। তাহারা ঐ সময়ে আলমোডায় অবস্থান করিতেছিলেন। আমরা কিছু দূরে একটি বাংলোয় স্থান গ্রহণ করিলাম। এইরূপে সকলেই অন্তরঙ্গ বলিয়া বেশ অবাধ স্বাধীনতার সহিত মেলামেশা করিবার সুবিধা হইয়াছিল। কিন্তু মাসখানেক পরে আমরা যখন আলমোড়া হইতে কাশ্মীর যাত্রা করিলাম, তখন সঙ্গিগণকে রাখিয়া স্বামীজী মিসেস বুলের অতিথিরূপে আমাদের সহিত যোগদান করেন।
