কিন্তু স্মরণ বাখিতে হইবে যে, কোন মহাপুরুষের জীবনের মূল মন্ত্রস্বরূপ কতকগুলি ধারণাকে তাহার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সহিত কার্যকারণ সম্পর্কে জড়িত করিলেই যে উহার সম্যক বিশ্লেষণ করা হইল, তাহা নহে। সেই মূল প্রেরণার কারণ নির্দেশ করিতে হইবে, যাহার ফলে অফুরন্ত শক্তি লাভ করিয়া একজন আর একজন অপেক্ষা এই দৃশ্যমান জগৎকে অধিকতর অর্থযুক্ত বলিয়া মনে করেন। শুনিয়াছি, আশৈশব বিবেকানন্দের এই অন্তর্নিহিত সংস্কার ছিল যে, দেশের উপকার করিবার জন্যই তাহার জন্মগ্রহণ পরবর্তী কালে এই কথা মনে করিয়া তিনি গর্ববোধ করিতেন যে, আমেরিকা-বাসের প্রথম দিনগুলিতে যখন তিনি অবস্থা-বিপর্যয়ের মধ্যে পড়িয়াছিলেন—যখন জানিতেন না, পরবর্তী আহারের জন্য কাহার দ্বারস্থ হইবেন, সেই সময়েও ভারতে শিষ্যগণকে যে সব পত্র লিখিয়াছিলেন, তাহাতে বিলক্ষণ জানা যায় যে, তাহার এই দৃঢ় প্রত্যয় ক্ষণকালের জন্যও বিচলিত হয় নাই। কোন বিশেষ কার্য সংসাধনের জন্য যে সকল মহাপুরুষের জন্ম, তাহাদের প্রত্যেকের মধ্যে এই প্রকার অদম্য আশা বিদ্যমান থাকে। ভাবী মহত্ত্বের এই গভীর চেতনা-বোধ ভাষায় প্রকাশ করিতে হয় না; জীবনেই উহার প্রকাশ ঘটিয়া থাকে। হিন্দুর চিন্তা প্রণালী অনুসারে, এই ভাবী মহত্ত্বের ধারণা ও আত্মাভিমান—এ দুয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ, এবং আমার মনে হয়, শ্রীরামকৃষ্ণের সহিত দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎকালে, স্বামীজীর জীবনে ইহার পরিচয় পাওয়া যায়। ঐ সময়ে শ্রীরামকৃষ্ণ কর্তৃক নিজের উচ্চ প্রশংসায় আকৃষ্ট হওয়া দূরে থাকুক, বরং তিনি বিশেষ বিমুখ হইয়াছিলেন, কারণ, তাহার মনে হইয়াছিল, এ সকল অতিশয়োক্তি মাত্র।
যখন দক্ষিণেশ্বর-দর্শনে আগত একদল লোকের সঙ্গে তিনি প্রথম আসেন, তখন তিনি অষ্টাদশবর্ষীয় বালক মাত্র। কোন এক ব্যক্তি সম্ভবতঃ তাহার কণ্ঠস্বরের অসাধারণ মাধুর্য ও সঙ্গীতে পারদর্শিতার বিষয় অবগত ছিলেন বলিয়া, তাহার গান গাহিবার কথা উত্থাপন করেন। উত্তরে তিনি ব্রাহ্মসমাজের ‘মন চল নিজ নিকেতনে” গানটি গাহিলেন।
উহাই যেন সঙ্কেতের ন্যায় কার্য করিল শ্রীরামকৃষ্ণ বলিয়া উঠিলেন, “বাবা, এই তিন বছর ধরে তোমার অপেক্ষায় আছি, তুমি এতদিনে এলে!” বলা যাইতে পারে, সেইদিন হইতে তিনি অনুগত বালকবৃন্দকে একত্র করিয়া এমন একটি সঙ্ঘে পরিণত করিতে ব্যাপৃত হইলেন, যাহাদের নরেন্দ্র’-এর (স্বামীজীর তখন উহাই নাম ছিল) প্রতি অনুরাগ চিরকাল অটুট থাকিবে।
তিনি যে মহা যশের অধিকারী হইবেন, সেই সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করিতে, অথবা তাহার অসাধারণ প্রতিভার উল্লেখ করিতে শ্রীরামকৃষ্ণ কখনও ক্লান্তিবোধ করিতেন না। যদি অধিকাংশ লোকের দুইটি, তিনটি অথবা দশ, বারোটি গুণ থাকে, তবে নরেন্দ্রের সম্বন্ধে তিনি কেবল বলিতে পারেন যে, তাহার সহস্রটি গুণ আছে; সত্যই তিনি সহস্রদল পদ্ম’। শ্রীরামকৃষ্ণ বলিতেন, যাহারা উচ্চ অধিকারী, তাহাদের মধ্যেও যদি কাহারও শিবত্বের লক্ষণ প্রকাশক দুইটি গুণ থাকে, তাহা হইলে নরেন্দ্রের অন্ততঃ ঐরূপ আঠারোটি গুণ আছে।
কোন ব্যক্তি ভণ্ড কি না, তাহা শ্রীরামকৃষ্ণ এরূপ বুঝিতে পারিতেন যে, সময়ে সময়ে তাহার দৈহিক যন্ত্রণা উপস্থিত হইত। একবার তিনি এক ব্যক্তিকে কিছুতেই আঁটি বলিয়া গ্রহণ করেন নাই, যদিও উপস্থিত সকলের মতে তাহার ধার্মিকতা স্বীকৃত হইয়াছিল। শ্রীরামকৃষ্ণের মতে, “সমস্ত বাহ্যাড়ম্বর সত্ত্বেও লোকটা ‘চুনকাম-করা কবর’! রাতদিনশুদ্ধাচাবে থাকা সত্ত্বেও ওর উপস্থিতি অপবিত্রকর, আর নরেন যদি ইংরেজের হোটেলে গোমাংসও খায়, তবুও সে পবিত্রই থাকবে—এতই পবিত্র যে, তার স্পর্শমাত্রে অপরে পবিত্র হয়ে যাবে।” এইভাবে নানা কথা বলিয়া তিনি ভবিষ্যতে নেতৃত্ব গ্রহণ করিবেন যে শিষ্য এবং অপর যাহারা তাহার সহায়ক হইবেন—এই উভয়ের মধ্যে কতকগুলি বিশেষ গুণের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত একটি স্থায়ী সম্পর্ক গড়িয়া তুলিবার চেষ্টা করিতেন।
শ্রীরামকৃষ্ণের অভ্যাস ছিল, কোন নূতন শিষ্য তাহার নিকট আগমন করিলে যতরকমে সম্ভব তিনি তাহার শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষা গ্রহণ করিতেন। কারণ, সুদক্ষ বৈজ্ঞানিকের নিকট একটি কলের নমুনা (মডেল) যেরূপ অর্থপূর্ণ, মানবশরীরের প্রত্যেক অঙ্গ-প্রতঙ্গ শ্রীরামকৃষ্ণেব শিক্ষিত দৃষ্টিতে ঠিক সেইরূপ অর্থপূর্ণ বলিয়া প্রতীত হইত। এই পরীক্ষাগুলির মধ্যে আবার একটি ছিল নবাগতকে ঘুম পাড়াইয়া নিদ্রাকালে তাহার অবচেতন মনের গতিবিধি লক্ষ্য করা। শুনিয়াছি, বিশেষ সংস্কারবান ব্যক্তিগণকে তিনি এই অবস্থায় নিজ পূর্বজন্মবৃত্তান্ত বর্ণনা করিতে দিতেন; এবং যাহারা নিম্ন অধিকারী, তাঁহাদের প্রশ্ন করিয়া ঐ বৃত্তান্ত জানিয়া লইতেন। নরেন্দ্র’কে প্রথমোক্তভাবে পরীক্ষা করিবার পর শ্রীরামকৃষ্ণ একদিন উপস্থিত সকলকে বলেন, যেদিন এই বালক জানিতে পারিবে সে কে, এবং কিরূপ উচ্চ অধিকারী, সেদিন মুহূর্তকালের জন্যও শরীর ধারণরূপ বন্ধন সে সহ্য করিতে চাহিবে না—সমস্ত অপূর্ণতসহ এই জীবন পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবে। ইহাতে শিষ্যগণ তৎক্ষণাৎ বুঝিতে পাবেন, এই জগতে পূর্ব পূর্ব জন্মে যাহা কিছু করিয়াছেন, সে সবই স্বামীজীর স্মরণে আছে। এই শিষ্যটির নিকট হইতে শ্রীরামকৃষ্ণ কোন ব্যক্তিগত সেবা লইতে পারিতেন না। পাখার বাতাস করা, তামাক সাজা, এবং অন্য সহস্র রকমের ছোটখাটো সেবা, সচরাচর গুরুর জন্য শিষ্যেরা যাহা করিয়া থাকে, সে সমস্তই শ্রীরামকৃষ্ণের জন্য অপরে করিত।
