এর ক-দিন পর সুরেশকে এক দীর্ঘ চিঠি লিখেছিলেন নিতাই আর সেই সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন নিজের সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস ‘পিছুটান’। সুরেশ তার কোনো উত্তর দেয়নি বা প্রাপ্তিস্বীকারও করেননি। তখন নিরুপায়, লজ্জিত নিতাই একটি দীর্ঘ চিঠি লিখেছিলেন সবিতাকে। তাতে তিনি সবিতাকে অনুরোধ করেছিলেন বাড়ির চাপে পড়ে সে যেন তাঁর সঙ্গে বিবাহে মত না দেয়। যদিও সবিতাকে বিয়ে করতে পারলে তিনি খুবই খুশি হবেন। বিয়ের কিছুকাল পরই নিতাই জানতে পারেন যে সে-চিঠি বাড়ির লোকেরা সবিতার হাতে পৌঁছোতে দেয়নি।
আর আজ এতকাল পর জীবনের প্রথম রোমান্টিক গল্পটিকে নতুন করে লিখতে গিয়ে নিতাই বুঝলেন যে, তাঁর কল্পনা শুকিয়ে গেছে আর জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো অতিনাটকীয়, যুক্তিহীন হয়ে পড়ছে। তার মনে হল, সুরেশই তার অদৃশ্য হাত দিয়ে নিতাইয়ের জীবনকাহিনি লিখে যাচ্ছে। অলৌকিক এক প্রভাব বিস্তার করে নিয়মিতভাবে তার প্রতিশোধ নিয়ে যাচ্ছে। নিতাই তাঁর গল্পের পৃষ্ঠাগুলি দামচা করে নিক্ষেপ করলেন ওয়েস্ট পেপার ব্যাগে। তারপর নতুন কয়েক শিট কাগজ নিয়ে একটা চিঠি লিখতে শুরু করলেন সবিতাকে। লিখলেন, গত বাইশ বছর ধরে সমানে ভেবে এসেছি একদিন সুরেশের কথা লিখব, কিন্তু সে আর হল না। একেক সময় ভাবি হয়তো সুরেশই অদৃশ্য হাতে লিখে যাচ্ছে তোমার আর আমার জীবন। যেভাবে অদৃশ্য থেকেও সে তোমার ওপর তার সমস্ত দাবি খাঁটিয়ে যাচ্ছে। একথা তোমার অজানা নয়, আমিই শুধু বোকার মতন এর থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারলাম কই?
তুমি যে সুরেশকে কতখানি স্মরণ করো তা আমি বুঝি। কারণ তুমি ভুলেও ওর নাম করো না। যা নিয়ে তুমি সবসময় কথা বলো, সবসময় মেতে থাকো আসলে সেগুলিই কোনো দাগ ফেলে না তোমার মনের ওপর। এ আমি জানি। সুরেশকে ভুলিনি বলে সুরেশকে নিয়ে লিখতেও পারিনি। আর এতদিন পর যখন চেষ্টাও করলাম দেখছি সেই নীরবতা ভঙ্গ হবার নয়। এক অতিনাটকীয় মৃত্যু বেছে নিয়ে সুরেশ আমার গল্পকাহিনিরও সীমানা পেরিয়ে চলে গেছে। সাহিত্য দিয়ে তাকে অনুসরণ করা অসম্ভব। ওর আত্মহত্যার যোগ্য প্রতিফলন হত আজ এই রাতে, এই গভীর রোমান্টিক পরিবেশে আমি যদি একমুঠো ঘুমের বড়ি জলে গুলে খেয়ে নিতে পারতাম। কিন্তু তাও হবার নয়। কারণ সাহিত্য করতে করতে বুঝেছি জীবনও সাহিত্যের কতকগুলো নিয়মনীতি মেনে চলে। বাইশ বছর বয়সের তরুণের আত্মহত্যা রোমান্টিক ঘটনা হলেও চুয়ান্ন বছর বয়সি কোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্বের আত্মহত্যা অযথা স্ক্যাণ্ডেলের বেশি কিছু না। আমি সেই অপমানের বোঝা কখনো তোমার ওপর চাপাব না। তবু এসব কথা তোমাকে না লিখেও পারছি না। কারণ আমি গত কয়েক বছর ধরেই একটু একটু করে অনুভব করে এসেছি যে, আমার সাহিত্যজীবন ফুরিয়ে গেছে। অনুপ্রেরণার সেই স্বচ্ছ, নির্বাধ ধারাটি শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। এই আমার যথার্থ মৃত্যু। কিছুকাল আগে তুমি অনুযোগ করে বলেছিলে, তুমি কেন আত্মজীবনী লেখো না? তখন আমি কী বলেছিলাম? বলেছিলাম, রসো, রসো, আগে গল্পটল্প লেখার দিন শেষ হোক। যখন কিছুই আর লেখার থাকবে না তখন আত্মজীবনী লিখতে বসব। লিখব, নির্মমভাবে, কল্পনার কোনোরকম আশ্রয় নিয়ে। আজ মনে হচ্ছে সেই লেখাও আর হবার নয়। সুরেশের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে নিজের কথা কী লিখব? আর সুরেশের কথা ভাবলে নিজেকে আর ততটা সমীহ করার মতন মানুষ বলে মনে হয় না। অন্তত যতটা সমীহ করলে নিজের জীবনকাহিনি লেখা যায়।
চিঠি শেষ করে নিতাই সেটিকে খামে ভরে ফেললেন, তারপর সেই খাম নিজের পাঞ্জাবির পকেটে রাখলেন। ফের একটা সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। দেখলেন দূরে সেতুর উপর দিয়ে দীর্ঘ কনভয় যাচ্ছে লরির। তাদের হেডলাইটের আলোয় সেতুর একটা অংশ সাদা হয়ে আছে। আজ সকালে ওই বিধ্বস্ত সেতুর উপর হাঁটতে গিয়ে নিতাইয়ের মনে হয়েছিল গভীর রাতে এর ওপর দিয়ে জলে ঝাঁপ দিলে সেটা কেমন হবে? বাঁধ কিংবা সেতুর উপর দাঁড়ালে প্রায়শই আজকাল এই চিন্তাটা হয় নিতাইয়ের। আর এখন এই দূর থেকে সেতুটির ওই আংশিক আলোকিত রূপ দেখে নিতাইয়ের মনে হলো, সবটাই নির্ভর করে কে আত্মহত্যা করছে, কেন করছে তার ওপর। আত্মহত্যার পরিবেশটাই সবসময় বড়ো ব্যাপার নয়।
আর এভাবে হঠাৎ নিজেকে আত্মহত্যারও অযোগ্য জ্ঞান হতেই নিতাই বারিকের মনটা ভয়ানক এক বিষণ্ণতায় ভরে গেল। ওঁর একটা কান্নার প্রবণতা হল। যেভাবে তিনি কদাচ তাঁর নায়কদের কাঁদতে দেন না। ভাবেন সেটা অতিনাটকীয় হবে।
ডাইনির চক
প্যারিস থেকে সাত-আট ঘণ্টার পথ দক্ষিণে। ছোটো শহরটার নামও আগে কোনোদিন শুনিনি। প্যারিসের সোরবন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠিনী মার্গেরিৎ প্রথম এই শহরটার নাম উল্লেখ করে বলেছিল, যে-কেউ এই একরত্তি শহরটায় যাক তার মনে হবে সে আগে কখনো এখানে এসেছিল। তা শুনে প্রায় আঁতকে উঠে আমার স্ত্রী ইন্দু বলল, সে কী! যে-ই যাবে তার মনে হবে সে আগে সেখানে গিয়েছে? তখন সমস্ত সন্দেহ নিরসন-করা এক হাসি ছড়িয়ে দর্শনের মেধাবী ছাত্রী মার্গেরিৎ রিশে বলেছিল, এগজাক্তাম। অর্থাৎ আলবত! তাতেও যে ইন্দুর কৌতূহল ও বিস্ময় খুব বুঝ মেনেছিল তা নয়, তার কারণ এর পরেও ও প্রশ্ন তুলেছিল, ব্যাপারটা তো ভূতুড়ে মনে হচ্ছে। ভদ্র ভাষায় বলতে গেলে অলৌকিক। তাই কি মার্গেরিৎ? তখন মার্গেরিৎ প্যারিসীয়দের দুরস্ত কায়দায় কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঠোঁট দুটো একটা কী জানি!’ ভাবে ফুলিয়ে আর মাথাটা এক পাশে ভালোরকম হেলিয়ে বলল, জ্যন সে পা। আমি জানি না। কিন্তু এটা সত্য। তোমরা স্বামী-স্ত্রী একটা ছুটিতে ওখানে বেড়িয়ে এসে দেখতে পারো। এরপর অনেকক্ষণ আমরা একটাও বাক্য ব্যয় না করে চিজ আর রুটির টুকরো চিবোলাম। শহরটার কখনো কোনোদিন যাব কি না ভাবছিলাম কিংবা সত্যিই কিছু ভাবছিলাম। না। অলৌকিক ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে বেশিক্ষণ কথা বললে পরে নিজেকে বেশ মূখ মূর্খ বোধ হয়। অথচ প্রথম ওই নীরবতা ভঙ্গ করে আমি যখন কিছু বললাম সেটা ছিল একটা প্রশ্ন, কী নাম তোমার ওই শহরটার মার্গেরিৎ? মার্গেরিৎ বলল, আমার কেন, শহরটা তোমারও হতে পারে, শংকর। আর নাম? নাম কারোন’।
