আর এই বাইশ বছর পর এক মৃত, বাইশ বছরের তরুণকে স্বজ্ঞানে নায়ক করে গল্প লিখতে গিয়েও নিতাই দেখছেন যে বাস্তবের ঘটনা আর শিল্পের যুক্তি সব সময় হাত ধরাধরি করে চলে না। যদি সত্য ঘটনা দিয়ে এই গল্পের শেষ করতে হয় তবে সুরেশকে ঘুমের বড়িগুলো একসঙ্গে জলের গেলাসে ফেলে গুলে নিয়ে এক ঢেকে গিলে ফেলতে হবে সমস্ত জলটা। কিন্তু নিতাইয়ের মনে হচ্ছে এই বাস্তব ঘটনাটাই কাহিনির একমাত্র ফন্দি, রোমান্টিক নিউসেন্স হয়ে প্রতিভাত হবে। যোগ্য সমাপ্তি হয় যদি সুরেশ তাঁর প্রেয়সীর বাড়িতে ছুটে যায়, গিয়ে দেখে সদ্য বিবাহিত সবিতা বিয়ের বেশে উজ্জ্বল হয়ে মুখে এক মিথ্যা বেদনার ভাব নিয়ে ঘরের এক কোণে বসে আছে। সুরেশ ওর হাতের বাণ্ডিলটা সজোরে রাখবে খাটের পাশে। লাল ফিতেতে বাঁধা ওই বাণ্ডিলে সুরেশকে লেখা সবিতার যাবতীয় প্রেমপত্র। সুরেশ কিছু বলার আগে ওকে দেখে চমকে উঠবে সবিতা, তুমি!!
-কেন, খুব দেরি করে ফেললাম কি?
–কেন, কেন এলে সুরেশ? আর তো কিছু হবার নেই, শোনা তুমি চলে যাও প্লিজ!
আমি চাই না আজ তোমাকে কেউ অপমান করুক। প্লিজ সুরেশ!
সুরেশ ওর পাঞ্জাবির পকেট থেকে এক সোনার হার বার করবে আর বলবে, আমার স্বৰ্গতা মা এই হারটি রেখে গিয়েছিলেন তাঁর ভাবী পুত্রবধূর জন্য। এই চিঠি আর এই হার তুমি রেখে দাও সবিতা। এ-চিঠি তুমি পুড়িয়ে ফেলো, কিন্তু এই হার বছরের কোনো একটি দিন পোয়রা। তাহলে আমার আত্মা শান্তি পাবে। আমি জানি নিতাইদা সংকীর্ণমনা নন, তিনি এইটুকু আকাঙ্ক্ষায় আমার বাদ সাধবেন না।
তখন সবিতা উঠে এসে চেপে ধরবে সুরেশের হাত। মুখে বলবে, তুমি আমায় ক্ষমা করো সুরেশ। এই বিয়ে কিন্তু আমি চাইনি। দাও, তোমার নিজের হাতে পরিয়ে দাও তোমার হার। আমি পরব।
সুরেশ সবিতার গলায় হারটা পরিয়ে দিয়ে পিছনে আংটা লাগাতে গিয়ে অনুভব করল ওর হাত হারের থেকে সরে এসে গেঁথে বসছে সবিতার গলায়। সবিতার শ্বাসরোধ হলেও গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরুতে পারছে না। যন্ত্রণায় ছটফট করছে ওর মুখ, ওর শরীর, আর ওর নাক দিয়ে গলগল করে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। সুরেশ বুঝতে পারছে সবিতা মারা যাবে, কিন্তু কিছুতেই নিজের হাত দুটোকে ফিরিয়ে আনতে পারছে না। সুরেশের নিজের মুখ দিয়ে অস্ফুটস্বরে শুধু বেরুল, আমি তোমায় ভালবাসি সবিতা। পরমুহূর্তে দ্বিগুণ শক্তিতে ওর হাত গেঁথে যেতে লাগল সবিতার গলায়। সুরেশ ভাবল, কী আশ্চর্য! প্রেম আর ঘৃণা কত নিকট আত্মীয়। কী সুখের সহবাস ওদের।
নিতাই বারিক বাংলোর বারান্দা ছেড়ে এসে নিজের লেখার টেবিলে ফের বসলেন। বাস্তবের আত্মহত্যা কিংবা এই মুহূর্তের কল্পনার হত্যা কোনোটিকে তাঁর যথেষ্ট সাহিত্যিক পরিণতি বলে মনে হল না। ওঁর সেই পুরোনো ধারণাটাই বেশ দানা বেঁধে উঠছে মনে জীবনকে অনুসরণ করে সাহিত্য করা যায় না। জীবন সত্যিই খুব অতিনাটকীয়। নাহলে যে সুরেশ তার বান্ধবীকে এনে পরিচয় করাল প্রিয় লেখক নিতাই বারিকের সঙ্গে পাকেচক্রে সেই মেয়েরই ফটো নিয়ে ঘটক একদিন হাজির হল নিতাইয়ের কাছে। আর বলল, নিতাইবাবু, আপনার মাকে বলে এসেছি আপনার ব্রহ্মচর্য এবার ভঙ্গ করবই। এমনই চমৎকার কন্যার সন্ধান এনেছি এবার। একবারটি এই ফটো দেখুন আর এই সব বলতে বলতে মানিব্যাগ থেকে বার করে আনল ছোট্ট পাসপোর্ট সাইজ ছবি। সবিতার। প্রথমে নিতাই হাসবেন না কাঁদবেন ভেবে উঠতে পারছিলেন না, তারপর প্রচন্ড এক চোট হাসিতে ফেটে পড়লেন তিনি। আর হাসতে হাসতেই বললেন, আরে! এ মেয়েকে তো আমি চিনি। সবিতা দে। আমার এক ভক্তের গার্লফ্রেণ্ড। কী যে সব করেন আপনারা! আমি তো মাকে বলেইছি আমি বিয়ে করব না। তাও কেন যে আপনারা লেগে আছেন। বলিহারি আপনাদের বাপু!
ঘটক এবার কান চুলকোতে চুলকোতে বলল, কী বললেন? কার গার্লফ্রেণ্ড যেন? নিতাই বেশ জোরের সঙ্গে তাকে নিরস্ত করে বললেন, আমার এক তরুণ ভক্ত পাঠকের। নাম সুরেশ মিত্র।
এবার একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ঘটক বলল, হুঁ! গার্লফ্রেণ্ড! আপনি কি ভাবছেন সে খবর আমি নিইনি! ওই যে সুরেশ না কি বললেন, ওর খবরও আমি নিয়েছি। ছাত্র ভালো ছিল, অঙ্ক না ভূগোলে এম এ পাস। কিন্তু যত রকমের বায়বীয় নেশা আছে সব কটিতে সিদ্ধহস্ত বাবু। গাঁজা, আফিং, ঘুমের বড়ি সব। তার ওপর আবার কবিতা-টবিতা লেখে। আর ওই ছেলের কি কখনো বিবাহ হয়? খাওয়াবে কী? নিজেই বা খাবে কী? না, না ওসব খবরটবর সব নেওয়া আছে আমার। এবার আপনি শুধু একটা ছোট্ট করে ‘হ্যাঁ’ বলুন।
নিতাই বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে বললেন, না না, এ হতে পারে না। আমাদের পরিচিত কারও বান্ধবীর সঙ্গে আমার বিয়ে হতে পারে না। বিশেষত মেয়েটিকেও যখন অত ভালো চিনি। আমার সঙ্গে বয়সেরও ঢের ফারাক, আপনি দয়া করে এ ব্যাপারে এগোবেন না।
ঘটক চলে যেতে বাস্তববাদী লেখক নিতাই তাঁর জীবনের প্রথম যথার্থ রোমান্টিক গল্পটি লিখলেন। নায়ক সুরেশ, নায়িকা সবিতা, ভিলেন নিতাই নিজে। গল্পে নামগুলো আলাদা হয়ে গেলেও সেটিতে ছাপাতে দিতে অহমিকায় বাঁধল নিতাইয়ের। একটা গোপন জেলাসি ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে সুরেশের প্রতি, আর এক দৃপ্ত, সুপ্ত কামনা সবিতাকে পাওয়ার জন্য। রাতে একতলায় খেতে যাওয়ার সময় পড়পড় করে ছিঁড়ে ফেললেন গল্পটি নিতাই এবং ভাতের প্রথম গ্রাসটি মুখে তুলতে তুলতে মাকে বললেন, মা আজ যে সম্বন্ধটা এনেছিল ঘটক তুমি সে-ব্যাপারে ইচ্ছে করলে খোঁজখবর নিতে পারো। রোজ এসে ঘ্যানঘ্যান করে লোকটা, এবার ঝামেলা চুকিয়ে দাও।
