মার্গেরিৎ কিন্তু কারোন শহরের কোনো বর্ণনা আমাদের কাছে করেনি। শুধু বলেছিল যে, দক্ষিণ ফ্রান্সের যেকোনো শহরের মতোই ছায়াঘেরা সুন্দর সুন্দর পল্লিতে সাজানো শহর এটা। আর বিক্ষিপ্তভাবে কিছু ইতিহাস ছড়িয়ে আছে। আর শহরের বড়ো বাজারটার গা ঘেঁষে একটা ছিপছিপে নদী বয়ে গেছে, যার কোনো একটা সাঁকোয় দাঁড়ালে কারোনকে মনে হয় পটে আঁকা ছবি। তাতে ইন্দু জানতে চেয়েছিল কোনো বিখ্যাত শিল্পী কখনো কারোনকে এঁকেছেন কি না। আর তখন ফের সেই মিষ্টি কায়দায় মুখ ভেটকে মার্গেরিৎ বলেছিল, কী জানি! সে তোমার কর্তাই বলতে পারবে, ও তো অনেক আর্টের বইটই ঘাঁটে। আমি ছবি টবি বিশেষ দেখিনি, কিন্তু কারোনে নেমে আমার কেনই জানি না মনে হল এই শহর আমার আগে দেখা। দেজা ভু! হ্যাঁ, এ তো আগে আমি দেখেছি।
বিকেলের পড়ন্ত আলোয় কারোনকে কোনো ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীর আঁকা ছবির মতোই লাগছিল যখন শহরের প্রধান সেতুর ওপর দিয়ে আমাদের বাস ঢুকছিল শহরে। ট্রেন-জার্নিতে কিছুটা ক্লান্ত ইন্দু আমার ডান কাঁধে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছিল। আমার বাঁহাতের আঙুলে একটা সিগারেট ধরা, কিন্তু বহুক্ষণ সেটাকে ঠোঁটে তুলতে ভুলে গেছি আমি। ছাইটা বড়ো হয়ে গেছে দেখে টোকা মেরে সেটাকে অ্যাশট্রেতে ফেললাম আর তাতে সিগারেটের আগুন ফের বড়ো আর স্পষ্ট হয়ে উঠল। আর আমার আবছা আবছাভাবে মনে পড়তে লাগল সেই সন্ধ্যেটার কথা, যেদিন তিনজন চাষি হাতে তিন-তিনটে প্রকান্ড মশাল নিয়ে কারোনে আমাদের বাড়ির ওপর চড়াও হয়েছিল। বিকটভাবে ওরা চিৎকার করছিল, বার করে দাও ওই ডাইনিকে! ওই ডাইনির জন্যই আমাদের জমির ফসল সব তছনছ হয়ে যাচ্ছে। বার করো, বার করো ওই ডাইনিকে! ওকে আজ আমরা পুড়িয়ে মারব।
আমি আর্মচেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিলাম আমার স্টাডিতে। আমার হাতের মহাকাব্য ‘ডিভাইন কমেডি’-র প্রথম পর্ব ‘ইনফের্নো’ বা নরক। অদূরে একটা ছোট্ট স্টুলে বসে আমার পরমাসুন্দরী স্ত্রী লিজা। আমি ‘ইনফের্নো’ থেকে পাত্তলো ফ্রঞ্চেস্কার প্রেমের উপাখ্যান ধ্বনি করে পড়ে শোনাচ্ছিলাম ওকে। অংশটা বোধ হয় একটু বেশি ভালো লেগেছিল লিজার (সবারই লাগে!) তাই দ্বিতীয়বার পড়ে শোনাতে বলছিল আমাকে। যখন বাইরে ওই চিৎকার, বার করে দাও ওই ডাইনিকে!
কে ডাইনি? কেন ডাইনি? আমি কিছুই জানি না, কিছুই বুঝতে পারছি না। কিন্তু আমার বুকের মধ্যে একটা দুপদাপ ভয়ের স্পন্দন হচ্ছে, যদিও আমি বিন্দুমাত্র ভয়ের তোয়াক্কা কখনো করি না। আমার ভয় ওই ‘ডাইনি’ শব্দটাকে, যে শব্দের গ্লানি সমাজের যেকোনো স্তরের যেকোনো নারীর ইহকাল-পরকাল লন্ডভন্ড করে দিতে পারে। আমার মায়েরও ভয় এই কারণে যে, আমাদের বাড়িতে মহিলা বলতে দু-জন। আমার মা আর লিজা। আর ওদের মধ্যে কেউ ডাইনি! অসম্ভব! অসম্ভব!! অসম্ভব!!! এ হতে পারে না। এ হল শয়তানের শেষতম শয়তানি! আমি মহাকাব্য টেবিলে ছুড়ে ফেলে বাবার টোটাভরা পুরোনো গাদা বন্দুকটা ঘরের কোণ থেকে হাতে তুলে নিয়ে সদর দরজায় এসে দাঁড়ালাম। আর এক ফাঁকে মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম স্বৰ্গত পিতাকে যিনি খুব অল্প বয়স থেকেই আমাকে পিস্তল আর বন্দুক ছোড়ায় তুখোড় করে তুলেছিলেন।
আমি সদরের দরজা খুলে দাঁড়িয়েছি আর ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে তিন-তিনটে মশালধারীকে বাড়ির সিঁড়ির তলা থেকে এক-পা, দু-পা করে পিছিয়ে রাস্তার ওপারে হটে যেতে দেখছি। মশালের আলোয় তিনটে মানুষকে আমার তিনটে মুখোশ বলে মনে হচ্ছে। যে মুখোশের পিছনে রাগে জ্বলন্ত তিনি জোড়া চোখে কিছু ভয় আর কিছু বিহ্বলতাও ফুটে উঠেছে। কিন্তু তাতে আমার নিজের ভেতরের রাগ কিছুমাত্র কমল না, বুকের দুরুদুরু ভাবটা কোথায় উবে গেছে আর সেখানে একটু একটু করে জায়গা করে নিচ্ছে একটা আহত অহংকারের জ্বালা। আমি ওই অন্ধকারের তিন মশাল আর তিন মুখোশের দিকে বন্দুক উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠলাম, কে ডাইনি? বল কে ডাইনি?
আমার তন্দ্রার ভাবটা চটকে গেল কার গলার আওয়াজে। আমার ঠিক সামনে বসা বাসের ড্রাইভার, সে বাসের কনডাক্টরও বটে, শুনি আমার উদ্দেশ্যে ঘাড় ঘুরিয়ে বলছে, মসিয়র, আপনি তো শহরের কেন্দ্রে যাবেন বলেছিলেন। এটা তো ডাইনির চক। আপনি কি এখানেই নামতে চান? আমি বুঝে উঠতে পারলাম না আমি ডাইনির চকের কথা কখন ওকে বললাম, যখন জায়গাটার নামই এই প্রথম শুনছি। কিন্তু জায়গার নামটা আমার মনে ধরেছে, আর মনের কোথায় যেন একটা আবছা আবছা ছবিও ফুটে উঠছে। ইন্দুরও ঘুম কেটে গিয়েছিল। ও বলল, তুমি ‘ডাইনি! ডাইনি!’ করে ডেকে উঠলে কেন? তুমি নামবে এখানে? আমি বুঝতে পারলাম না কখন কী বলে কেন ডেকেছি। কিন্তু আমি এতক্ষণে মনস্থির করে ফেলেছি। আমি এখানেই নামব। ডাইনির চক দিয়েই শুরু হবে আমার কারোন আবিষ্কার। আমি হাতের সুটকেস আর জ্যাকেটটা নিয়ে সিট থেকে উঠে পড়ে ড্রাইভারকে বললাম, হ্যাঁ মসিয়র। আমাদের এখানে একটু নামা দরকার।
ডাইনির চক বলে যেকোনো শহরে একটা বিশিষ্ট এলাকা থাকতে পারে তা আমি কারোনে না এলে কোনোদিন জানতেও পারতাম না। যে বাসস্টপে নামলাম সেখান থেকে দশ-বিশ পা পিছিয়ে আসতেই একটা চৌমাথা পেলাম যার মাঝখানে একটা ছোটো ওবেলিস্ক। নিকষ কালো পাথরে গড়া। তার চারপাশে তিন ধাপ করে সিঁড়ি। আমরা রাস্তা পার হয়ে ওবেলিস্কের সিঁড়িতে পা ফেলতেই নজরে এল পাথরের থামের নীচের ঝাপসা সোনালি অক্ষরে আঁকা একটা উলটো করে বসানো ক্রস। যা শুনেছি কোনো কোনো ডাইনি-পীঠের সিম্বল। তার তলায় আরও অস্পষ্ট করে লেখা একটা তারিখ। তারিখ মুছে গেছে, আবছাভাবে সনটা এখনও নিজেকে জাহির করছে—১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ। আমার মাথার ভেতর একটা ভয়ানক হোঁচট খেলাম। ১৭৬০! ১৭৬০!! ১৭৬০!… আমার মনে পড়তে লাগল একটা সন্ধ্যা আমি তিন তিনটে মশালকে তাক করে গুড়ম, গুড়ম করে বন্দুক দাগছি। চারদিকে প্রচন্ড আর্তনাদের ধ্বনি। ঘরের ভেতর থেকে লিজা ছুটে বেরিয়ে এসে আমাকে মিনতি করছে, ওগো! একী করছ তুমি? বন্দুক ফেলো। চলো এ বাড়ি, এ শহর, এ দেশ থেকে আমরা পালিয়ে যাই দূরে কোথাও, যেখানে কেউ আমাদের খোঁজ পাবে না। যেখানে কেউ আমাকে নিষিদ্ধ বই পড়ার জন্য ডাইনি বলবে না? যেখানে কেউ তোমাকে আজকের এই ঘটনার জন্য খুনি বলে তাড়া করবে না। চলো, প্লিজ, লক্ষ্মীটি আমার।
