নিতাই বারিক একটা সিগারেট ধরিয়ে ঘরের প্রান্তে আধা-ঝুলন্ত বারান্দাটায় গিয়ে দাঁড়ালেন। আর বহুক্ষণ পর তাঁর এই প্রথম মনে পড়ল যে আজ তিনি বরাকর নদীর পাশে মাঝারি মানের এক ডাকবাংলোয় এসে সাহিত্য করছেন। কলকাতায় তাঁর ফ্ল্যাটেও এমনই আলো-আঁধারি পরিবেশে বসে লেখেন তিনি, কিন্তু সেখানে বারান্দায় এসে দাঁড়ালে এমন উত্তাল হাওয়া নেই, এমন চোখ ধাঁধানো নদীর বিস্তার, চরের বালির চিকচিকি, একফালি চাঁদশোভিত আকাশের ফ্যাকাশে অন্ধকার নেই। ভাবুক হয়ে পড়ার মতন যতটুকু যা দরকার তার সবটাই আছে এই পরিবেশে, শুধু সেই রোমাঞ্চ নেই যা হঠাৎ-হঠাৎ করে এক সময় নিতাইয়ের গল্প উপন্যাসের মোড় ঘুরিয়ে দিত।
লেখা আর আগের মতন সরল স্ফুর্তিতে আসে না নিতাইয়ের কলমে। প্রথম লাইন থেকে শেষ লাইনটি অবধি একটা নিরন্তর কসরত চলে ওঁর ভাষা, টেকনিক, বিষয়, কালি ও কাগজের মধ্যে। যৌবনের উচ্ছাসের টানে পাতার পর পাতা তরতর করে ভরিয়ে চলতেন নিতাই, আর এই ব্যস্ত বিখ্যাত প্রৌঢ়ত্বে সমান প্যাঁচ কষে কষে এগোনোই সার। স্মৃতি হাতড়ে দুটো-চারটে জিনিস হয়তো এখনও খুঁজে পান নিতাই, কিন্তু বাকি সবটাই একটা ক্লান্ত মস্তিষ্কের কল্পনার খেলা। কল্পনাকে খোরাক জোগাতেও নিতাই কখনো পেছপা নন; একটা বাহানায় প্রায়ই কোথাও না কোথাও ঘুরে বেড়িয়ে আসছেন। আজ পাহাড়, কাল নদী, পরশু সমুদ্র—এভাবেই চলছে। কিন্তু বাঁধ বসানো বরাকর নদীর এই স্রোতধারার মতন বহুকাল যাবৎ-ই ওঁর কল্পনাও প্রায় মৃত। দিন দিন টেকনিক সর্বস্ব হয়ে ওঠা ওঁর রচনায় সব চেয়ে বেশি জখম হয়েছে ওঁর কল্পনা। কোনো কাহিনিই তাঁর আর নিজের মতন শেষ হয় না। কোথাও না কোথাও একটা ফন্দির প্রয়োজন হয়, আর সেই ফন্দি অন্যে ধরতে পারুক, না পারুক নিতাইয়ের নিজের কাছে অনবরত একটা পরিহাসের মতন ধরা দেয়।
রোমান্টিক গল্পের ডাকসাইটে লেখক নিতাই বারিকের কাছে এরকম একটা আধুনিক ফন্দি হল আত্মহত্যা। নায়ক কিংবা নায়িকার এহেন একটা মৃত্যুর পর অতিরিক্ত প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায়ভার থেকে অব্যাহতি পান নিতাই। পাঠকের চোখে জল, বুকে বেদনার সঞ্চার হলেও নিতাইয়ের নিজের মধ্যে প্রায়শই একটা অক্ষমতা জনিত পাপবোধ থেকে যায়। ইদানীং তাই নিজের গল্পের মুদ্রিত চেহারার দিকে চোখ ফেরাতেও অনীহা জাগে ওঁর। প্রায়ই রাতে স্ত্রী সবিতার পাশে শুয়ে শুয়ে ভাবেন, হায়! কী জীবন। এই মহিলাটির প্রতি ভালোবাসা আর নিজের লেখালেখির প্রতি আকর্ষণ সবই যেন একই সঙ্গে নিঃশেষ হয়ে গেল। এ সমস্ত ভাবনা মাথায় জড়ো হলে নিতাই উঠে ফ্ল্যাটের বারান্দায় এসে দাঁড়ান আর নীচে ফুটপাথে টান টান হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে থাকা, ঠেলাওয়ালা, বিচালিওয়ালাদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবেন, ওদের এই ঘুমের মধ্যে যে স্বতঃস্ফুর্ত জীবন আছে তা আমার জীবনের কোনো কিছুতেই নেই। যখন আমি জেগে থাকি তখনও আমার চেয়ে বেশি মৃত কেউ নয়।
বাংলোর বারান্দা থেকে নিতাই বারিক ওঁর সিগারেটটা ছুড়ে ফেললেন বরাকরের জলে। কিছুদূর অবধি অন্ধকারে সিগারেটের আগুনটাকে ছুটে যেতে দেখা গেল, তারপর সবই ফের পূর্বের মতন নীরব এবং অন্ধকার। নিতাইয়ের বুক ভেদ করে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল, যার ম্লান আওয়াজ ওঁর কানে গিয়ে ধাক্কা দিল। নিতাই চিন্তা করার চেষ্টা করলেন—কী এমন অসংগতি ওঁর জীবনে যে নিজের কোনো অভিজ্ঞতাকেই তিনি আর আগের মতন বিশ্বাস করতে, বিশ্বাসযোগ্যভাবে লিখে উঠতে পারেন না। উপরন্তু তিনি যা কিছুই স্মৃতি থেকে লেখার প্রয়াস করেন তাতেই যেন কোত্থেকে কিছুটা অবাস্তবতা এসে মিশে যায় এক সময়। কিছুকাল আগে সবিতাকে নিয়ে একটা গল্প লিখতে গিয়েও ঠিক এই সমস্যা উপস্থিত হল। কিছুটা লেখার পরেই চোখ বুলোতে গিয়ে ওঁর মনে হল সবিতা কখনোই এভাবে এসব কথা কাউকে বলে না। মিথ্যে অভিমান সবিতার মধ্যে একেবারেই নেই, এবং সবিতা কোনোদিনই একলা একলা ঘরে বসে স্বগতোক্তি করার লোকই না। নিজের সংশয় দূর করতে নিতাই লেখাটা একবার সবিতাকে পড়তে দিলেন, অথচ নায়িকা সুচিত্রার সঙ্গে একটি জায়গাতেও সবিতা নিজের কিছুমাত্র সাদৃশ্য খুঁজে পেল না। পেলে অন্তত একবার সে-কথা বলত সবিতা। স্বামীর লেখায় নিজের প্রতিফলন দেখলে সেটা চিনে ফেলতে সবিতার কিছুমাত্র দেরি হত না। কিন্তু বহুদিন হয়ে গেল ওকে নিয়ে সম্ভবত নিতাই লেখা বন্ধ করে দিয়েছেন। সবিতা এমন কথা ভেবে থাকলেও নিতাই জানেন কত অসংখ্যবার ইদানীং তিনি ক্রমাগত সবিতাকে ভেবে ভেবে তাঁর নায়িকাদের চিত্রিত, চরিত্রায়িত করেছেন, কিন্তু প্রতিবারই কিছুদূর এগিয়েই খেয়াল হয়েছে কল্পনার নারীটি আসলে কল্পনাই থেকে গেছে, সবিতার জীবন থেকে কোনো সত্য তাতে গিয়ে মেশেনি। শেষমেশ নিতাই প্রায় ধরেই নিয়েছেন যে সাক্ষাৎ বাস্তবকে কখনো সাহিত্যে মূর্ত করা সম্ভব নয়। অন্তত তাঁর পক্ষে কখনোই সম্ভব না। অথচ নিতাইয়ের মনের গভীরে যে চিন্তাটি ক্রমাগত খচখচ করে উঠছিল সেটিকে কিছুতেই মেনে নিতে ওঁর সাহসে কুলোল না। বাইশ বছর টানা ঘর করেও সবিতাকে যে তিনি তেমন গভীরভাবে চিনে উঠতে পারেননি এই সরল সত্যটুকুকে কিঞ্চিৎ প্রশ্রয় দিতেও নিতাইয়ের অহমিকায় বাঁধে। এর পরবর্তী সংলগ্ন সত্যটি আরও ভয়ংকর বলে নিতাই অতদূর অবধি কখনোই ভাবেন না, ভাবার অভ্যাসই নেই। সবিতার জন্যই যে সুরেশ বিষ খেয়েছিল এই চিন্তাকে এই বাইশ বছর ধরে মনের এক অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দি রেখেও যে সেটিকে মারতে পারেননি নিতাই সেজন্য নিজেকে ছাড়া আর কাউকে ধন্যবাদ দেবার নেই। সবিতা এতদিনে একটিবারও সুরেশের নামোচ্চারণ করেনি, এমন কোনো প্রসঙ্গও এতদিনে ওঠেনি যাতে কিছুক্ষণের জন্যও সুরেশকে আলোচনা করা যায়। আরও বড়ো কথা, পুরো বাইশ বছর ধরে নিজের এক গুণমুগ্ধ, উচ্ছাসী পাঠককে কীভাবে যে ভুলে থাকার সচেতন প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন নিতাই তা যে-কোনো মনস্তত্ত্ববিদকে স্তম্ভিত করতে পারে। নিতাইয়ের গল্প উপন্যাসকে যদি পরোক্ষভাবে কোনো কিছু প্রভাবিত করে থেকে থাকে তবে তা হল সুরেশের স্মৃতি, সুরেশের আত্মহত্যা। এক বাস্তববাদী লেখক থেকে নিতাইয়ের জটিল, রোমান্টিক লেখকে রূপান্তরের নির্ভুল কারণও ওই স্মৃতি, ওই আত্মহত্যা।
