ও একটা ছোট্ট ট্রে-তে দু-কাপ কফি রেখে ট্রে-টা ধরে হাঁটতে লাগল বসার ঘরের দিকে। আমি ওর পিছন-পিছন হাঁটলাম আর শুনলাম ও বলছে, আর এও বুঝেছি যে বইগুলো ঘেঁটে আপনার এতটুকুও কৌতূহল মেটেনি।
আমি বেশ অবাক হওয়া সত্ত্বেও বেশ রাশভারী মেজাজে বললাম, বটেই তো। খাঁচার প্রাণীটার সঙ্গে বইয়ের কোনো একটা ছবি বা লেখার কোনো মিল পেলাম না।
-তাতে কী প্রমাণ হল?
আমাকে কফির কাপ তুলে দিতে-দিতে প্রশ্ন করল মারিয়ান। আমি বললাম, প্রমাণ এটাই হয় যে বনমানুষ, আদিমানব বা নরপিশাচ সম্বন্ধে আমাদের ধারণার কোনো বাস্তবতা নেই।
মারিয়ান বলল, আর চিড়িয়াখানার জীবটা সম্পর্কে কী মত আপনার?
-ওটাও হয়তো একটা ধড়িবাজি। যদিও একটা খটকা থেকেই যাচ্ছে…
–কী খটকা?
–খটকা হল যে ঠিক অমন একটা জন্তুর কথা আমার ঠাকুরমা গল্প করে বলেছিলেন। পরে সেই বর্ণনার মতো একটা জন্তু আমি স্বপ্নেও দেখেছিলাম। আর তারপর এক সন্ধ্যেবেলা ঠিক সেই জীবটাকেই বসে থাকতে দেখেছিলাম আমাদের বাড়ির ছাদে। কিন্তু…
—কিন্তু সেটা যে সত্যিই দেখেছিলেন না স্বপ্নের ঘোরেই…
মারিয়ান হঠাৎ একটা সুদূর কণ্ঠস্বরে বলল, কিন্তু এখন যদি তাকে ফের সামনাসামনি দেখতে পান, তা হলে বিশ্বাস হবে? আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, এখন দেখতে পাব মানে?
প্রশ্নটা শেষ হয়েছে কি হয়নি হঠাৎ দেখি মারিয়ানের তন্বী, সুন্দর দেহটা ক্রমশ রোমশ হয়ে উঠেছে। নীল, স্বপ্নিল চোখ দুটো ক্রমশ রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে। দাঁতগুলো হয়ে উঠছে ধারালো, আর দু-ধারের দুটো দাঁত বড়ো হয়ে হয়ে ঠেলে বেরিয়ে আসছে ঠোঁটের দু-পাশ দিয়ে। আর বনমানুষের মতো সদ্য গজানো ধারালো নখ সামনে মেলে ধরে মেয়েটি (নাকি জন্তুটি?) একটু একটু করে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। আমি পরিষ্কার বাংলায় ‘মাগো’! বলে চিৎকার করে হাতের গরম কফির কাপটা ওর কপাল টিপ করে ছুড়ে মেরে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে সিঁড়ি দিয়ে দুদ্দাড় করে নামতে লাগলাম।
কীভাবে যে রাস্তা চিনে হোটেলে ফিরলাম জানি না। ফিরে অন্ধকার ঘরেই সুটবুট পরেই বিছানায় সেঁধিয়ে ছেলেবেলার সেই ভয়ংকর স্বপ্নটা দেখতে শুরু করলাম। তারপর মারিয়ানের ঘরের দৃশ্যটা চোখে ভেসে উঠলে আমি নিশ্চয়ই জ্ঞান হারালাম। কারণ তারপর আর আমার কিছুই মনে নেই।
জ্ঞান ফিরল সকালে হোটেলের চেম্বারমেডের বেল-এ। উঠে গিয়ে দরজা খুলতে গিয়ে টের পেলাম আমার সারাগায়ে বেদম ব্যথা আর মাথা অসম্ভব ভার। চেম্বারমেডকে ‘গুডমর্নিং!’ করে ওঁর হাতের খবরের কাগজটা নিলাম। আমার অবস্থা দেখে ভদ্রমহিলা বললেন, কী হল আপনার? জ্বর? বললাম, জানি না। তবে শরীর বেশ খারাপ। প্যান্ট্রিকে বলে আমায় একটু কফি আনিয়ে দিন। ভদ্রমহিলা বললেন, তা দোব খন। তার আগে হোটেলের ডাক্তারটাকে একটা ফোন করে দিই। এই বলে চেম্বারমেড বেরিয়ে গেলেন।
আর আমি কাগজটা মেলে ধরলাম সামনে দিনের হেডিংগুলো ঝালিয়ে নেব বলে। কিন্তু প্রথম হেডিংটাতেই চোখ আটকে গেল—’মোরফিল্ডের রহস্যময় জন্তুর রহস্যময় অন্তর্ধান! আমি ব্যাপারটা লেজমুড়ো কিছুই না বুঝে আরও পড়তে লাগলাম। দেখলাম খবরে বলছে যে কাল বিকেল থেকে রহস্যময় জীবটাকে আর চিড়িয়াখানায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যে সময়টার কথা উল্লেখ করেছে সে-সময়ে আমি মারিয়ানের ফ্ল্যাটে প্রাণ নিয়ে পালাচ্ছি।
ইংল্যাণ্ডের বিজ্ঞানীরা আদিমানব ব্যাপারটাকেই ধাপ্পাবাজি বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। যে কর্নেল ফক্স জন্তুটিকে স্কটল্যাণ্ডের পাহাড় থেকে ধরে এনেছিলেন তিনি সাংঘাতিক জেরার মুখে পড়ে গা ঢাকা দিয়েছেন। দেশ জুড়ে প্রবল হইচই আদিমানব কেচ্ছা নিয়ে। কেউ কেচ্ছা
ফাঁস করার সূত্র দিলে পুলিশ থেকে পুরস্কার দেবে বলে জানিয়েছে। আদিমানব স্ক্যাণ্ডালকে জাতীয় কেলেঙ্কারি আখ্যা দিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী।
অথচ বিকেল-বিকেল বাড়ি পালিয়ে এসে আমি এসবের কিছুই জানতে পারিনি। আমার মনে পড়ল মারিয়ানকে আর ওর ফ্ল্যাটের সেই ভয়ংকর ঘটনা। তবু রহস্যের শেষ দেখব বলে পকেট হাতড়ে ওর টেলিফোন নম্বর বার করে লবিতে গেলাম ফোন করতে। কিন্তু মারিয়ানের বদলে ফোন ধরল একজন পুরুষ। বলল সে পুলিশ। মারিয়ানের ঘরে তদন্ত তল্লাশি, আঙুলের ছাপ নেওয়া চলছে। কাল বিকেলে একটা পাথরের কাপ ছুড়ে মেরে কেউ মেয়েটিকে হত্যা করে গেছে। আমার হাত থেকে টেলিফোনের রিসিভারটা দড়াম করে পড়ে গেল নীচে।
জীবনের অনুকরণে
গল্পের শেষ বাক্যটি লেখা যখন বাকি নিতাই বারিক তখন তাঁর খাতার পাশে ঝরনা কলমটা নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। প্রেমের গল্পের শেষ লাইনে নায়কের আত্মহত্যা দিয়ে সহজ সমাধানের পথে পা ফেলতে লজ্জা হল নিতাই বারিকের। আত্মহত্যা জীবনে আকছার ঘটলেও গল্পকাহিনিতে যেভাবে তা দেখানো হয় তাতে নিতাই বারিকের বড়ো একটা সায় নেই। গল্পের পক্ষে বড়ো রোমান্টিক ঘটনা আত্মহত্যা, বড়ো ফুলেল, মধুর পরিণতি।
নাঃ! এভাবে নয়, বলে উঠে পড়লেন নিতাই। তিনি উঠে দাঁড়াতেই টেবিল ল্যাম্পের আলোয় ঈষৎ উদ্ভাসিত ঘরের দেওয়ালে বিশাল একটা ছায়া গড়ে উঠল। নিতাই ভাবলেন, ওই ছায়ার মতন নায়ক সুরেশের আত্মহত্যাটিও একটা অতিকায় অবাস্তব হয়ে ঝুলে থাকবে গল্পের শেষে। অথচ সুরেশকে আমি বেঁচে থাকারও যথেষ্ট পরিবেশ বা অনুপ্রেরণা দিইনি।
