ঠাকুরমার গল্প শোনার পর থেকেই সারাক্ষণ মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল সেই বনমানুষটার চেহারা। ধূসর বর্ণের লোমশ শরীর, ধারালো নখ আর দাঁত। তার মধ্যে দুটো দাঁত মুখের বাইরে বেরিয়ে আছে। চোখ দুটো ভাঁটার মতো লাল যার চোখের পাতা ঘনঘন পড়ে যাচ্ছে। এই সবই ভাবছিলাম সারাক্ষণ, মনের চোখে এরকম একটা চেহারাই ভাসছিল সিনেমার ছবির মতো। আর বাইরে আকাশে গোধূলির আলো আস্তে আস্তে নিভে আসছিল। হঠাৎ দূর থেকে একটা জোরালো চিৎকার শুনলাম ডোকাট্টা। এটা পাড়ার মস্তান ভানুদার চিৎকার। নিশ্চয়ই কারও একটা ঘুড়ি কেটে দিল ভানুদা। এটা মনে হতেই আমি মনের সব আজগুবি চিন্তা তাড়িয়ে ছুট্টে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম আলসের উপর। যে-দৃশ্য দেখলে মা বা কাকা আমার হাড়মাস পিটিয়ে এক করে দিত। কোনো পরিস্থিতিতেতেই আমার আলসেতে চড়া বারণ। অথচ ‘ডোকাট্টা’ ধ্বনিটা শুনলেই আমার মাথার ভিতরে সব তালগোল পাকিয়ে যায়। নিশির ডাকের মতো ওই ডাক আমাকে আপনা থেকে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয় আলসের উপর। ঘুড়ি ধরব বলে।
আমি আলসের উপর দাঁড়াতেই দেখতে পেলাম আকাশের শেষ, ক্ষীণ, কমলা আভায় একটা বড়োবড়ো মুখপোড়া ঘুরি হাওয়ায় দুলতে দুলতে ভেসে আসছে আমাদের ছাদের দিকে। আমি টানটান হয়ে তৈরি হলাম সেটা নাগালের মধ্যে এলেই মাঞ্জা ধরে টেনে নিতে। কিন্তু ও কী! আমাদের ছাদের মাত্র দেড় হাত দূর থেকে উলটো হাওয়ায় ঘুড়িটা ভেসে যাচ্ছে অন্যদিকে। আমি একপায়ে ভর করে আরেক পা হাওয়ায় রেখে বাইরের দিকে হেলে সুতোটা ধরতে যাচ্ছি…আমার শরীর হিম হয়ে গেল। দেখি আলসের ওই প্রান্তে আমার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বসে আছে ঠাকুরমার গল্পের ওই নরপিশাচ!
আমি ঘুড়ির মায়া ছেড়ে বাবা গো!’ বলে আর্তনাদ করে ছাদের ভিতরের দিকে লাফ দিলাম। পায়ে প্রচন্ড ব্যথা পেলাম, মনে হল যেন পাথর মেরেছে পায়ে কেউ। কিন্তু সেই পায়েই লাফাতে লাফাতে নেমে এলাম ছাদের অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে। নীচে পৌঁছুতে মা আমাকে দেখে ছুটে এসে ধরল—কী হয়েছে দীপু! অমন হাঁপাচ্ছিস কেন? আমি ভয়ে, লজ্জায় হিম হয়ে গিয়ে চুপ মেরে গেলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর কোনোক্রমে বলতে পারলাম, পায়ে ভীষণ লেগেছে, মা!
রাতেরবেলা মার পাশে শুয়ে-শুয়ে বহুক্ষণ সেই দৃশ্যটাই দেখলাম। আমি ঘুড়ি ধরতে যাচ্ছি, আর আমাকে একদৃষ্টে দেখে যাচ্ছে ওই নরপিশাচ। পরদিন সকালে ছাদে গিয়ে দেখলাম জায়গাটা। আর ফের একবার শিউরে উঠলাম। হে ভগবান, নরপিশাচ ওইখানে বসে দেখা না দিলে তো আমি নীচে পড়ে একেবারে থেঁতলে ছাতু হয়ে যেতাম!
সেই ভয়টাই এতদিন পর ফিরে এল মোরফিল্ডের চিড়িয়াখানায় এই বনমানুষটাকে দেখতে-দেখতে। অবিকল সেই নরপিশাচটাই যেন। তিরিশ বছর পরা ধরা পড়ে জালের মধ্যে এসে ঠেকেছে। ঠাকুরমার গল্পের সেই নরপিশাচ। আমার বালক বয়সের কল্পনারও। হঠাৎ একটা সিগারেট ধরানোর শখ হল। কিন্তু চিড়িয়াখানার মধ্যে সিগারেট খাওয়া নিষিদ্ধ। আমি হাঁটা লাগালাম ক্যাফেটেরিয়ার দিকে, মারিয়ানকে পাকড়াও করব বলে। ঢের হয়েছে চিড়িয়াখানা ঘোরা; এবার আমি বাড়ির দিকে যাব গাইডকে সঙ্গী করে।
ক্যাফেটেরিয়ার কাছাকাছি হতেই দেখি কফি খাওয়া সেরে মারিয়ানও বেরিয়ে আসছে। আমাকে দেখতে পেয়েই হাত নেড়ে বলল, হাই মিস্টার বোস, আপনার বনমানুষ দেখার সাধ মিটল? আমি সলজ্জ ভঙ্গিতে বললাম, খুব। ও জিজ্ঞেস করল, আপনার বিশ্বাস হল? আমি বললাম, কী জানি, কোথায় কী চালাকি কেঁদেছে ঠিক ধরতে পারলাম না। আরও একবার আসব ভাবছি। তখন একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে মেয়েটি বলল, আপনাদের মতো বিজ্ঞানের লোকদের নিয়েই যত ঝামেলা। যাদুচোখে দেখবেন তাতেও বিশ্বাস হওয়ার নয়। তা যাকগে, এখন আর কী দেখবেন বলুন?
এবার আমি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, না। আজ এই থাক। এখন বাড়ি ফিরতেই ইচ্ছে করছে। সঙ্গে-সঙ্গে মারিয়ান বলল, তা হলে আমার বাড়িতেই চলুন না। গুহামানব, আদিমানব ইত্যাদি নিয়ে আমার বেশ কিছু বই আছে। গবেষণার তথ্যের পাশাপাশি অনেক কাল্পনিক ছবিও পাবেন তাতে। একটু পাতা ওলটাতে পারেন। আমিও সেই ফাঁকে আপনার জন্য একটু ডিনার বেঁধে ফেলব।
মাথায় যখন বনমানুষ ঘুরছে ঠিক তখনই সেই সংক্রান্ত বইয়ের খবর পেয়ে ফুর্তিতে
লাফিয়ে উঠলাম। আহ্লাদের সঙ্গে বলে বসলাম, এই হলে গাইড। আমি অবশ্যই তোমার ওখানে যাব।
ওর বসার ঘরে খান পাঁচেক মোটা-মোটা চিত্রবহুল বই ধরিয়ে দিয়ে মারিয়ান চলে গেল কিচেনে নৈশভোজ রাঁধতে। আর আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে একেকটা বই ধরে পাতা ওলটাতে লাগলাম। আদিমানব, বনমানুষ, নরপিশাচের কত-কত রকমের কাল্পনিক ছবি। কিন্তু কোনোটাই ঠিক আমার সেই কল্পনার কিং বা একটু আগে মোরফিল্ডের চিড়িয়াখানায় ওই জন্তুটার সঙ্গে মেলে না। তা হলে এই জন্তুটা বাস্তবে কী!
এই জিজ্ঞাসা নিয়ে আমি আরও-আরও পাতা ওলটাতে লাগলাম আর যেখানে একটু কৌতূহল হল পড়তে লাগলাম। অথচ কৌতূহল মেটে না। শেষে ‘ধুত্তোর!’ বলে বইগুলো কার্পেটে ছুড়ে ফেলে চলে গেলাম রান্নাঘরের দিকে, মারিয়ানকে একটু কফি বানাতে বলব বলে। আর গিয়েই তাজ্জব! আমার বলার অপেক্ষায় নেই মেয়েটি। ডিনার রান্না করে হটকেসে ভরে ও দু-কাপ কফিও বানিয়ে ফেলেছে। আমার দেখেই একগাল হেসে বলল, কফি চাই তো? আমি বিজ্ঞানীদের ব্যাপারটা কিছুটা বুঝি। আমি গদগদ হয়ে বললাম, তুমি তো সাংঘাতিক মেয়ে, মারিয়ান! এবার বলো তো তুমি আর কী বুঝলে আমার ব্যাপারে?
