অবাক হয়ে বলেছিলাম, হঠাৎ চিড়িয়াখানা কেন? আমি কি এখনও বাচ্চা আছি নাকি? শুনে ও আরও বেশি অবাক হয়ে বলেছিল, সে কী! সারাপৃথিবীর লোক এখনও বেঁকে আসছে মোরফিল্ডে আর আপনি লণ্ডনে বসেও সেখানে যাবেন না? আমার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গিয়েছিল মোরফিল্ডের ওই আজব জীবের সম্পর্কে লেখালেখিগুলো। বটেই তো! এরকম আজব একটা জন্তু দেখার সুযোগ আর কবেই বা পাব। তবু নিজের বোকা প্রশ্নটা সামলে দেওয়ার জন্য বললাম, আচ্ছা মারিয়ান, তোমার কি মনে হয় একটা প্রকৃত গুহামানব হঠাৎ করে পর্বতের কন্দর থেকে বেরিয়ে পড়তে পারে? তাও আবার স্কটল্যাণ্ডের পাহাড় থেকে।
মারিয়ান মুখ টিপে একটু হেসে বলেছিল, সে তো আপনিই ভালো বলতে পারবেন। আপনি বিজ্ঞানের লোক। আগে থেকে জল্পনা-কল্পনা না করে ব্যাপারটা স্বচক্ষে দেখে এলেই ভালো হত না? আমি তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গিয়ে বলেছিলাম, তথাস্তু!
কিন্তু জীবটিকে দেখে বিশ্বাস, সংশয় বা বিস্ময়ের চেয়ে ঢের বেশি যেটা হল সেটা ভয়। জীবটা সত্যিই গুহামানব কি না প্রশ্ন একবারও মনে উঁকি দিয়ে যায়নি, এর জাতি বা প্রজাতি কী তা নিয়ে মুহূর্তের জন্যও ভাবিনি; শুধু একটাই কথা বারবার মনের মধ্যে ঘুরছে—একে আমি দেখেছি! আমার এপাশে-ওপাশে, পিছনে অগুনতি নারী-পুরুষ শিশু, কত কথা বলছে এই জন্তুটাকে নিয়ে, কিছু ছেলেপুলে দেখি ছোলা-মটর-পপকর্নও ছোড়াছুড়ি শুরু করেছে, ওকে খাওয়াবে বলে, আমার পাশে দাঁড়িয়ে মারিয়ান নখ কামড়ানো শুরু করেছে আমার বিহ্বল অবস্থা দেখে। কিন্তু আমার ভয় কাটছে না। শেষে অনেক চেষ্টা করে মুখ ফুটে শুধু বলতে পারলাম আমার গাইডকে, মারিয়ান, তুমি না হয় একটু কফি খেয়ে এসো ক্যাফেটেরিয়া থেকে। আমি আরেকটুক্ষণ এই জীবটাকে দেখি।
মারিয়ান চলে গেল, আর ফিরে এল আমার সেই স্মৃতির বনমানুষ যার গল্প শুনতাম ঠাকুরমার কাছে। আমি খাঁচার জন্তুটার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে মনে করতে চেষ্টা করলাম ঠাকুরমার গল্পের সেই জীবটিকে।
সবে পুজো শেষ হয়েছে, শীত পড়ব-পড়ব করছে, রাতের বেলায় আমরা ভাইবোনেরা গায়ে লেপ মুড়ে ঘুমের তোড়জোড় করছি, হঠাৎ দাদা বায়না ধরল, ঠাকুরমা, একটা ভূতের গল্প বলো। অমনি ভিতু ছোড়দিটা কেঁদে উঠল, না, না, ঠাকুমা ভূতের গল্প না। আমার ভয় করে। বড়দি বলল, না, ঠাকুরমা। তুমি একটা চোরপুলিশের গল্প বলো। ঠাকুরমা বাটা খুলে এক খিলি পান মুখে গুঁজে বলল, কেমন হয় বল তো যদি তেমন একটা কিছুকে নিয়ে বলি যা মানুষও নয় ভূতও নয় আবার জন্তুও নয়? আমি অবাক হয়ে বললাম, তা হলে তো সেটা কিছুই নয়। তার গল্পও তা হলে গল্পও নয়।
ঠাকুরমা হাসল। ওর সেই মিষ্টি-মিষ্টি ফোকলা হাসি। বলল, ঠিক ধরেছিস দীপু। এটা গল্পও নয়। একেবারে খাঁটি সত্যি কথা। খবরের কাগজে বেরিয়েছে।
আমরা সবাই তখন উৎকণ্ঠার সঙ্গে সমস্বরে বলে উঠলাম, কী বেরিয়েছে ঠাকুরমা? ঠাকুমরা পান চিবুতে-চিবুতে বলল, একটা বনমানুষের কথা। মধ্যপ্রদেশের জঙ্গলে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ধরা যাচ্ছে না। যারা দেখেছে তারা বলছে বনমানুষ। অথচ যা বর্ণনা দিচ্ছে তাতে সে গুহামানবও হতে পারে। গোরিলা হতে পারে। নরপিশাচও হতে পারে।
অ্যাদ্দুর শোনামাত্র চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল ছোড়দি। কিন্তু ঠাকুরমাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। গল্প বলা একবার শুরু হলে ঠাকুরমাকে থামানো দায়। ঠাকুরমা বলে চলল নরপিশাচ কী জানিস তো? আদ্ধেক মানুষ আর আদ্ধেক শয়তান। মানুষের মতোই, তবে গোরিলার মতো লম্বা-লম্বা লোম গায়ে। হাতে বড়ো-বড় নখ, ভাঁটার মতো চোখ আর খোঁচা-খোঁচা, ধারালো দাঁত। তার মধ্যে দু-দিকে দুটো দাঁত ঠোঁটের বাইরে ঠেলে বেরিয়ে আসে। গোরিলার চোখের পাতা যেমন পড়েই না, এরটা তার উলটো। সারাক্ষণ পতপত করে চোখের পাতা পড়ে। তবে চোখে-মুখে ভয়-ভীতি বলে কোনো বস্তু নেই। সারাক্ষণ ডাইনে বাঁয়ে মুখ ঘুরিয়ে যে দেখবে কোন দিক থেকে কী বিপদ এল, তার বালাই নেই। তা হলে বোঝ! একটা সাংঘাতিক শক্তিশালী জীব সারাক্ষণ সামনের দিকে চেয়ে বসে বাঁদরদের মতো চোখের পাতা ফেলে যাচ্ছে। একবার ওর সামনে পড়লে প্রাণ নিয়ে পালানো মুশকিল। জন্তুটা যে কী ভেবে কী করবে বোঝা দায়; তাই যারাই সামনে পড়েছে বেজির সামনে পড়া সাপের মতো স্থির হয়ে গেছে। বনমানুষ কাউকে থাবা মেরে চুরমার করে দিয়েছে, কাউকে আবার কিছুই বলেনি। যারা দূর থেকে ওকে দেখেছে তারা পালিয়ে বেঁচে ওর বর্ণনা দিতে গিয়েও শিউরে-শিউরে উঠেছে। এত ভয়ে ওরা কেউই ঠিক ভালো মতন দেখেনি, বা যা দেখেছে ভুলে মেরে দিয়েছে। তাই ওদের অনেকের বর্ণনার সঙ্গেই অনেকের বর্ণনা মেলে না। হঠাৎ তখন কী মনে করেই জানি আমি জিজ্ঞেস করে বসেছিলাম, ঠাকুরমা, ক-জন দেখেছে ওকে?
ঠাকুরমা কথার মধ্যে থেমে গিয়ে বোধ হয় মনে-মনে গুনল। তারপর বলল, জনা পনেরো তো হবেই।
আমি কেন জানি না বলে ফেললাম, ইশ! আমিও যদি দেখতে পেতুম। তা হলে এই ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ঠাকুরমার গল্পের সেই বনমানুষটাকেই কি চাক্ষুষ করছি আমি? আর অহেতুক এত ভয়ই বা পাচ্ছি কেন? আমি খাঁচাটার থেকে অনেকটা পিছিয়ে এসে বাচ্চাদের মাথার উপর থেকে জন্তুটাকে দেখতে লাগলাম। আর ওই অতখানি দূরত্ব থেকে দেখতে-দেখতে আমার সেই দৃশ্যটা মনে পড়ল। ঠাকুরমার গল্প শোনার দু-দিন বাদে সন্ধ্যেবেলা ছাদের আলসের উপর দাঁড়িয়ে দেখা।
