ওই একটি টাকা দিয়েই ছয়-ছয়টা বছর আমার সংসার চলছে, দুনিয়ার সব প্রয়োজন মিটছে। যখনই আমি হাওয়া থেকে কোনো টাকা তৈরি করি আমার মনে হয় আমি সেই টাকাটাকেই নতুন করে ফিরিয়ে এনেছি। বাজারে কিছু কেনাকাটা করলে আমি এক টাকার মুদ্রা ছাড়া ফেরত নিই না। ছয় বছর হল আমি কাগজের টাকার ব্যবহার ভুলে গেছি। এই মুহূর্তে আপনার বাম তালুর মুদ্রাটা হল সেই মুদ্রা যেটি আপনার ফুটো পকেট থেকে বার করে আপনাদের চমকে দিয়েছিলাম। সবাই অবাক হয়েছিল, কিন্তু সবাই জানল ওটা হাতের কারসাজি। ব্যাতিক্রম শুধু আপনি। আপনি আমার টাকাটা হাতে নিয়ে সোল্লাসে চিৎকার করে বললেন, না, না, বাজি নয়, জাদুকর টাকাটা হাওয়া থেকে বানিয়েছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমার চোখে পড়ল আপনার দুই ঘন, কালো, অপার-বিস্মিত চোখ দুটির ওপর। এই প্রথম একজন দর্শক জনসমক্ষে স্বীকার করল যে, আমি সত্যিই টাকা বানাতে পারি। আমি খুশি হয়ে আপনাকে টাকাটা দিয়েই দিলাম। আমার নাম লেখা একটা চিরকুটও আমি আপনার দিকে ছুড়ে দিলাম। যদিও আপনার চোখ দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল যে, আপনি হয়তো আমায় চেনেন। আমার নিবাসও হয়তো আপনার জানা আছে। আর আমার ভেতরে ভেতরে কে যেন বলে উঠল যে আপনি অতি অবশ্য আমার পিছু নেবেন। আপনার পকেট ফুটো, আপনার বিশ্বাসী না হয়ে উপায় নেই। আপনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছেন যে, টাকা হাওয়ার থেকেও তৈরি হতে পারে।
মাইরি বলছি, আপনাকে আমার নিদারুণ প্রয়োজন ছিল। নিজের বাইরে কেউ জানবে না যে, আমি টাকা বানাতে পারি, এটা হয় না। এরকম ভাবলেই আমার নিজেকে খতম করে ফেলার রোখ চাপে। কিন্তু, আগেই বলেছি, আমি চাইলে আর মরতে পারি না। কিংবা আমি বহুকাল যাবৎ মরেই আছি কি না তাও আর নিশ্চিতভাবে জানতে পারি না। আপনাকে দেখে তাই কিছুটা স্বস্তি হল। যাক, আমার বাইরেও একটা লোক অন্তত আমার জাদুকে চিনেছে। কী! কী বললেন? আপনি আমার বাইরে নাও হতে পারেন! এ কী ছেলেখেলার কথা? জ্বলজ্যান্ত মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন আমার সামনে সেই সকাল থেকে (বসতে বলা সত্ত্বেও বসলেন না) আমারই বানানো দুটো টাকা দুই তালুতে শুইয়ে রেখে আর আমার মুখের ওপর বলে দিচ্ছেন যে, আপনি লোকটি আসলে আমি? এই তো আমি আপনাকে স্পর্শ করলাম, আপনার ছেড়া পাঞ্জাবির ওপর দিয়ে সস্নেহে হাত বুলিয়ে আপনাকে আদর করলাম। আমার হাত দুটো তো এখন আপনার মসৃণ গ্রীবায়। আমি আদরের বদলে এই গলাটা টিপে আপনাকে হত্যাও করতে পারি। কিন্তু আপনার গলা টিপলে আমার নিজের গলাতেও লাগছে
কেন? আমার নিজের গলা বহুবার টিপে দেখেছি। তাতে আমার লাগেও না, মরিও না। কিন্তু এখন আমার লাগছে। উফ! আমার দম যে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হল! এ কী! আমার চোখের সামনে সব এরকম ঝাপসা লাগছে কেন? আমার নিজের সেই কামনার মৃত্যুর জন্য আমাকে কি আপনার গলায় এরকম হিংস্র চাপ সৃষ্টি করতে হবে? আমি কার জন্য মরলাম বা কে আমার জন্য মরল? মরবার অন্তিম মুহূর্তেও কি আমি জানব না এই মৃত্যুটা আসলে কার?
জান্তব
জালের বাইরে থেকে অদ্ভুত জীবটিকে দেখেই আমি শিউরে উঠলাম, তারপর আস্তে-আস্তে স্থির হয়ে গেলাম। একেবারে স্থির।
জানি না এভাবে কতক্ষণ পাথর হয়ে ছিলাম; সংবিৎ ফিরল যখন আমার তরুণী গাইড মারিয়ান আমার কনুইয়ে সামান্য নাড়া দিয়ে বলল, স্যার, চলুন। এবার অন্য কিছু দেখবেন তো? একটু অপ্রস্তুত হয়ে আমি টান টান সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। বাঁ-হাতে ধরা লণ্ডন গাইডবুকটা ডান হাতে চালান করলাম, অনাবশ্যকভাবেই আঙুল চালালাম চুলে। কিছু একটা বলব বলে তৈরি হয়েও হঠাৎ চুপ মেরে গেলাম। কথার বদলে মুখে মুঠো চাপা দিয়ে কাশলাম। মারিয়ান আমার মনের অবস্থার মাথামুন্ডু না বুঝে ফের বলল, স্যার, আপনি কি অন্য কোনো পশুপাখি দেখবেন না?
আমার তখনও মুখে কোনো কথা জোগাচ্ছে না। আমি মারিয়ানের থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে ফের খাঁচার জীবটাকেই দেখছি। দেশ-দুনিয়া থেকে ভিড় করে ইদানীং যাকে দেখে যাচ্ছে মানুষজন। কাগজে-কাগজে ফলাও করে যাকে নিয়ে লেখা হচ্ছে আধুনিক যুগের এক সেরা আবিষ্কার। বর্ণনা করা হচ্ছে কখনো গুহামানব বলে, কখনো বনমানুষ বলে, কখনো গোরিলামানব বলে, কখনো স্রেফ আদিমানব বলে। স্কটল্যাণ্ডের এক হৃদসন্নিবর্তী পাহাড়ের গুহা থেকে একে আবিষ্কারের পর থেকেই বিশ্ব জুড়ে বিতর্ক চালু হয়েছে এই মানুষ বা জন্তু এতদিন এভাবে এক সভ্য এলাকায় টিকে থাকল কী করে। এর জনক-জননী কে, এর বয়স কত, এর জ্ঞাতিগুষ্টি কারা, এ এল কোত্থেকে কিংবা এই গুহাতেই এতকাল ধরে মানুষের অগোচরে রইল কী করে—এই সব নিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন। জন্তুটি নিয়ে চাঞ্চল্য এতদূর ছড়িয়েছে যে লণ্ডনের ট্যুরিস্ট ম্যাপে এখন বড়ো-বড়ো করে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে মোরফিল্ড জু-এর টিউব স্টেশনের নাম। আর দিনে হাজার হাজার দর্শক ভিড় করে এসে বিস্ফারিত নেত্রে দেখেছে আধুনিক যুগের এই সেরা আবিষ্কারকে।
আমি লণ্ডন এসেছি ব্রিটিশ কাউন্সিলের এক বৃত্তি নিয়ে ছ-সপ্তাহের জন্য কাজ হল ইংল্যাণ্ডের ইশকুলে ইশকুলে পড়ানোর ধরনধারণ ঘুরে ঘুরে দেখা। এভাবে পাঁচ সপ্তাহ কেটে গেছে এবং আমিও বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি; এবার বাকি সপ্তাহটায় লণ্ডন শহরটা ভালো করে চষে বেড়িয়ে বাড়ি ফেরার ইচ্ছে। আমি লণ্ডন দেখতে চাই শুনে এখানকার এক পাবলিক স্কুল ল্যাটিমোর-এর ইতিহাসের টিচার মারিয়ান হোয়াইট বলে বসল, চলুন, আগামী শনিবার আপনাকে মোরফিল্ড চিড়িয়াখানা নিয়ে যাই।
