না, আপনি মুখ ঘুরিয়ে বাইরের দিকে হন্টন লাগাবেন না। টাকা যে জাদু দিয়ে তৈরি করা যায় না এই মহৎ তত্ত্ব শোনাবার জন্য আমি আপনাকে দাঁড় করিয়ে রাখব না। আপনি চাইলে আমার ঘরের মেঝেতে বসতেও পারেন। শুধু রাংতাগুলোর ওপর বসবেন না। ওগুলো আমার পোশাক তৈরির কাজে লাগে। যখন এসেই পড়েছেন তাহলে বলেই ফেলি—আমি বাস্তবিকই টাকা তৈরি করতে পারি! যখন খুশি চাইলেই পারি, অতখানি বলব না। একেক সময় কেমন কেমন করেই জানি হয়ে যায়। খুব বেশি টাকাও নয়, এই ধরুন একটা টাকা, কি দুটো। তাও কাগজের নোট নয়, ওই ধাতুতেই। আমি ওইসব টাকা কখনো জমাই না! পাছে কোত্থেকে কী বেরিয়ে পড়ে। আমি এই টাকা দিয়ে চুল্লু কিনে খাই। যাতে হাওয়ার টাকা জলেই যায়। ইচ্ছে হয় ফকিরদের দিই, কিন্তু দেশে আজকাল খাঁটি ফকির কোথায়? সব তো দু-নম্বর। যাকে দেবেন সে শালাও গিয়ে চুন্নু টানবে।
তবে মজাটা কী জানেন? আমাকে টাকা তৈরির বাজিটা শিখতেই হল না। মৌলালির দরগার পির নবী হালিম সাহেবকে চেনেন? বেজায় জ্ঞানী লোক। একদিন কথায় কথায় আমায় বলেছিলেন যে, যে বাজিকর নিজের বিদ্যে দিয়ে নিজেকেই তুক করতে পারে সে-ই আসল বাজিকর। কোনো বাজিকরই নিজের ওপর জল ফেলতে পারে না। আর তা না পারলে কেউ কি টাকা বানাতে পারবে? এই হল গিয়ে হক কথা। এক-শো কথার একখানা। আমি সেদিন ওঁর কথা শুনে এসে আমার সমস্ত যন্ত্রপাতি চুলোয় গুঁজে দিলাম। যাক শালা সব পুড়ে ছাই হয়ে। তারপর বেরিয়ে পড়লাম দু-চার টাকা নিয়ে চুন্নু পান করতে। কিন্তু, মাইরি বলছি, সেদিন যেন কিছুতেই নেশা হতে চায় না! অতগুলো গেলাস শেষ করেও যেন মনে হল বিলকুল জমেনি। আমার একটু আফশোসও হল! ভাবলাম যন্ত্রগুলো না পুড়িয়ে বেচে দিলেও কিছু টাকা আসত। অন্তত আজকের নেশাটা এরকম আধখামচা হয়ে থাকত না।
কিন্তু বাড়ি ঢুকেই মাথাটা ঘাড় থেকে নেমে আসার জোগাড় হল। দেখি চুলো যেমনকার জ্বলে যাচ্ছে দাউ দাউ করে, কিন্তু যন্ত্রগুলো যেমনকার তেমনই আছে। এতটুকু পোড়ার নাম নেই। প্রথমে ভাবলাম আমার নেশাটা বোধ হয় একটু বেশিই চড়েছে, তাই যা খুশি দেখতে শুরু করেছি। তখন দু-গেলাস জল ঢাললাম গলায়। কিন্তু না! যা দেখেছিলাম তাই দেখে যাচ্ছি। তখন গালে দুটো চড় কষে দিলাম। কিন্তু তাতেও কিছু বদলাল না। অগত্যা জামাকাপড় সমেত চৌবাচ্চায় ঝাঁপ দিলাম, যদি তাতে অন্তত নেশা কাটে। ছ্যাঁচোড় নেশা কাটাতে চৌবাচ্চায় কান অব্দি ডুবিয়ে বসে থাকলে কাজ হয়। কিন্তু কাটল কই? ফিরে এসে যা দেখার তাই দেখলাম। চুলো জ্বলছে থেকে থেকে পটপট করে কয়লার ফুলকি উড়িয়ে। কিন্তু জাদুর যন্ত্রগুলো তাতে যেন আঁচ পোহাচ্ছে। পুড়ে ছাই হওয়ার ধর্ম তারা ভুলেই গেছে।
আর তখন, ঠিক তখন, আমার একটা অদম্য কৌতূহল হল ব্যাপারটা অরেকটু তলিয়ে দেখব। আমি উনুনে আমার তর্জনিটা আলতোভাবে ঢুকিয়ে দিলাম। প্রচন্ড তাত লাগল আঙুলে, কিন্তু সেটা পুড়ল না। আমি আস্তে আস্তে গোটা হাতটাই ঢুকিয়ে দিলাম, এবং হাতটা যেমনকার তেমনই রইল। যেন আগুন নয়, আগুনের একটা প্রতিবিম্বের সঙ্গে আমি নওছল্লা করছি। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। ভয়টা এই জন্য নয় যে, এবার থেকে আমার আর আগুন দিয়ে কাজ হবে না, কী রান্নার, কী জঞ্জাল পোড়ানোর; কিন্তু যে-কোনোদিন হয়তো আমি ইচ্ছে করলে টাকা বানাতে পারব। যাকে আগুনে পোড়ায় না সে শুধু ইচ্ছামৃত্যুই পায় না, তার জাদু তার নিজের ওপরও বর্তায়।
বিশ্বাস করুন, সেই দিন থেকে আমি একটি রাতও ঘুমোইনি। কারণ আমার শয়ন, জাগরণ, আহার ও জীবন সবটাই ওই খেলার ওপর নির্ভর করে আছে। আমি নিজেকে জাদু করে নিজের ওপর কোনো কতৃত্বই ফলাতে পারি না। আমার দুঃখ কিংবা আনন্দের অনুভূতির জন্যও কিছুটা ভেলকির প্রয়োজন। আপনি চাইলে আপনার হাতটা উঠে গিয়ে আপনার কান স্পর্শ করবে। আমার হাত ওঠে কিন্তু জাদুবলে। আমার জাদু না-চাইলে আমি পুড়তে, পড়তে, উঠতে, নামতে, বাঁচতে বা মরতেও পারি না। যেদিন থেকে এই জাদু আমার শরীর ও মনে চড়েছে সেদিন থেকে আমি অসংখ্যবার মরতে চেয়েছি। কিন্তু মরার জন্য সমস্ত বন্দোবস্ত করেও (মায় গোর ও নমাজের ব্যবস্থা) শেষ অব্দি টের পেয়েছি যে আমার মৃত্যুর আসল বাসনার ক্ষমতা বা দায়িত্ব আর আমার মধ্যে নেই। আমারই দ্বিতীয় কোনো সত্তা, কিংবা আমার আসল আমিটাই হয়তো স্থির করে আমার কপালে কী ঘটবে না ঘটবে। আর যেহেতু অগুন্তি বার মরার ইচ্ছে ও চেষ্টা করেও আমি মরে যেতে পারিনি আমি জানি না আমি বেঁচে আছি কার ইচ্ছে, কার দোহাইয়ে।
ইদানীং আমার আর খিদেও পায় না মদের নেশাও চলে গেছে। জাদু দেখিয়ে পয়সা আয় করার কোনো প্রয়োজন আমার আর একেবারেই নেই। মাঝেমধ্যে দুটো-চারটে টাকা তো
আমি নিজেই তৈরি করে নিই। যেমন এই টাকাটাই ধরুন না কেন। কী, বোঝা যায়? নিজের কোনো টাকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারেন। কী বললেন? আপনার টাকা আর এই টাকাটা হুবহু এক! মানে দুটো টাকার মধ্যে কোনো ভেদই নেই? বলছেন যে ওই দুটো টাকা আসলে একটাই টাকা। অর্থাৎ একটাই টাকা দুই তালুতে দু-বার করে আছে, একই সময়ে, একই মুহূর্তে? কিন্তু ওই দুটো টাকা দিয়ে দুটো আলাদা দোকান থেকে আলাদা আলাদা দ্রব্য আলাদা আলাদাভাবে আলাদা আলাদা সময়ে কেনা যাবে। আপনি টাকা দুটো বাইরে নিয়ে গিয়ে এক্ষুনি পরখ করে নিতে পারেন। আমি বহুবার একই মুদ্রা আলাদা আলাদা সময়ে আলাদা আলাদা দোকানে খরচ করেছি। যার থেকে আমার প্রায় ধারণাই হতে চলেছে যে, আমার জগতে শুধু একটাই টাকা আছে, যেটা অনবরত ঘুরে ঘুরে আমার হাতে আসে এবং সময় মতন খরচ হয়ে চলে যায়। আমার টাকার জগতে শুধু একটাই এক টাকার মুদ্রা আছে, যেটা আমার তৈরি, না কোনো টাঁকশালেরই সৃষ্টি আমি আর সঠিক বলতে পারব না। কিন্তু
