পরদিন সন্ধ্যের ফ্লাইটে বম্বের দিকে যাত্রা করল প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সের সনি লোবো। কলকাতার মস্ত সুনাম ফেলে রেখে বম্বের অজানা জগতে নতুন করে ভাগ্যান্বেষণে নামতে হবে এখন ওকে। সেখানে ওর প্রিয়তম ক্ল্যাসিকাল আইটেম বাজানোর কোনো সুযোগ নেই। রুজির জন্য বিটলস, এলভিস, অ্যাব্বা কি হালফিলের সব রকমারি সুর বাজাতে হবে। আশির দশক বলে কথা!
তা হোক। ভিতরে ভিতরে ঘুমিয়ে থাক মোজার্ট, বেটোফেন, ব্রাহমজ। রাতে অন্তত মা-র জন্য সামান্য একটু নৈশসংগীত বাজাতে পারলেই হল। এই মা ক্ল্যাসিকালের ক জানেন না, অথচ কতকাল ধরে পিপাসী হয়ে আছেন সনির পিয়ানো শুনবেন বলে। মাকে আর কাজে যেতে দেবে না লোবো। মা-র এখন একটাই কাজ—সনির পিয়ানোর অপেক্ষা থাকা। তখন সনি ‘আইনা ক্লাইনা নাখটজিক’, ‘নকতন’, ‘র্যাপসোডি’, ‘ফান্তেজি’, কি ‘মুনলাইট সোনাটা’ যাই বাজাক না কেন, তাই শুনতে শুনতে ঘুম আর স্বপ্নের জগতে হারিয়ে যাওয়া।
লোবো বাইরে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়েছিল। বাজনাগুলোর কথা মনে হতে হাতের লেদারব্যাগটা খুলে দেখে নিল অমিতের দেওয়া নোটেশন বইগুলো ঠিকঠাক আছে কি না।
দেখল সব ঠিকই আছে জায়গামতো। বিমানসেবিকা এসে স্ন্যাকস আর কফি দিয়ে গেছে। ও কফিতে চুমুক দিতে দিতে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাল। অন্ধকারটা ভীষণ ভালো লাগল ওর, ও গুনগুন করে একটা সুর গাইতে লাগল কোনো ক্ল্যাসিকাল সুর নয়, রোমান্টিক পপ। ফ্র্যাঙ্ক সিনাট্রার ‘স্ট্রেঞ্জার্স ইন দ্য নাইট, টু লোনলি পিপল’।
জাদুকর
আমি জানতাম আপনি আসবেন। তবে এরকম ঝোড়ো কাকের মতন একটা উদভ্রান্ত চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হবেন ভাবিনি। সেদিন দুপুর বেলায় আপনার যে চোখ দুটো দেখেছিলাম সে দুটো কোথায়? মানছি আপনি লজ্জা পেয়েছেন; আপনি ভাবছেন এই মুহূর্তে আমি আপনার বিষয়ে কী ভাবছি, তাই না?
না, আমি কিছুই ভাবছি না। কোনো জাদুকর তার কোনো মুগ্ধ, বিশ্বাসী দর্শককে নিয়ে কখনো আবোল-তাবোল, বিটকেল ভাবনা ভাবে না। সেদিন দুপুরে আমি যখন যৎপরোনাস্তি ব্যতিব্যস্ত ছিলাম লোকগুলোকে বোঝাতে যে সিসের ওই এক টাকার মুদ্রাটা আমি সত্যি সত্যি হাওয়া থেকে বানালাম তখন একমাত্র আপনার চোখেই সেই পূর্ণ বিশ্বাসের চাহনি দেখেছিলাম। রাস্তার পাশে একটা জবরজং আলখাল্লা পরে এতখানি সম্মোহন কেউ সৃষ্টি করতে পারে না। আমি জানি, আপনি বলবেন স্টেজে দাঁড়িয়েও কোনো জাদুকর সত্যিকারের একটা মুদ্রা সৃষ্টি করতে পারে না। অথচ তা সত্ত্বেও আপনি আমার ঠিকানা খুঁজে বাড়ি অব্দি পৌঁছে গেলেন। কারণ আপনি নিজের দুই চোখকে এখনও অবিশ্বাস করতে পারছেন না। আপনার পাঞ্জাবির ছেড়া পকেটে সেদিন কোনো মতেই একটা টাকার মুদ্রার ঝুলে থাকার কারণ ছিল না। উপরন্তু আপনি সারাক্ষণ সেদিন আপনার দুটো ফুটো পকেটে হাত গলিয়ে সজাগ হায়েনার মতন আমার খেলা দেখছিলেন। আপনি এও দেখছিলেন যে, আমি একবারের মতনও আপনার শরীরের পাঁচ ফুটের মধ্যে আসিনি।
আমি কিন্তু আপনার চোখ দেখেই ঠাওরে নিয়েছিলাম যে, আপনার পকেট খালি, এবং ওই পকেটে দুটো মস্ত ফুটো। আমার উস্তাদ বন্দে মিঞা বলতেন টাকা বার করতে হলে ফুটো পকেট থেকেই বার করা ভালো। প্রথমত, ফুটো পকেট থেকে টাকা বার করলে দর্শক মুগ্ধ হয় বেশি। দ্বিতীয়ত, ফুটো পকেটের তলা থেকে আঙুল গলিয়ে তাতে মুদ্রা ঢুকিয়ে দেওয়ার বাড়তি সুবিধে থাকে। উস্তাদ এও বলেছিলেন যে, ফুটো পকেটঅলা দর্শকের চোখে একটা লজ্জা লজ্জা ভাব থাকে। আবার ভয়ও থাকে, কারণ সবার মাঝখানে জাদুকর তার পকেট হাতড়ালে বেচারার সে কী দুর্দশা ভাবুন!
দর্শকদের মধ্যে ফুটো পকেটঅলাদের বার করতে আমার উস্তাদের বিশেষ একটা সময় লাগত না। কিন্তু উস্তাদের খেলা ছিল ওই অব্দি। উস্তাদ কোনোদিনই সত্যিকারের একটা মুদ্রা সৃষ্টি করতে পারেননি। একবার এক আরবি ফকিরের কাছে উস্তাদ বহুদিন তালিম নিলেন টাকা তৈরির। অনেক কাঠখড় পোড়ালেন, রাত জেগে বহু মন্তর-টন্তর আওড়ালেন। কিন্তু একটা তামার পয়সাও কোনোদিনও ওঁরা পয়দা করতে পারেননি। শেষে একদনি আমায় কাছে ডেকে ফিসফিস করে কবুল করলেন, কোনো জাদুকরই কোনোদিন হাওয়া থেকে টাকা বানাতে পারবে না। খোদার মানা আছে।
সেই যে মনে দাগা খেলাম সেদিন থেকেই প্রায় ঠিকই করেছিলাম এই সব ভোজবাজিদের তালাক দেব। আমার উস্তাদও যদি টাকা বানাতে না পারেন তাহলে জগতে কারোরই আর সে সম্ভাবনা নেই। আর যে বিদ্যায় শুধু অন্যকেই ধোঁকা দেওয়া যায় সে-বিদ্যায়ও কোনো খাস প্রয়োজন নেই আমার। আমি ন-বছর বয়সে মাদ্রাসায় পড়তে যাওয়ার পথে প্রথম যে জাদুকরকে দেখেছিলাম পাঁচমুন্ডি বাজারের পাশে সে কিন্তু সমানে রটাচ্ছিল এই খেলাতে পায়রা, মুরগি আর তামাক বানানো যায়। একেকটা খেলা শেখাতে ও দাম নিচ্ছিল ছ-টাকা করে। আমার কোঁচড়ে সেদিন একটা আধুলিও ছিল না। কাজেই শিখতে পারিনি। তবে সেদিন দুপুরেই শপথ নিয়েছিলাম আমি সব খেলার গোড়ার খেলা টাকা বানানো শিখব। অযথা মুরগি, পায়রা বানানো বেশ ঝামেলার ব্যাপার। টাকা বানানো আরেকটু বেশি কঠিন হলেও বেশ পরিচ্ছন্ন। আর তা ছাড়া, আমি ওই ন-বছর বয়সেই দেখেছিলাম যে, ললাকে চোখের সামনে গোটা গোটা টাকা দেখলে কীরকম বুন্ধু মেরে যায়। আমাদের গ্রামে এখনও লোকের ধারণা আছে যে, টাকা কখনো বানানো যায় না। উঁBকশালে যা টাকা তৈরি হয় সেই টাকাই আমাদের হয় চাকরি করে নয়তো বাণিজ্য করে আয় করে নিতে হবে। জাল-জোচ্চুরি কিছু হয়, কিন্তু সময় মতন সেসব ধরাও পড়ে যায়। একেবারে খাঁটি টাকা তৈরি সাধারণ মানুষের কম্ম নয়। আর এইসব জেনেশুনেই রোখের বশে এই শ্রীমান এই লাইনে এলেন।
