প্রিয় প্রিসিলা,
তুমি আমাকে চিনবে না, কিন্তু আমায় তোমাকে চিনতেই হয়েছে। তোমার ঠিকানা পেয়েছি ছোট্ট একটা পাপকর্ম করে, কারণ আমার হাতে আর সময় বিশেষ ছিল না। গত পরশু আমি কলকাতা থেকে দিল্লি এসেছি, আর জানিও না ফের সনি লোবোর শহরে ফিরে যেতে পারব। তুমি ছেড়ে যাওয়ার পর সাত-সাতটা বছর লোবো মাস্টারকে আঁকড়ে ধরে বেঁচেছিলাম, আজ এক দুর্বোধ্য শূন্যতায় নিজেকে নিক্ষেপ করতে হল। আমি কিন্তু চাইনি লোবো মাস্টারকে একলা ফেলে চলে আসতে। কিন্তু আসতেই হল নিজের প্রিয় দিদির জীবনরক্ষার চেষ্টা করতে। এক ব্যর্থ বিবাহ থেকে বেচারির মাথাটাই খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আর এর জন্য অংশত আমিও দায়ী। গোটা পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে ওর এই বিয়েতে মত দিয়েছিলাম শুধু আমি। আজ গোটা পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ওকে পাগলা গারদের বাইরে ধরে রাখতে হবে আমায়। কারণ সমাজ চাইছে শর্মিলা অ্যাসাইলামে যাক।
বুঝতে পারছ, প্রায় নিরুপায় হয়েই তোমার চিঠি খুলেছি। গত সাত বছরে লোবো মাস্টার তোমার একটি চিঠিও খুলে পড়েনি। তাই ও জানেন না যে ওর জন্মদাত্রী মা প্রায় ওর অপেক্ষাতেই প্রহর গুনছেন দূর বোম্বাইয়ে। কিন্তু লোবো মাস্টার কখনো কলকাতা ছেড়ে বোম্বাই যায় না। যত অসমর্থ হন তবু একবার তুমি ওর মা-কে নিয়ে কলকাতা যাও। মাস্টারের হাতে রাতের সংগীত শোনাও ওর মাকে। উনি মর্ত্যে চাক্ষুষ করতে পারবেন স্বর্গ।
আর তারপর তুমি আর কখনো ছেড়ে যেও না মাস্টারকে। মানুষটা ভেতরে পুড়ে খাক হয়ে আছে, শুধু গান দিয়ে ভরে রেখেছে সমস্ত শূন্যতা।
তুমি বলবে আমি এত সব জানলাম কী করে? খুব ছোট্ট উত্তর এর…সংগীত। মাস্টারের বাজনা যেকোনো বাজনা।
আর যদি জিজ্ঞেস করো আমি তোমার কথাও এত জানলাম কোত্থেকে তো বলব, ওই সংগীত। মাস্টারের সব বাজনাই শেষ অবধি ওর দুই মা আর তোমার জন্য নিবেদিত। এ আমি সম্যক জানি। কদিন আগে অব্দি আমিও যে ওই বাজনার অংশ ছিলাম!
প্রিয় প্রিসিলা, মাস্টারের এই সংগীত তুমি বন্ধ হতে দিও না। তোমার এক অনুরাগী।
—অমিত রে
চিঠি শেষ করে সনি লোবো পিয়ানোয় বসল, একটু একটু রাম খেতে খেতে বাজাল বহু রাত অব্দি। তারপর হঠাৎ একসময় টেলিফোন বেজে উঠল সজোরে। এত রাতে কার ফোন? কোনো মতে পা দুটো টেনে টেনে ফোনের কাছে গেল লোবো।
—হ্যালো।
–মিস্টার লোবো আছেন?
–মিস্টার লোবো বলছি।
—স্যার, ক্যাম্বেল হাসপাতাল থেকে বলছি। আপনার ওয়ার্ড মিস প্রিসিলা রোজ ইজ ফাস্ট সিংকিং! আপনি এক্ষুনি চলে আসুন।
ভোর পাঁচটায় সূর্যোদয়ের সামান্য আগে ক্যাম্বেল হাসপাতালে প্রিসিলার জীবনতরী ডুবে গেল।
৪.
ফাদার ব্রায়ান ল্যাটিন বাইবেল থেকে পড়ে একটু পাঠ করলেন কিং জেমস ভার্সানের ইংলিশ বাইবেল থেকে। রৌদ্রস্নাত অপরাহে উপস্থিত সবাই মাটি দিল প্রিসিলার কফিনে। কবর মাটি চাপা পড়ার পর ডুকরে একটা কান্না শোনা গেল পুরুষকণ্ঠে। সচকিত হয়ে সবাই ঘুরে দেখল সেটা ভাই ক্লেটন। পাদরি সাদা পোশাকে ছেলেটাকে কী সৌম্য দেখাচ্ছিল। কিন্তু ওই সৌম্য মুখটার পিছনে এত কান্না! এর আগে সিমেটারির কেউই একজন পাদরিকে এভাবে কাঁদতে দেখেনি। লোবো হেঁটে গিয়ে ক্লেটনের পিঠে হাত রেখে বলল, তোমার চোখে জল দেখে আমার ভালো লাগছে। যখন বেঁচেছিল প্রিসিলা তখন কেউ যে এই কান্নাটা কাঁদেনি বেচারির জন্য।
ক্লেটন ভাঙা গলায় বলল, আমি ওর মূল্য বুঝিনি কোনোদিন। শুধু স্বার্থপরের মতো নিজের সুখ দেখেছি। যা চেয়েছি জীবনে ও অকাতরে দিয়ে গেছে। একবারই শুধু প্রত্যাখ্যান করেছিল আমায়—আমায় সন্ন্যাস নেবার অনুমতি দেয়নি।
লোবো বলল, তবু তুমি সন্ন্যাসী হলে?
ক্লেটন মুখ নীচু করে কাঁদছিল। লোবো ওর কাঁধে ফের হাত রেখে বলল, কাঁদো। আমি চললাম, আমারও অনেক কান্না বাকি আছে।
সিমেটারি থেকে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরে লোবো ইণ্ডিয়ান এয়ারলাইন্স অফিসে গিয়ে একটা বম্বের টিকিট কিনল। সিঙ্গল টিকিট। সারা জীবনে এত প্রলোভন সত্ত্বেও ওর বম্বে যাওয়ার জন্য মন সরেনি। কিন্তু আজ ওই জায়গাটায় গিয়ে পড়ার জন্য ওর তর সইছে না। কেউ মাথার দিব্যি দেয়নি প্লেনে যাওয়ার জন্য, অনায়াসেই ট্রেনে যাওয়া যেত। কিন্তু লোবোর মনে হচ্ছে ওর সময় বড়ো কম।
পরের দিনের ফ্লাইটের টিকিট কিনে লোবো বাড়ি ফিরল। ব্যাঙ্কের পাশবই বার করে কোটের পকেটে রাখল। কাল সকালে সেভিংস অ্যাকাউন্টের টাকাগুলো তুলতে হবে। কয়েকমাসের জন্য অন্তত বাড়িভাড়া অ্যাডভান্স করে যেতে হবে। কাজের মেয়ে শীলাকেও কিছু টাকা দিয়ে যাওয়া দরকার। ফোন বিল, ইলেকট্রিক বিলের জন্যও কিছু টাকা রেখে যেতে হবে ওর কাছে। আর মিটিয়ে যেতে হবে মুদির বকেয়া টাকা।
লোবো ওর স্যুটকেস গোছাল। পুরোনো একটা ট্রাঙ্ক থেকে বার করল ওর আর প্রিসিলার একটা পুরোনো ছবি। এক সন্ধেয় ম্যাজেস্টিকে কী একটা বাজে হিন্দি ছবি দেখে ওয়েলেসলির একটা স্টুডিয়োয় তুলেছিল। লোবো নিল ওর বাবা আর দুই মায়ের ছবি। তারপর একটা অ্যালবাম থেকে টেনে ছিড়ল অমিতের সঙ্গে ওর একটা ছবি। অমিতের দিদির বিয়েতে তোলা। স্যুটকেসে জামাকাপড় ঢোকানো শেষ হয়ে গেলে লোবো তাতে যত্ন করে রাখল ছোট্ট দুটো বই। একটা অমিতের উপহার দেওয়া মোজার্টের জীবনী। আরেকটা প্রিসিলার উপহার একটা ছোট্ট প্রেমের উপন্যাস—এরিফ সেগালের ‘লাভ স্টোরি’। যার একটা লাইন প্রিসিলা প্রায়ই আওড়াত; লাইনটা লোবোরও মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল ক্ৰমে, আর তারপর আর কখনো Oh Love is never having to say you’re sorry.
