পিপাসা প্রচন্ড বেড়ে উঠেছিল লোবোর মধ্যে। চিঠিটাকে শুধু হাতে ধরে এই উৎকণ্ঠা সহ্য করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল। ও চিঠিটা বার করে পড়তে লাগল এবং একটু পর সম্পূর্ণ থমকে গেল এক জায়গায়-কথায় বলে বাস্তব কল্পনার চেয়েও অবিশ্বাস্য। কিন্তু এ কী বাস্তব, সনি? মাদকাসক্তি থেকে রেহাই পেতে দাদারের যে-রিহ্যাবিলিটেশন ক্লিনিকে ভর্তি হলাম তার বৃদ্ধা মেট্রন একদিন আমায় জিজ্ঞেস করলেন, তুমি যে বলো তুমি কলকাতায় গান গাইতে, তা কখনো সনি লোবোর পিয়ানো শুনেছিলে?
ভাবো সনি, এ মহিলাকে কী করে বোঝাই সনি লোহোর পিয়ানো আমি কীভাবে শুনেছি? তাই সরাসরি কিছু না বলে ওঁর কৌতূহলটাই খতিয়ে দেখছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, সনি লোবোর কথা বললেন কেন, আপনি ওর বাজনা শুনেছেন?
বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সে-সুযোগ আর হল কই? আমি তো স্বাধীনতার বছর ১৯৪৭ থেকেই কলকাতা ছাড়া।
জিজ্ঞেস করলাম, তা হলে ওর কথা কোথায় শুনলেন?
বৃদ্ধা আমাকে ওষুধ গেলাতে গেলাতে বললেন, কতজনই তো আসে কলকাতা থেকে। তারা ওর পিয়ানোর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমার বাড়িউলি একবার কলকাতায় ওর বাজনা শুনে এসে বললেন, ওহ হি ইজ আ জিনিয়াস! তখন খুব সাধ হয়েছিল একবার কলকাতায় গিয়ে ওর বাজনা শুনব। কিন্তু কোথায় আর হল!
জানো সনি, সে-দিন বৃদ্ধার ওই কথাতেই যেন অনেকটা ভালো হয়ে গিয়েছিলাম। আমাকে শুইয়ে দিয়ে লাইট নিভিয়ে বৃদ্ধা যখন চলে যাচ্ছেন, আমি কী এক আবেগে বলে বসলাম, মিসেস ড্রেটন, আমি সেরে উঠলে আপনাকে একবার কলকাতায় নিয়ে যাব। চাইলে সনি লোবোর বাড়িতে বসিয়েই আপনাকে ওর পিয়ানো শোনাব।
ওই আবছা অন্ধকারেই আমি যেন দেখলাম বৃদ্ধার চোখ দুটো অসম্ভব বড়ো হয়ে উঠল। আবেগে কেঁপে ওঠা গলায় বললেন, তুমি সনি লোবোকে এতখানি চেনো?
আমি গর্বিত হাসি হাসলাম-ইয়েস মিসেস ডেট্রন।
এরপর কেন জানি না আমাকে সারিয়ে চাঙ্গা করার গোটা দায়িত্বটাই তুলে নিয়েছিলেন মিসেস ডেট্রন। আট সপ্তাহ পর আমি চাঙ্গা হয়ে উঠলাম। ক্লিনিক থেকে চলে আসার আগের দিন বৃদ্ধা বললেন, তোমার গান একদিন আমি শুনতে যাব হোটেলে।
হেসে বললাম, কেন, সনি লোহোর পিয়ানো শুনতে যাবেন না আমার সঙ্গে কলকাতায়?
বৃদ্ধা ম্লানস্বরে বললেন, আই অ্যাম টু ওল্ড। ওই ধকল বোধ হয় আমার আর সহ্য হবে না। মিস্টার ড্রেটন চলে যাওয়ার পর শুধু নিজের পেট চালাতেই কি আর কম পরিশ্রম গেল। দেখছ না এই বয়সেও কী যাচ্ছে শরীরের উপর দিয়ে?
বুকের মধ্যে কীরকম মোচড়াতে লাগল আমার। মনে পড়ল আমার নিজের বৃদ্ধ বাবা-মা-র কথা। জিজ্ঞেস না করে পারলাম না, কেন, আপনার ছেলেপুলে নেই?
মুখটা নিভে এল বৃদ্ধার—না, আমাদের কোনো সন্তান নেই।
আমার মুখ ফসকে আপনা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, তাই!
বৃদ্ধা আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বোঝালেন হ্যাঁ, তারপর আনমনে অস্ফুটে বললেন, তবে একেবারেই যে আমি মা হইনি তা নয়। আমার প্রথম বিবাহের একটা সন্তান আছে।
বললাম, সে কোথায়?
বৃদ্ধা বললেন, কলকাতায়।
—দেখতে ইচ্ছে করে না?
–খুব।
—নাম, ঠিকানা দেবেন? আমি ব্যবস্থা করব।
—দেওয়ার দরকার নেই, তুমি তা জানো।
–আমি জানি? কে সে?
–সনি লোবো!
সনি ডার্লিং, তোমার মা-র কাছে আমার এই সম্মানটুকু রাখবে না?
প্লিজ, প্লিজ ডার্লিং, একবারটি বম্বে এসো। একবারের জন্য তোমার মায়ের মাথার কাছে বসে তোমার ইলেকট্রিক পিয়ানো বাজাও। তাতে বৃদ্ধার সারা জীবনের ক্লান্তি মুছে যাবে। শি উইল ডাই আ হ্যাপি ডেথ। আর আমি পৃথিবীর সেরা সুখী মানুষ হয়ে থাকব চিরদিন। ইয়োর্স ফরএভার—প্রিসিলা।
লোবোর জীবনে দ্বিতীয় রহস্যটা এইমাত্র ডানা মেলল। প্রথম রহস্যটা ছিল ওর দিদি সাততলার থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করার পরও সাত মাস কেন দিল্লিতে পড়ে রইল অমিত। ওর দিদির মৃত্যুর খবর পোববা জানল অমিতের মৃত্যুর পর। দিদির মৃত্যুর পর একটা চিঠিও অমিত লেখেনি লোবোকে। যদিও তার মধ্যে লোবো অন্তত তিনটে চিঠি লিখেছে। অবশেষে নিজের মৃত্যুর দিনে ওই ভয়ানক চিঠিটা লিখল অমিত।
লোবোর জীবনের দ্বিতীয় রহস্য বিধবা হওয়ার পর এত কষ্ট করল মা, কিন্তু ছেলেকে একটিবারের জন্য কিছু জানাল না! মা তো ছেলের সব খবরই রেখেছে বিদেশ-বিভুইয়ে বসে, বাড়ির ঠিকানা তো তার নিজেরই এককালের ঠিকানা। তবু?
লোবো চিঠিগুলো সযত্নে ওর ফোলিওব্যাগে ঢোকানোর সময় দেখল গভীর জড়তার ভিতর থেকে চোখ খোলার চেষ্টা করছে প্রিসিলা। মেয়েটার ঘুম ভাঙল তা হলে?
ঘুম ভাঙা যাকে বলে সেটা চতুর্থদিনে হয়েছিল প্রিসিলার। লোবোকে বলল, আমার হ্যাণ্ডব্যাগে একটা চিঠি আছে একজনের। আমি চাই তুমি সেটা পড়ো। ওই চিঠিটাই আমার অনেক কথাই বলে দেবে। আমি নিজে আর গুছিয়ে কিছু বলতে পারব না। আমার সব স্মৃতিই ক্রমশ এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
বাড়ি ফিরে প্রিসিলার হ্যাণ্ডব্যাগ থেকে বেরুল খামে-আঁটা চিঠিটা। প্রিসিলাকে ‘ডিয়ার প্রিসিলা’ সম্বোধন করে দিল্লি থেকে লিখেছে অমিত রে। পড়তে পড়তে হাত দুটো কাঁপতে লাগল লোবোর; ওর মনে হল বুঝি-বা পিয়ানোর আঙুলগুলো ফের নিথর হয়ে প্রাণ হারাবে। আস্তে আস্তে দু-চোখে জল ফুটতে লাগল লোবোর, ওর পুরোনো কোমরের ব্যথাটা ফের চাগাড় দিতে লাগল। অমিত লিখছে…
