কিন্তু সনি, সত্যি বলছি। আমি সুখী নই। কালরাতে আমি প্রচুর ঘুমের বড়ি খেয়ে শুয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আর জাগব না। কিন্তু প্রচন্ড মাথাব্যথা আর গা-বমি ভাব নিয়ে জাগলাম। আজ আর হোটেলে গেলাম না, ইচ্ছে হল তোমাকে চিঠি লিখি। একটা ছোট্ট দায়িত্ব দিলে রাখবে? শুনেছি ভাই ক্লেটন পড়শুনোয় ঢিলে দিয়ে বসেছে, বদ সঙ্গে পড়েছে। ও সত্যি কী করছে, কী করে একটু খোঁজ নিয়ে জানাবে?
-তোমার প্রিসিলা
এবার অনেক লম্বা একটা চিঠি বাছল লোবো। তাতে প্রিসিলা আবার অন্য মুডে। ইংল্যাণ্ডে গান গেয়ে একটাই উপকার হল আমার—বুঝলাম ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাণ্ডার্ডের তুলনায় আমরা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। আমরা সত্যিই খারাপ না, কিন্তু ও দেশে হারিয়ে যেতে বেশি সময় লাগবে না। একটা ক্লিফ রিচার্ড কি এঙ্গেলবার্ট হাম্পারডিঙ্ক দিয়ে কিছুই প্রমাণ হয় না। কিন্তু ওখানকার কোনো বারে, রেস্তরাঁয়, হোটেলে, নাইটক্লাবে আমি তোমার স্তরের একটা পিয়ানিস্ট দেখিনি। পিয়ানোর তোমার আঙুলের দৌড়ঝাঁপ যেন জিপসির নাচ। তিনমাস ইংল্যাণ্ডে কাটিয়ে আমি যেন নতুন করে তোমার প্রেমে পড়লাম।
প্রিসিলার মুখে আর নিজের প্রশংসা শুনতে ভালো লাগছিল না। ও বিলিতি খামে চিঠিটা ভরে দিল বাকিটুকু না পড়ে। আর বার করল অনেক পরের একটা চিঠি। প্রিসিলা লিখছে :
আমি ক-দিন হল কলকাতা ঘুরে এলাম, কিন্তু তোমার সঙ্গে দেখা করলাম না। বলতে পারো তোমার সঙ্গে দেখা করার মুখ ছিল না আমার। আই ওয়জ ক্যারিং মিকি’জ চাইল্ড। মিকিকে তুমি চিনবে না, ওর বাবার হোটেল সাম্রাজ্য। আমি নরিন্দরের সঙ্গে লণ্ডনে গিয়ে ওর সঙ্গে ফিরে এসেছিলাম। নরিন্দর আমায় বিয়ে করতে চেয়েছিল, কিন্তু ছেলেপুলে চায়নি। মিকি আমায় সন্তান দিল। কিন্তু বিয়ে করতে অস্বীকার। অ্যাণ্ড আই ড্ডি নট ওয়ন্ট আ ফাদারলেস চাইল্ড। তাই কলকাতা গিয়েছিলাম যাকে বলে পেট খালাস করতে।
বলা বাহুল্য, আমি তোমার সঙ্গে দেখা করিনি। —প্রিসিলা
চিঠিটা শেষ করে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল লোবো। একবার ভাবল, চিঠিগুলো আগে না পড়ে ভালোই হয়েছে। ফের ভাবল বড্ড দেরি হয়ে গেল বুঝি। অন্তত শেষ চিঠিটা যদি আগে…
লোবো ফের একটা চিঠি খুলল। দেখল চিঠি নয়, আর্তনাদ। প্রিসিলা লিখছে:
অ্যাট লাস্ট আই অ্যাম দ্য পার্ফেক্ট হোর। প্রকৃত বেশ্যা। আমার কোনো স্বাদ-বর্ণ-অনুরাগ নেই। আমার মূল্যবোধের ভাঁড়ার শূন্য। আমার গানের গলা এখন যাও বা আছে, গানের ইচ্ছে একেবারেই নেই। তবু ফি-সন্ধ্যে হোটেলের ফ্লোরে নেচে-কুঁদে কত যে কী ছড়াই। একটিও লাভ সং-এর মধ্যে আমার বুকের দরদ মেশে না। স্বভাবে গাই। অভ্যেসে গাই, আর কিছু করার নেই বলে গাই। ক্লেটন এসেছিল আমায় কলকাতায় নিয়ে যেতে। বলল বাবা চোখে দেখতে পায় না একদম, অপারেশনে কাজ হয়নি। মা শুধু আমার নাম করে আর কাঁদে। বললাম, তুমি ছেলে, তুমি থাকতে আমাকে নিয়ে টানাটানি কেন? কলকাতায় ফিরে আর আমি তোমাদের কী কাজে আসব? এখানে থেকে তবু তো টাকা পাঠাতে পারছি। কলকাতার হোটেল-রেস্তরাঁয় এ পয়সা কে দেবে?
ক্লেটন বলল, বাবা-মা তোমার সঙ্গ চায়। টাকার পরিমাণটা না হয় কমই হল। জিজ্ঞেস করলাম, আর তুমি নমো নমো করে কিছু টাকা বাড়িতে দিয়ে উড়ে বেড়াবে? তুমিই বা বিয়ে করছ না কেন, যদি বাড়িতে একজন মহিলারই দরকার থাকে এতটা? ক্লেটন করুণ মুখে বলল, আই কানট প্রিসিলা। আমি সন্ন্যাসী হব ঠিক করেছি। সেজন্যই তো তোর কাছে আসা। ফাদার ক্লয়াম বলেই দিয়েছেন, বাড়ির সবার অনুমতি নিয়ে তবেই এ পথে এসো।
জিজ্ঞেস করলাম, তুই বাবা-মা-র অনুমতি নিয়েছিস? ও বলল, এখনও নয়। সেটা তুই-ই আদায় করে দে। প্লিজ!
হঠাৎ লোবো নজর করল ঘুমের মধ্যে মস্ত মস্ত শ্বাস নিচ্ছে প্রিসিলা। দেখে মনে হচ্ছে স্প্যাজম হচ্ছে। লোবো উঠে ডাক্তার ডাকতে যাচ্ছিল, মাঝপথে ওয়ার্ডের মুখে দেখা হয়ে গেল নার্স মিস দত্ত-র সঙ্গে। লোবোর কথা শুনে মৃদুলা দত্ত বললেন, ওটা স্প্যাজম নয়। ওটা হয় এই স্টেজে। ও নিয়ে আপনি ভাববেন না। লোবো ফিরে গিয়ে বসল প্রিসিলার মাথার কাছে। দেখল ফের সেই গভীর ঘুমে ঢলে আছে মেয়েটা। মুখের প্রশান্তি ফিরে এসেছে।
লোবো ফের একটা চিঠি খুলল, এবার একটা খামের চিঠি। চিঠিটা যখন হাতে আসে বছরখানেক আগে ওর বড্ড ঝোঁক হয়েছিল সেটা খুলে দেখার। তার কারণটাও অদ্ভুত। ওয়র্ল্ড মাদারস ডে, জননী দিবসের একটা স্ট্যাম্প ছিল খামটায়। তাতেই কীরকম একটা আনচান ভাব হল ভিতরে, কিন্তু দীর্ঘ অভ্যেসের জোরে সেই কৌতূহলও দিব্যি দমন করেছিল লোবো। লেটারবক্স থেকে বার করে অনেকক্ষণ সেটা দেখার পর ও একবার ঘুরিয়ে প্রেরকের নামটা দেখতে গেল। কিন্তু সেখানে কিছু নেই; কিন্তু হাতের লেখাটা যাবে কোথায়? এ লেখা তো নিজের হাতের লেখার মতোই চেনা ওর। ও চিঠিটা নিয়ে গিয়ে দেরাজে বাকি চিঠিগুলোর সঙ্গে রেখে রবার ব্যাণ্ড পরিয়ে দিল।
এটাই সম্ভবত প্রিসিলার শেষ চিঠি। এই চিঠিটাই কি পড়ার চেষ্টা করেছিল অমিত? লোবোর ঠিক মনে পড়ে না। যদি তা না হয় তা হলে এর খামটা এত নিপুণভাবে কাটা কেন? না, না, না, অমিত এ চিঠি খোলেনি, অনেকদিন আগে সেই নিষেধের পর তা কখনো কোনো চিঠি ছোঁয়নি। নাকি নিঃশব্দে, চুপিসাড়ে পরে কখনো সত্যি একটু চেখে দেখতে চেয়েছে ওর লোবো মাস্টারের জীবনের রহস্য!
