একইসঙ্গে দু-দুটো আকাশ ভেঙে পড়ল দু-জনের মাথায়। অমিত দিল্লির ‘স্টেটসম্যান’-এ বদলি নিয়ে চলে গেল, আর সেই প্রথম জীবনে আমার মনে হল চাকরি নিয়ে বম্বে চলে যাই। ম্যানেজার সিলভিওর সঙ্গে এই নিয়ে অনেক কথাবার্তাও হল। ও বলল, ইটস গুড দ্যাট ইউ আর লুকিং ফর আ চেঞ্জ। বছরের পর বছর কলকাতায় কাটানোর পর একটু জগৎ দেখারও দরকার আছে। তবে বরাবরের মতো বম্বে থেকে যাওয়ার কোনো মানে হয় না, ইটস নট ওয়র্থ ইট। তুমি লিয়েন নিয়ে ছ-মাসের জন্য যাও। না হলে তোমার দশাও ওই প্রিসিলার মতো হবে।
প্রিসিলার মতো দশা! আমি চমকে উঠেছি। কেন, প্রিসিলার আবার কী দশা হল!
কিন্তু লজ্জার মাথা খেয়ে জিজ্ঞেস করতে পারলাম না তোমার সম্পর্কে। তবে আজ কিছুটা বুঝলাম সে-দিন সিলভিও ঠিক কী বলতে চেয়েছিল। এই তুমি আমার সামনে শুয়ে আজ শিশুর মতো কুঁকড়ে, কিন্তু কোথায় তোমার সেই সাত বছর আগের নিষ্পাপ চোখ-মুখ নিঃশ্বাস? তোমার শ্বাস-প্রশ্বাসের মধ্যেও এখন ক্লান্তির লয়। তোমার ঘুমও প্রকৃত ঘুম নয়, ঘোর। যেকোনো মুহূর্তে, আশঙ্কা হয়, তুমি উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে ফের বলবে, আমায় একটু রাম দাও, ঘুমের বড়ি খাব।
কিন্তু আর ঘুমের অপেক্ষা করে কাজ নেই। দিনের প্রথম আলো এই এসে পড়ল তোমার মুখে। নতুন একটা দিন শুরু হল, এবার তোমার মুখে শুনব তোমার সাত বছরের জীবনকাহিনি। আমি ঘুমের মধ্যে তোমার সব কথা শুনতে পাব। যদি কখনো মনে হয় বড় বেশি তলিয়ে গেছি স্বপ্নে-দুঃস্বপ্নে আমায় ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দিও।
কিন্তু কই? তুমি তো উঠছ না! মুখে এতখানি রোদ মেখে কেউ ঘুমিয়ে থাকতে পারে? এ আবার কী ঘুম তোমার প্রিসিলা? এসব ঘুমে তো জীবনের সব স্মৃতি মুছে যায়। তুমিও শেষে সেই অমিতের মতো করে বসলে তো?
৩.
সনি লোবো বসেছিল প্রিসিলার মাথার কাছে। কোমা থেকে এখনও জেগে ওঠেনি মেয়েটা, যদিও ডাক্তারের ধারণা এবারের মতো ও বেঁচে গেল বলে। পেট থেকে পাম্প করে মদ ও ঘুমের বড়ি বার করে দিলেও ওর ঘুমটা যেন কাটতেই চায় না। ভিজিটিং আওয়ার্সে ক্যাম্বেল হাসপাতালের এই ওয়ার্ডটা যেন খেলার মাঠ হয়ে যায়। ভিজিটরদের কথাবার্তায় অ্যাত্তো বড়ো হলটা গমগম করে, যেন রাইটার্স বা কর্পোরেশনের ফ্লোর। যত নিস্তব্ধতা যেন প্রিসিলার এই বেডের পাশে। মেয়েটা ঘুমে অচেতন আর লোবো ওকে নির্নিমেষ দেখেই যায়।
ক্যাম্বেলে আজ তৃতীয় বিকেলে লোবো এসে প্রিসিলার মাথার কাছে বসেছে। প্রিসিলা চোখ মেলবে কি না, কথা কইবে কি না জানা নেই। কিন্তু প্রিসিলার কণ্ঠস্বর ওর মাথার মধ্যে বাজছে। কারণ সাতবছর ধরে না পড়ে ফেলে রাখা চিঠিগুলো আজ ও সঙ্গে এনেছে পড়বে বলে। তিনটে চিঠি শুধু খামে। বাকি ষোলো-সতেরোটা নীল ইনল্যাণ্ডে। অনেকক্ষণ ধরে কিছু লেখার অভ্যেস প্রিসিলার কোনো কালেই ছিল না, ও ভালোবাসত অনর্গল কথা কইতে নয়তো গান গাইতে।
লোবো একেবারে প্রথম দিকের একটা চিঠি খুলল। নানারকমের ভুল বানানে প্রিসিলা লিখছে:
আমার চিঠির উত্তর পাইনি, তবু লিখছি। আমি ছেলেবেলার অনেক অভিজ্ঞতা থেকে একটা জিনিস শিখেছি—প্রেম কোনো টু ওয়ে টিকিট নয় যে গেলাম আর ফিরে এলাম। এটা একমুখী টিকিট, ফলে শুধু যাওয়া আর যাওয়া। আমি সেই যে যাওয়া শুরু করেছিলাম তোমার হৃদয়ের দিকে সে-যাওয়া আমার শেষ হল না।
অথচ তুমি আমার গন্তব্যপথ থেকে সরে গেলে, সরে যাচ্ছ। তুমি বলবে বম্বের দিকে পা বাড়িয়ে আমি পথ হারিয়েছি। হয়তো; কিন্তু তুমি পারতে না আসতে বম্বে? কী দিয়েছে। তোমার কলকাতা? বম্বেও শেষমেশ হয়তো কিছুই দেবে না, কিন্তু টাকা? খ্যাতি? ঢের বেশি উন্নতমানের জীবনযাত্রা? জানি তুমি বলবে, বিনিময়ে যা হারাব সে-তুলনায় এসব কিছু নয়। কিন্তু চলে আসার দিনও আমি ভাবতে পারিনি ওই সামান্য সময়টুকুও তুমি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে। সেই সময়টা ফুরিয়ে আসছে, কিন্তু তুমি আমাকে ফেরার জন্য তাগিদ দিয়ে একটাও চিঠি লিখলে না। তুমি কি আমার চিঠিগুলো পড়োও না? আমার চলে আসাতে তোমার যে এত অভিমান, এত ক্ষোভ তার এতটুকু আঁচও তো আমি পাইনি আসার দিন। তোমার চুম্বন থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম তোমার মনে ব্যথা আছে, কিন্তু ক্ষোভ?
ছিঃ, আমি এসব কী গুরুগম্ভীর হাবিজাবি লিখছি। এভাবে তলিয়ে ভাবার স্বভাব তো তোমার। আমি তো কেবল দুমদাম ভাবি আর বলি। তুমি জানো না বোধ হয় বম্বেতে কেউ একটা অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান মেয়েকে হাঁ করে দেখে না। সেভাবে ইজ্জতও করে না। কলকাতায় আমরা তাচ্ছিল্য ও সম্মান দুটোই পাই, যেটা ভালো। বম্বেতে হারিয়ে যাওয়া বড়ো সহজ; তবে ভয় করো না, আমি হারিয়ে যাব না। তবে তুমি একবার অন্তত ভুল করেও বম্বে এসো। দেখবে এখানে তোমার মতো একটিও পিয়ানিস্ট নেই। আমি সবাইকে তোমার কথা বলি, আর সবাই বলে, হোয়াই ইজ হি রটিং ইন ক্যালকাটা! ও কলকাতায় পচছে কেন?—
তোমার প্রিসিলা
এর বেশ কিছুকাল পরের একটা চিঠি খুলল লোবো। প্রিসিলা লিখছে :
আমি আর তোমার চিঠি আশা করি না। তবু মনের কথা বলতে ইচ্ছে করে, তাই লিখছি। বম্বেতে এই দেড় বছরেও মনের কথা বলার লোক জোটেনি। তা হলে বুঝছ তো শহরটা কীরকম? আত্মার স্পর্শ বড়ো কম, শুধু দেহের লীলা। এর আগের চিঠিতেই আমি লিখেছিলাম হোটেলের কর্তার ছোটোভাইয়ের সঙ্গে আমি ফেঁসে গেছি। ফলে খুব সুখেই আছি বলতে পারো। অন্য লোকের থাবা থেকে বাঁচানোর জন্য নরিন্দর আমাকে একটা সাদা স্ট্যাণ্ডার্ড হেরাল্ড উপহার দিয়েছে। ভাবতে পারো, একটা ব্ৰাণ্ড নিউ স্ট্যাণ্ডার্ড হেরাল্ড!
