মা আমার মাথাটা ওর বুকের মধ্যে চেপে ধরল বহুক্ষণ, বস্তুত আমি ঘুমিয়ে পড়া অবধি। সে-দিন ভোররাতে আমি স্বপ্ন দেখলাম জন্মদাত্রী মাকে, আমার পাশে শুয়ে যুদ্ধের গল্প বলছে।
ভণিতা না করেই বলা উচিত আমার যে, আই ওয়জ আ বর্ন জিনিয়াস। মাস ছয়েক যেতে যেতেই বুঝতে পারছিলাম পিয়ানোর কি-বোর্ড আমার কথা শোনে। বছরখানেকের মধ্যে মা-র শেখানো সব লেসনকেই আমি নিখুঁত করে ফিরিয়ে দিতে পারছিলাম। ন-বছর বয়সে আমি পাড়ার চার্চের অর্গানে বসলাম। বারো বছর বয়সে পৃথিবীর সব বিখ্যাত গান আমার আঙুলের ডগায়। আঠারো বছর বয়সে আমি রেস্তরাঁয় বাজিয়ে টাকা আনছি ঘরে, বাবার মদ কিনে দিচ্ছি, মা-র ফ্রক, গাউন, জুতো। ছয় থেকে আঠারো এই বয়সটা যে কীভাবে, কখন কেটে গেল আমি যেন টেরই পেলাম না। ওই বারো বছরের স্মৃতি বলতে শুধু একটাই— পিয়ানো, আরও পিয়ানো, আরও আরও পিয়ানো।
তারপর হঠাৎ একদিন খেয়াল হল আমি কত বড়ো হয়ে গেছি, বাইশ কি চব্বিশ। আর বাবা-মা বুড়ো হয়ে গেছে। বাবার কত চুল সাদা হয়ে গেছে, একেকটা সফর থেকে যখন ফেরে আরও কিছুটা করে চুল সাদা হয়ে আসে। মা-র চুল সাদা হয় কখনো বাবার ফেরার প্রতীক্ষায়, কখনো হোটেল থেকে আমার ফেরার বিলম্বে। আধুনিক গানের পিসগুলো যখন তুলি দেখি মা আর কৌতূহল নিয়ে পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে না শুধু বলে, দিস ইজ নট এনাফ, সনি।
না, প্রিসিলা, এভাবে আমার সারা জীবনের গল্প তোমায় শুনিয়ে কাজ নেই। বয়স হলে বাবারা মারা যায়, মায়েরা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। মাও পড়েছিল। আমি চাইনি, কিন্তু উপায় ছিল না। মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এসেছিলাম। তারপর থেকে ঘরটা এত থমথমে, নিষ্প্রাণ লাগত যে পিয়ানো বাজিয়ে, রেডিয়োয়াগ্রাম চালিয়ে নিস্তব্ধতার ভূত তাড়াতাম। তোমার হয়তো মনে আছে প্রিসিলা যে, যে একবার আমার এই ফ্ল্যাটে, এই সংকীর্ণ বিছানায় আমরা দৈহিকভাবে মিলিত হয়েছিলাম, তুমি বলেছিলে, ওহ, হোয়ট আ নয়জি কট! কী বিদঘুটে আওয়াজ করে তোমার খাটটা।
আসলে খাটটার কোনো দোষ ছিল না, ঘরটাই এত থমথমে যে আশপাশের আওয়াজ বন্ধ হলে মনে হত গোরস্থানে এলাম বুঝি। তবু বলছি, আমি জীবনে কখনো ভুলতে পারব না ওই প্রথম মিলন দিনটি। আর এও ভুলব না সেই মিলনের পর তোমার আদুরে প্রশ্ন কোন যন্ত্রণা বেশি সুরেলা—তোমার ওই পিয়ানো, না আমার এই শরীর?
অমিতের অফুরন্ত জিজ্ঞাসা ছিল তোমার ব্যাপারে। তোমার কথা জিজ্ঞেস করে ও আমার মন জানতে চাইত। এখন মনে হয় তোমার চিঠিগুলো ওকে পড়তে দিলে মন্দ হত না। পাসটাস করে যখন চাকরি করছিল ‘স্টেটসম্যানে’, একটা লেখা লিখেছিল সংগীতজ্ঞদের ব্যর্থ প্রেম নিয়ে। সে মোৎজার্ট, বেটোফেন, শ্যুমান, শুবের্ট, শোপ্যাঁ কেউ বাদ ছিল না। তখন একদিন আমায় জিজ্ঞেস করেছিল, মাস্টার লোবো, তুমি যখন টোনি ব্লেন্টের সামওয়ান এলস ইজ ইন ইয়োর আমজ টুনাইট’ বাজাও তখন প্রিসিলার মুখ মনে আসে?
তখন প্রসঙ্গ পালটানোর জন্য বলেছিলাম, তুমি তো ‘মুনলাইট সোনাটা’-র লোক, তুমি আবার পপসঙে ভিড়ছ কেন?
অমিত মুখ ভার করে বসল, সত্যিই তো আমার জবাবটা তো কোনো জবাবই ছিল না। জিজ্ঞেস করলাম, কিছু বুঝলে? ও ঝাঁঝের সঙ্গে বলল, যা বোঝার তাই বুঝলাম যে, প্রিসিলাকে ভোলার জন্য তোমার একটা হাস্যকর প্রচেষ্টা বরাবর জারি আছে। আর তুমি দোহাই পাড়ো সংগীতের।
হ্যাঁ, প্রিসিলা, আমার এই দ্বন্দ্বটা আমি ওর কাছ থেকে আড়াল করে রাখতে পারিনি। হয়তো তোমার কাছ থেকেও পারিনি। তোমার কোনো চিঠিরই যে কোনো জবাব কখনো লিখলাম না, এতেই তো ধরা পড়ে গেলাম। খানিক আগে যখন বললাম যে তুমি চলে যাওয়ার পর সাত-সাতটা বছর তোমায় ভুলে ছিলাম তখনও আমার কথার অসারতা নিশ্চয়ই তোমার কানে ধরা দিয়েছে। আসলে আমি আর অমিত দু-জনেই সংগীতকে ঢাল করে নিঃসঙ্গতার আক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করছিলাম। আমি আর অমিত দু-জনাই দু-জনার মাথার উপর ছাতা ধরছিলাম ভরবৃষ্টির মধ্যে। একসময় সত্যিই আমরা স্বামী-স্ত্রীর মতো হয়ে গেলাম। আমরা একে অন্যের স্বপ্নও ভাগাভাগি করে দেখা শুরু করেছিলাম, প্রবীণ দম্পতির মতো। একদিন সকালে তো ও উশকোখুশকো চুলে এসে হাজির, মাস্টার, তোমার কাছে একটা কনফেশন করার আছে আমার!
আমি তো আকাশ থেকে পড়েছি-কনফেশন! কীসের কনফেশন? ও বলল, একটা স্বপ্নের ব্যাপারে।
–তা আমি কি পারি যে স্বপ্ন দিয়ে কনফেশন করব?
—কিন্তু এতে যে তুমিও আছ, মাস্টার।
—শুনি কীরকম।
-আমি ভোররাতে স্বপ্ন দেখলাম আমি প্রিসিলার সঙ্গে শুয়ে আছি, ইন দ্য অ্যাক্ট অব লাভমেকিং।
আমি ক্ষুব্ধ হয়ে ঝাঁজিয়ে উঠলাম। হোয়াট ননসেন্স! তুমি কী করে জানলে সেটা প্রিসিলা? তুমি প্রিসিলাকে জন্মেও দেখোনি। আর আমার ঘরে ওর একটিও ফটোগ্রাফ নেই।
ও প্রতিবাদ করল, না, না, মাস্টার, ওটা প্রিসিলাই ছিল।
জিজ্ঞেস করলাম, কী করে বুঝলে?
—কারণ ও বারবার বলছিল, তুমি আমার থেকে আমার প্রিয়তম সনিকে ছিনিয়ে নিলে। আই হেট ইউ অ্যাণ্ড ইয়োর মিউজিক।
অনেকক্ষণ চিন্তা করে আমি শেষে বললাম, তা হলে হয়তো ওটা প্রিসিলাই ছিল।
তা হলে বুঝতে পারছ, প্রিসিলা, কীভাবে বাস্তব আর স্বপ্নে আমাদের তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল? আমাদের দুজনের সত্যিকারের বাঁচার তখন একটাই পথ–সংগীত। আমরা আরও কঠিনভাবে আঁকড়ে ধরছিলাম সংগীতকে। আমরা তখন মন দিয়ে শুনি বাখের ফিউগ, মোজার্টের অপেরা, মাহলারের ‘সাইলেন্স’, বোটোফেনের পিয়ানো সোনাটা, লিস্টের পিয়ানো পিস এবং এমনকী, শনবার্গের টুলেভ নোট স্কেল কম্পোজিশন। আমি প্রায়ই ডুব মারি হোটেলের ডিউটিতে, অমিত ডুব মারে নিউজ পেপারের শিফট ডিউটিতে। আমি কিনে নিয়ে আসি নতুন, নতুন এল পি, অমিত আনে পুরোনো, পুরোনো গানের বই। আমার রেস্তরাঁয় আমার গতিবিধি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অমিতকে শো-কজ করেছে ওর সংবাদপত্র। আমরা নিজের নিজের দুঃখ ডুবিয়ে দিয়েছি গানে, মদে আর গাঁজায়। এইসবে মজে থাকি যখন একটা আমরা তখন থোড়াই কেয়ার করি জগতের সুখ-দুঃখের। অনিয়মটাই নিয়ম হয়ে যখন স্থিতাবস্থার চেহারা নিচ্ছে ঠিক তখন দিল্লি থেকে চিঠি এল ওর ভগ্নীপতির। জানিয়েছে ওর দিদির মাথার অবস্থা ভালো নয়, শি ইজ গেটিং অ্যাবনর্মাল।
