সেই বিরক্তি আমার বহুদিন কাটেনি। আমি বাবা ও ওর নতুন বউয়ের সঙ্গে এক টেবিলে বসে খাইওনি বহুদিন। তারপর একদিন এক বর্ষার দিনে বাইরে খেলতে যেতে পারিনি, নিরুপায় হয়ে কাচের শার্সিতে বৃষ্টির ঝাপটা দেখতে দেখতে প্রহর গুনছি কতক্ষণে বেরুনো যায়। হঠাৎ কানে এল বসার ঘর থেকে পিয়ানোর সুর। বাবার নতুন বউয়ের সঙ্গে সঙ্গে এও এক নতুন উপসর্গ আমাদের বাড়িতে। একটা ইংলিশ আপরাইট পিয়ানো। আমি বসার ঘর দিয়ে যেতে-আসতে সবসময় আড়ে-ঠারে দেখেছি বস্তুটিকে কিন্তু কখনো ওটার ধারে গিয়ে দাঁড়াইনি। সবসময় মনে হয়েছে এই সৎমা আর ওর ওই পিয়ানোর জন্যই মা আজ আমাদের সংসারে নেই। বেশি করে মনে পড়ত সেই দুঃখের রাতটা যেদিন মা আমার হাত ধরে বেরিয়ে যাচ্ছিল বাড়ি থেকে। বাবা পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলল, নাথিং ডুইং। তুমি যেখানে খুশি যাও, আমার ছেলেকে নিতে পারবে না।
মা বলল, আমি তোমার মতো একটা মাতাল বদমাশের হাতে ছেলেকে রেখে যাব না।
বাবা আমাকে মার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলল, সেজন্য কোর্টে যাও। কিন্তু গায়ের জোরে এ বাড়ি থেকে তুমি ওকে বার করতে পারবে না।
আমি গলা ছেড়ে কাঁদছিলাম। বাবা আমাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে গিয়ে বিছানায় ছুড়ে দিল। আমি কাঁদতে কাঁদতে মার মুখটা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম। মনের কোণে ছোট্ট একটা আশা ছিল সকালে উঠে দেখব ফের মিল হয়ে গিয়ে বাবা-মা আগের মতোই ব্রেকফাস্ট খাচ্ছে ডিনার টেবিলে বসে।
এর আগেও বহুবার মা রাগ করে চলে গেছে, ফের ফিরেও এসেছে। কিন্তু কোনোবারই আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেনি। তা হলে সেবার কেন করল? এটা ভাবলেই বুকটা কেঁপে উঠত। তবু ভাবলাম আমাকে ছেড়ে মা আর কতদিন বাইরে থাকবে। কিন্তু শেষে সেই আশাটাও একটু একটু করে মিলিয়ে যেতে থাকল। আর তারপর একদিন অবশেষে, বাবা নিয়ে এল এই দু-নম্বর বউ আর ওই কটেজ পিয়ানো। দুটোই আমার অশেষ যন্ত্রণার কারণ হল। অথচ সে-দিন সেই ভর বিকেল বর্ষা-বাদলের মধ্যে ও কী শুনলাম আমি? …পিয়ানোয় যে-সুর বাজছিল তখন আর কোনোটাই আমার চেনা সুর নয়, অথচ সমানে মনে হচ্ছিল তাদের আমি কোথাও না কোথাও, কখনো না কখনো শুনেছি। হয়তো সেটা নিছকই মনে হওয়া কারণ ও সুর আমি সত্যিই কখনো শুনিনি। আমি আমার ঘরে বসে জানালার শার্সিতে বৃষ্টির ঝাপটা দেখতে দেখতে ওই বাজনা শুনলাম। এভাবে কতক্ষণ যে শুনেছিলাম খেয়াল ছিল না, তার মধ্যে বৃষ্টি থেমে গেছে কখন, বিকেল পড়ে সন্ধ্যে নেমে চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেছে। আমার ঘরও অন্ধকার, কারণ আমি উঠে গিয়ে সুইচ টেপার চেষ্টাও করিনি। তার মধ্যে বার কয়েক সত্য বাজনা থামিয়েছে, বসার ঘরের আলো জ্বেলেছে, চা করে আমার ঘর দিয়ে গেছে, তারপর ফের বসেছে গিয়ে পিয়ানোয়। আমি কখন যে কী ভাবতে ভাবতে চা আর বন রুটি খেয়েছি খেয়াল হয়নি। দীর্ঘ চটকা ভাঙল শেষে যখন বাবা এসে পিয়ানোর আওয়াজ ছাপিয়ে ওর হেড়ে গলায় খালাসিদের গান জুড়ল। আজ বলতে দ্বিধা নেই প্রিসিলা, খালাসিদের বেহেড মাতাল হয়ে বেসুরো গানের প্রতি বিতৃষ্ণা আমার সেইদিনই জন্মায়। আমাদের পাড়া জুড়ে যে বীভৎস নৈশসংগীত জন্মাবধি শুনে আসছি, সেই সুরের নৈরাজ্যের মধ্যে প্রথম এক ঝলক বসন্তের বাতাসের মতো শুনিয়েছিল সৎমার ওই প্রথম বাজনাটা। বিশৃঙ্খল ধ্বনির সমুদ্রে সুরের এক ক্ষুদ্র দ্বীপ যেন। সেই রাতেই প্রথম আমি বাবা ও তার নতুন বউয়ের সঙ্গে একই টেবিলে ডিনারে বসি। একটা পোর্ক চপ কাঁটা-চামচে কাটতে কাটতে হঠাৎ বাবার নতুন গিন্নিকে জিজ্ঞেস করে বসি, তুমি ওটা কী বাজালে বিকেলে পিয়ানোয় বসে?
সৎমা জিজ্ঞেস করল, কেন, তোমার ভালো লেগেছে?
আমি আলতো করে মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝালাম হ্যাঁ।
সৎমা বলল, ওটা একটা বিখ্যাত ক্ল্যাসিকাল পিস।
জিজ্ঞেস করলাম, ক্ল্যাসিকাল পিস কী?
সৎমা বলল, যা এমনি গান-বাজনার থেকে অনেক উপরে।
—তা হলে আমার ভালো লাগল কেন?
—কারণ তোমার মধ্যে সেই পিপাসাটা আছে।
–পিপাসা? কীসের পিপাসা?
—সুরের।
—তা কী করে মেটে?
–যদি তুমি পিয়ানো কি ভায়োলিন কি ফুট শেখো। শিখবে?
—কে শেখাবে?
—কেন আমি! কিন্তু আমি তোমাকে শুধু বাজাতেই শেখাতে পারব। ক্ল্যাসিকালে আমার পুঁজি খুব কম।
—কিন্তু ওই প্রথম পিসটা তুমি আমাকে শেখাবে, হোয়াটএভার ইটস নেম।
মা বলল, ওটার নাম আ লিটল নাইট মিউজিক। এক ভিয়েনিজ প্রতিভা ওটি তৈরি করে। মোজার্ট।
আমি বিশেষ কিছুই বুঝলাম না, তাই ঠোঁটটা গোল করে শুধু বললাম, ‘অ!
মা বলল, আমি দ্বিতীয় যে-পিসটা বাজালাম সেটা কিন্তু বিশেষ করে পিয়ানোর জন্য বানানো। নাম ফান্তেজি’। ওটা বানিয়েছেন যিনি তাঁর নাম শোপ্যাঁ।
আমি ফের সংক্ষেপে বললাম, ‘অ!’
সে-দিন রাত্রে আমার ঘরে এল মা, আমার মাথার কাছে বসল, আর বলল, সনি, আমি তোমার মা। সম্মা-টঙ্খ নই, শুধু মা। আমি তোমাকে জন্ম দিইনি, বুকের দুধও খাওয়াইনি। কিন্তু আমি তোমাকে জীবনের সেরা দানটা দিতে চাই, প্রাণের পরই যার স্থান। গান। সংগীত। পিয়ানো। গোটা পৃথিবীটাকে তুমি দশ আঙুলের মধ্যে পাবে যেন।
এক প্রবল উত্তেজনা বোধ করলাম সারা শরীরে, আমি গায়ের লেপ সরিয়ে উঠে বসে জাপটে ধরলাম মাকে, ওর সারা গালে চুমো দিতে লাগলাম, তারপর এক নিমেষে ওর জামার বোতামগুলো খুলে ফেলে স্তনে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগলাম, মা, তোমরা দুই মা মিলে একসঙ্গে থাকতে পারো না এই বাড়িতে?
