তখন আমি মুখ বুজে সব সহ্য করেছি। কিন্তু আজ…আজ…, এই মুহূর্তে আমি জাদুকর। পিয়ানোর কি-বোর্ড আমার আঙুলের স্পর্শে তাদের সেরা সুর উগরে দেয়। পিয়ানোকে আমি প্রেয়সীর মতো উষ্ণ করে তুলতে পারি আদরে আদরে। আই ডোন্ট কেয়ার হোয়াট ইয়োর ড্যাডি বিলিভড, বাট…অমিতের মতো একজন মানুষ আমাকে জাদুকর বলে মেনে নিয়েছিল। শুনবে সেই দিনটার কথা যেদিন ওর কথায় আমার চোখে জল এল?
সেও এক শীতের দিন ছিল, আমি ট্রিনকাসের ব্যাণ্ডের সঙ্গে সে-সময়ের পপ হিটস সব বাজাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম দরজা ঠেলে রেস্তোরাঁয় ঢুকছে অমিত। এর আগে বহুবার বলা সত্ত্বেও ও ট্রিনকাসে আমার বাজনা শুনতে আসেনি। ভালো ডিনারের লোভ দেখানো সত্ত্বেও। বললেই বলত, মাস্টার, তোমার মতো একটা লোক রেস্তোরাঁর ব্যাণ্ডে বাজাচ্ছে এ আমি চোখে দেখতে পারব না। ইউ বিলং ইন আ প্রপার ক্ল্যাসিকাল স্টেজ।
বলতে বাধা নেই আজ, এই অমিতই প্রথম শিখিয়েছিল আমাকে একটা ব্যাণ্ড আর একটা ক্ল্যাসিকাল অর্কেস্ট্রার মধ্যে তফাত। ওই প্রথম বোঝাল পিয়ানোর কী সুউচ্চ সম্মান আর গভীর গুরুত্ব পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গসংগীতে। বলেছিল, লোবো মাস্টার, তুমি কি জানো মোৎর্জাট, বেটোফেন, শোপ্যাঁ-রা কোন যন্ত্রে নিজেদের স্বপ্নে সুরগুলোকে প্রথম ধরতেন? তোমাকে আমি তোমার বাড়ির পিয়ানোতে পেতে চাই। তোমার ওই ফ্ল্যাটই তোমার ক্ল্যাসিকাল স্টেজ।
তো সে-দিন ওকে ট্রিনকাসে ঢুকে আসতে দেখে আমি বেশ অবাকই হয়েছিলাম। পরনে কালো স্যুট, নীল শার্টের কলারে লাল নেকটাই। অমিতকে বড় স্মার্ট আর চোখকাড়া লাগছিল। আমি বাজনা শেষ করে এসে বললাম, কী অমিত, আজ রাস্তা ভুল হয়েছে মনে হয়।
ও জিজ্ঞেস করল, তোমার ডিউটি শেষ হয়েছে মাস্টার? আমি ‘হ্যাঁ বলতেই ও বলল, তা হলে চলো, তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
শীতের অন্ধকারে পার্ক স্ট্রিট দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী কথা অমিত? ও বলল, আমার দিদির বিয়েতে কাল তোমাকে একজন সাক্ষী থাকতে হবে। আমি রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, তার মানে?
–তার মানে আমার দিদির বিয়েতে তুমি উইটনেসে সই করছ।
আমার বিস্ময় তখনও কাটেনি। জিজ্ঞেস করলাম, দুনিয়ার এত লোক থাকতে একটা হিন্দু বিয়েতে খ্রিস্টান উইটনেস!
অমিত বলল, উইটনেসের আবার হিন্দু, খ্রিস্টান কী? বললাম, দ্যাখো অমিত, এ তো খুনখারাপি, ডাকাতির উইটনেস নয়। একটা পবিত্র, ধর্মীয় অনুষ্ঠান।
ও বলল, সংগীতজ্ঞের আবার হিন্দু, খ্রিস্টান কী মাস্টার? তার উপর তুমি তো শুধু পবিত্র, ধর্মীয় নও, তুমি জিনিয়াস।
সত্যি প্রিসিলা, এর চেয়ে বড়ো সম্মান আমি পাইনি জীবনে। পথ চলতে চলতে কোনো মতে চোখের জল সামলাচ্ছিলাম। শেষে তাও পারলাম না, যখন অমিতেরও চোখে জল দেখলাম। উদবিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, অমিত, তোমার চোখে জল।
ও পোলিয়োয় শুকিয়ে যাওয়া হাতে চোখের জলটা মুছতে মুছতে বলল, দিদির বিয়েটা বাড়িতে কেউ মানতে পারছে না, জানো?
জিজ্ঞেস করলাম, কেন? ছেলে ভালো নয়?
–দারুণ ছেলে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বড়ো অফিসার।
–তা হলে সমস্যাটা কোথায়?
–ছেলেটা খ্রিস্টান।
আমরা অনেকক্ষণ নিঃশব্দে হেঁটে পৌঁছে গিয়েছিলাম পার্ক স্ট্রিটের মুখে কবরখানাগুলোর কাছে। অন্ধকারে আরও নির্জন আর ভয়ংকর দেখাচ্ছিল গোরস্থানটাকে। আমি হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসলাম, তা হলে তুমিই বা বিয়েতে অমত করছ না কেন? তোমরা বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবার।
কবরস্থানের অন্ধকার পটভূমিকায় ছোট্টখাট্ট অমিত একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, কারণ শর্মিলা ভালোবাসে অ্যান্ড্রকে। এনি ফারদার কোয়েশ্চনজ?
আমি তড়িঘড়ি সংক্ষেপে বললাম, নো।
প্রিয় প্রিসিলা, এখন চাইলে তুমি কিছুটা অন্তত বুঝতে পারবে কেন আমি অমিতের কথাকে এত সম্মান দিই। দিই, কারণ আমার জীবনের সেরা সম্মানগুলো ও-ই আমার দিয়ে গেছে। ও আমাকে মাস্টার অ্যাখ্যা দিয়েছে, ও আমাকে সামান্য টিউন প্লেয়ার থেকে পিয়ানো পারফর্মার করছে। ও আমাকে জীবনের নিঃসঙ্গতম দিনগুলো সঙ্গদানে ভরিয়ে দিয়েছে…বড়ো কথা, ও আমাকে একটা পাতি অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান থেকে বার করে বাইরের আলোকিত জগতে ছুড়ে দিয়েছে। তুমি জানো, মৃত্যুর আগের দিন মা কী বলেছিল আমাকে কারণ সেই সময় তুমি ছিলে আমার পাশে। হ্যাঁ, তোমাকে বিয়ে করার কথা বলেছিলেন। আর এও বলেছিলেন যে, রোজ সন্ধ্যায় আমি হোটেলে বসে যা বাজাই দ্যাটস সিম্পলি নট এনাফ।
মা-র প্রথম উপদেশটা কাজে আসেনি কারণ তুমি আমায় ছেড়ে চলে গেলে। মা-র দ্বিতীয় নির্দেশটা আকস্মিকভাবে বাস্তব হল কারণ একদিন সন্ধ্যায় প্রচুর মদ্যপান করে টং হয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম তখন আমার পিছু পিছু উঠে এল একটা অপরিচিত ছেলে, যাকে দেখে প্রথম প্রথম আমি বেশ বিরক্তিই হচ্ছিলাম।
হায়, হায়, হায়! ফের সেই বিরক্তির কথা। তোমার মনে পড়ে মা-র মৃত্যুর পর তোমাকে মা-র জীবনকথা শুনিয়েছিলাম? সেই বোধ হয় প্রথম বলি তোমাকে যে মা আমার জন্মদাত্রী মা নয়। অগাথা লোবো আমার সত্য। কিন্তু আমার জীবনের সব কিছু ভালোর জন্যই দায়ী একমাত্র ওই মা। আমার বাবার কাছ থেকে আমি মদ, সিগারেট এবং মহিলাসঙ্গে দীক্ষার বেশি কিছু পাইনি। মা শিখিয়েছিলেন পিয়ানো। আজ আমি যেটুকু যা সবই ওই পিয়ানোর জন্যে। কিন্তু তোমাকে কি বলিনি ছ-বছর বয়সে যখন আমার জন্মদাত্রী মা বাবার মদ এবং লাম্পট্যে বীতশ্রদ্ধ হয়ে বাড়ি ছেড়ে একবস্ত্রে চলে গেলেন আর তার ক-মাস পর বাবা বিয়ে করে আনল অ্যান অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান ওম্যান উইথ লট অব ইংলিশ ব্লাড। আমি আলমারির মাথা থেকে লাফ মেরে ইচ্ছে করে পা ভেঙেছিলাম। হাসপাতালে চোখ মেলে দেখলাম মাথার কাছে বাবার সেকেণ্ড ওয়াইফ বসে। আমি চিৎকার করে বলে উঠেছিলাম, নার্স, এই ডাইনিটাকে আমার মাথার কাছ থেকে সরাও।
