তুমি কালো গাউনের লম্বা হাতা সরিয়ে সেই সব কাটা-ছেড়া আমায় দেখালে। তারপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার ফাঁকে ফাঁকে চাপাস্বরে গাইলে কে সেরা সেরা। আর ঠিক তখন, সেই মুহূর্তে আমি তোমার প্রেমে পড়ে গেলাম। ভুলে গেলাম তোমার সঙ্গে আমার বয়সের বেশ বড়োসড়ো ফারাক। ভুলে গেলাম আমার জীবনের প্রতিজ্ঞা যে কখনো বিয়ে করব না। সেক্স ইজ ফাইন, একটা দুটো লম্বা সম্পর্কও ঠিক আছে, কিন্তু প্রেম, বিবাহ…ওহ, নো! আই কান্ট হ্যাণ্ডল দ্যাট।
আমি তোমার চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে কী বলেছিলাম মনে আছে? বলেছিলাম, আগামী অফ ডে-টা আমার সঙ্গে কাটাবে, প্রিসিলা? তুমি বললে, কাটাব; কিন্তু কোনো হোটেল, রেস্তরাঁ বা সিনেমা হলে নয়।
আমি ভিতরে ভিতরে সিঁটিয়ে গিয়েছিলাম। ভাবলাম, মেয়েটা বলে কী! আমার মতো লোকের জীবনে হোটেল, রেস্তরাঁ, সিনেমার বাইরে আছেটা কী? আর আছে নিজের ফ্ল্যাটটুকু। প্রথম দিনই ফ্ল্যাটে আসার কথা বললে ভাববে বিছানায় নেওয়ার ধান্ধা করছি। আমি হোটেলের নির্জন লবিতে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে কত কী আকাশ-পাতাল ভাবলাম। শেষে কী মনে করে দুম করে বলে দিলাম, নো নো, ডোন্ট ওরি, আমি তোমাকে একটা অভিনব অভিজ্ঞতা উপহার দেব তোমায় অফ ডে-তে।
কী ছিল সেই অভিজ্ঞতা, তোমার মনে পড়ে? আমি তোমাকে ঝিরঝিরে বৃষ্টির বিকেলে নিয়ে গিয়েছিলাম সার্কুলার রোডে ওল্ড পিপল হোমে মার কাছে। আমার হাতে কেক, পেস্ট্রি, বিস্কুট আর ওষুধ ছিল মার জন্য। আমি বলেছিলাম তোমাকে সেগুলো তুলে দিতে ওঁর হাতে। আর মনে আছে উনি কী বলেছিলেন বিদায়মুহূর্তে? আমার হাতটা ওঁর হাতে চেপে ধরে বললেন, সনি, তোর জীবনে দুটো অপূর্ব জিনিস আছে, সামলে-সুমলে রাখিস। জিজ্ঞেস করলাম, কী আছে আমার জীবনে মা? মা একবার তোমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই মেয়েটি। তারপর আমার দিকে চেয়ে বললেন, আর তোর পিয়ানো।
আমি পরিস্থিতির সামাল দেওয়ার জন্য বললাম, এই মেয়েটি আমার নয়, মা। সবে পরিচয়টা একটু ঘনিষ্ঠ হয়েছে। আর পিয়ানোটাও আমার নয় মা। ওটা তোমার।
তখন ওই বারান্দার ইজিচেয়ারে আরও এলিয়ে গিয়ে মেঘলা আকাশ দেখতে দেখতে মা বললেন, কে আর সব কিছু নিয়ে জন্মায়? একটু একটু করে নিজের করে নিতে হয়?
সে-দিন বৃদ্ধাশ্রম থেকে বেরিয়ে প্রথম কথা বলেছিলে তুমি। কিছু বলার জন্য নয়, একটা কথা জানার জন্য প্রশ্ন করলে—কেন তুমি মাকে বললে আমি তোমার নই?
সত্যি বলছি। সে-দিন এ প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না আমার কাছে। আমি অবাক হয়ে তোমার দিকে চেয়েছিলাম। তুমি বললে, সনি, আমি বাড়ি যাব। আমি তোমাকে তোমাদের রয়েড স্ট্রিটের বাড়িতে পৌঁছে দিলাম। ফ্ল্যাটের দরজার মুখে তুমি আমার হাত চেপে ধরলে। কী উষ্ণ স্পর্শ সেটা, হাত যেন পুড়ে যাচ্ছে। আমি তোমার ঠোঁটে চুম্বন করলাম, অমন সুন্দর চুম্বন আমি কাউকে করিনি আগে। কারণ তার আগে তো কাউকে হৃদয় দিইনি। প্রথম যৌবনের নেশায় একে-তাকে হাবিজাবি চুমু সব। কিন্তু এই চুম্বন?
ঠোঁট থেকে ঠোঁট সরিয়ে নিয়ে তুমি কাঁদো কাঁদো স্বরে বললে, বড্ড একলা লাগছে, সনি। আজ থেকে যাও।
আমি থাকার জন্যই তোমার সঙ্গে ফ্ল্যাটে ঢুকলাম। কিন্তু থাকা হল না। তোমার ছোটোভাই ক্লেটন দেখা গেল তোমার বিছানায় শুয়ে। সঙ্গে একটা তেরো-চোদ্দো বছরের মেয়ে। দে ওয়্যার মেকিং লাভ!
তোমার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। তুমি তোমার পায়ের হাই হিল জুতোর একপাটি হাতে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে ভাইয়ের উপর। বৃষ্টির মতো ঝরছিল তোমার জুতোর বাড়ি ওর সারা শরীরে। ক্লেটনকে বাঁচাতে গিয়ে আমিও পাঁচ-সাত ঘা জুতোর বাড়ি খেলাম। ওর সঙ্গিনীটি তখন নগ্নতা ঢাকতে বিছানার চাদর গায়ে জড়িয়ে নিয়ে ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। আর তুমি তারস্বরে চেঁচিয়ে যাচ্ছ উন্মাদিনীর মতো, যোলো বছর বয়সে তোমার মেয়ের প্রয়োজন, স্কাউন্ড্রেল! তোমাকে পড়াশুনো শিখিয়ে মানুষ করব বলে আমি পড়াশুনো ছেড়ে হোটেলে হোটেলে গেয়ে বেড়াচ্ছি; অ্যাণ্ড দিস ইজ হোয়াট আই গেট ইন রিটার্ন! এই তার পুরস্কার।
মাত্র কয়েক ঘণ্টায় দু-জনে জগৎ দুটোকে কী সুন্দর চিনে গেলাম। বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে ফিরতে ঠিকই করে ফেললাম তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেব। এক নির্ভার আনন্দ আমায় ঘিরে ধরছিল সেদিন। গভীর রাতে পিয়ানো বাজিয়ে একটা গান ধরলাম জানো। জানো তুমি জানো, কারণ তোমায় এ-কথা আগে বলিনি তা হতে পারে না। নিজের মনের কোন কথাটা সে-সময় বলিনি তোমায় বলতে পারো?
পিয়ানো বাজিয়ে গাইলাম ফ্র্যাঙ্ক সিনাট্রার একটা করুণ, রোমান্টিক গান ‘স্ট্রেঞ্জার্স ইন দ্য নাইট, টু লোনলি পিপল’। করুণ গান, কিন্তু গাইতে গাইতে মন ভালো হচ্ছিল। হাতের কাছে রামের গেলাস রেখেছিলাম। কিন্তু এক সিপও খাওয়ার টান বোধ করলাম না। মাঝরাত্তিরে আমার কাজের মেয়েটা ঘুম থেকে জেগে আমায় ধমকে দিল, সাব, ইতনা রাত তক নেহি সোওগে তো কাল কামপে যাওগে ক্যায়সে!
আমি পিয়ানো ছেড়ে উঠতে উঠতে ওকে গেয়ে শুনিয়ে দিলাম, কে সেরা সেরা, হোয়টএভার উইল বি…
শেষ অব্দি আমাদের বিয়েটা কেন হল না বলো তো প্রিসিলা? একেক সময় মনে হয় আমরা এত বেশি জড়িয়ে পড়েছিলাম যে, বিয়েটাকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। তোমার অবশ্য অন্য কারণ ছিল; তুমি বলতে তোমার বাবা-মা-র চোখে আমি একেবারেই ভালো পাত্র নই। ওঁদের ধারণা ছিল আমায় বিয়ে করলে তোমার বাকি জীবনও হোটেলে হোটেলে কেটে যাবে। মিশনারি স্কুলের রিটায়ার্ড টিচার মিস্টার জোনাথান রোজ একবারও ভাবেননি সংগীত কত বড়ো বিদ্যা। তোমার মুখেই শুনেছিলাম তিনি আমাকে নিয়ে ঠাট্টার সুরে বলতেন, দ্যাট পিয়ানো উইজার্ড অব ইয়োর্স। তোমার ওই পিয়ানো জাদুকর।
