তুমি ঘুমিয়ে পড়ার আগে বলছিলে বম্বে তোমাকে সব কিছু দিয়ে সবই ফের কেড়ে নিয়েছে। চোদ্দো বছর পর তুমি ফিরে এসেছ, প্রিসিলা, একটা বিধ্বস্ত বারবনিতার চেহারা নিয়ে। প্লিজ ডোন্ট মাইণ্ড মাই ল্যাঙ্গোয়েজ, বাট দ্যাট ইজ হাও আই ফিল অ্যাট দিস মোমেন্ট। এই ক্রিসমাস উইকের গভীর রাতে। বম্বে থেকে যেন এক শুষ্ক, বিবর্ণ উপহারই হাওয়া হয়ে বয়ে এল ক্রিসমাসের সপ্তাহে। তবু…তবু প্রিসিলা আমি তোমাকে দু-হাত ভরে নিতে চাই কারণ কলকাতা ছেড়ে চলে গিয়ে অমিত আমাকে একটা শিক্ষা দিয়ে গেছে—যে, শেষবিচারে সংগীতের চেয়েও বড়ো সম্পদ মানুষ। যদিও ওর মৃত্যুর দিনের চিঠিতে কেন শুধু সংগীত আর মৃত্যুর কথা বলল আমি জানি না। …কিন্তু আমি ফের কেন অমিতের প্রসঙ্গে যাচ্ছি? ওর বিষয়ে তুমি তো প্রায় কিছুই জানো না। কিন্তু তোমাকে শুনতে হবে ওর কথা। তার আগে আমি শুধু তোমার কথা বলব।…
কিন্তু কী বলব?
বম্বে থেকে লেখা সেই ভয়ংকর চিঠিটার পর তুমি আরও কুড়িটা চিঠি লিখেছিলে, যার কোনোটাই আমি খুলে পড়িনি। কী লিখতে সেসব চিঠিতে তুমি? ভালোবাসার কথা? অনুরাগের কথা? বম্বের সিনসিনারি? ওখানকার বন্ধুবান্ধব, প্রেমিকদের কথা? একবার কাগজ পড়েছিলাম তোমাদের একটা দল লণ্ডনে গিয়ে কনসার্ট করেছে। ওখানকার কাগজে লিখেছে তোমার কণ্ঠ নাকি ডিভাইন, ঐশী। প্রিন্সেসের ব্যাণ্ডের বন্ধুরা তা নিয়ে একটু টীকাটিপ্পনীও কেটেছিল আমার বুকে জ্বালা ধরানোর জন্য। কেউ বললে তোমার গলা কনি ফ্রান্সিসের মতো, কেউ বললে ন্যান্সি সিনাট্রার মতো, আবার কেউ বললে তোমার পাশে কলকাতার রেস্টোরান্ট গায়িকাদের কোকিলের পাশে কাক মনে হয়। আমি নীরবে হেসে পিয়ানো বাজিয়ে গেছি, আমার বুকে তখন কোনো আঁচড়ই কাটে না এই সব কথা। একটাই টান তখন আমার—কখন বাড়ি ফিরে অমিতের শেখানো স্টাফ নোটেশন লেসনগুলো নিয়ে বসব। তখন যে আমি আবিষ্কার করেছি ছাপার হরফে নিদ্রিতত সুরকে জাগিয়ে তোলার খেলা।
তোমার চিঠিগুলো কিন্তু আমি ফেলেও দিইনি প্রিসিলা। কেবল সেই প্রথম ভয়ংকর চিঠিটা ছাড়া; কিন্তু সেটা তো আমার পড়াই হয়ে গিয়েছিল। বাকি সব চিঠি পরিপাটি করে সাজানো ছিল দেরাজে। একদিন সেখান থেকেই একটা চিঠি বার করে পড়েছিল অমিত, আমি ট্রিনকাস থেকে ফিরতে জিজ্ঞেস করল, প্রিসিলা কে?
আমি কোনোমতে রাগ সংরবণ করে যথাসম্ভব শান্ত গলায় বললাম, তুমি আমার চিঠি পড়েছ?
ও প্রথমে খুব থতমতো খেয়ে গেল, তারপর বেশ বিব্রত স্বরে বলল, লোবো মাস্টার, সংগীত কি শুধু শরীর, যন্ত্র আর বই দিয়ে হয়?
আমি ব্যঙ্গের সুরে বলেছিলাম, তার জন্য অন্যের চিঠি পড়তে হয় বুঝি? ও তখন বলল, আমি লোবো মাস্টারের মনের হদিশ করছিলাম।
আবার দেখতে পাচ্ছ প্রিসিলা, অমিত কীভাবে মিশে যাচ্ছে আমার সব কথাবার্তা, কল্পনা, ভাবনায়? আমি তোমার কথা বলব ভাবছি, আর ও চলে আসছে। ও-ই আমাকে শুনিয়েছিল মোজার্টের মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা, বেটোফেনের বধির হয়ে যাওয়ার কথা, সুমানের উন্মাদ অবস্থায় রাইন নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার কথা, তারপর নদী থেকে উদ্ধার পেয়ে জীবনের শেষ আড়াইটা বছর পাগলা গারদে কাটানোর কথা। আমি যখন স্নমানের জীবনের ট্র্যাজেডির কথা ভেবে মুষড়ে আছি, ও বললে, এখনই সময় ওঁর পিয়ানো কনচের্ত নিয়ে বসার। বলে খুলে বসল ১৮৪৭-এ গড়া মানের ডি মাইনরের পিয়ানো ট্রায়ো।
আমি তখন প্রশ্ন তুলতাম, একটা পিয়ানোয় কী করে ট্রায়ো হবে? ট্রায়োতে তো তিনটে পিয়ানো চাই।
অমিত বলত, সেজন্য তো আমার রেকর্ডই আছে। আমি শুধু দেখতে চাই লোবো মাস্টারের হাতে এসব জিনিস কী দাঁড়ায়।
তুমি ভাবতে পারছ প্রিসিলা, কী এক ভীষণ নির্জন খেলায় আমরা গোপনে মেতেছিলাম দু-জন? আমি ক্ল্যাসিকাল পিস শিখছি কোনো আসরে বাজাব বলে নয়, শুধু আমি আর
অমিত নির্জন কিছু সুর আবিষ্কার করব বলে। ও যেমন একদিন বলল, তুমি পিয়ানোয় আইনা ক্লাইনা’-র সুর তোল কেন? ওটা তো পিয়ানো পিস নয়।
আমি বললাম, মা আমায় ওভাবেই শুনিয়েছে বলে।
অমিত উল্লাসে ফেটে পড়ে বলল, দ্যাটস দ্য পয়েন্ট! মার পিয়ানোর তুলে দেওয়া সুরটাই তোমার কাছে ‘আইনা ক্লাইনা’, ইউ প্লে ইট অ্যাজ ইফ ইট ওয়জ মেজ ফর দ্য পিয়ানো। ‘আইনা ক্লাইনা’ বাস্তবিকই তোমার জীবনে রাত্রিসংগীত, কারণ তোমার মা তোমাকে বিছানায় শুইয়ে ওই সেরিনাড বা প্রেমগীতিটি বাজাতেন। ওই নিপুণ, নিখুঁত প্রেমের সুরটা তাই তোমার কাছে লালাবায় বা ঘুমপাড়ানি গানও। নয় কি?
আমি অগত্যা বলতে বাধ্য হলাম, হ্যাঁ।
অমিত তখন বলল, আমি তোমার চিঠি পড়ছিলাম তোমার মনের প্রেমের সুরটা জানার জন্য। এনি প্রবলেম?
আমি বলেছিলাম, তার জন্য চিঠি পড়ার দরকার নেই। আমি তোমায় শুনিয়ে দিচ্ছি… বলে ধরে ফেলেছিলাম ডরিস ডে-র গানটা।—কে সেরা সেরা, হোয়াটএভার উইল বি উইল বি, দ্য ফিউচার নট আ ওয়ার্স টু সি হোয়াট উইল বি, উইল বি।
জানো প্রিসিলা, এই গানটা আমি তোমার চেয়ে ভালো কাউকে গাইতে শুনিনি। আমার মনে পড়ে প্রিন্সেসের সেই সন্ধ্যেটা যেদিন প্রথম তুমি গাইলে গানটা। আমার মনে হল তুমি অন্য কারও গান গাইছ না। তোমার নিজের জীবনের কথা শোনাচ্ছ। ক্ষণিকের জন্য মনেও হয়েছিল বুঝি-বা তোমার চোখের কোণে একবিন্দু জল দেখলাম। ব্যাণ্ডের শিফট শেষ হতে তোমাকে গিয়ে যখন গানটার প্রশংসা করলাম তুমি আমায় কী বলেছিলে, মনে আছে? বলেছিলে দিনটা তোমার জীবনের এক অন্ধকার দিন। কেননা তার আগের রাতে তোমার ছেলেবেলার বয়ফ্রেণ্ড, তোমার ন-বছরের স্টেডি লাভার ক্লাইভ তোমায় ছেড়ে চলে গেছে। ও শুধু জানাতে এসেছিল যে ইভন বলে একটা অন্য মেয়ের সঙ্গে ও জীবন গড়তে চায়। তুমি ওকে ওর দেওয়া পান্নার আংটিটা ফেরত দিয়ে বলেছিলে, গুড লাক! তারপর মাঝরাতে ব্লেড দিয়ে নিজের হাত কেটে ফালা ফালা করেছিলে।
