ক্রিসমাস উইকের এক রাত, হিমেল হাওয়ার রাত, বাইরে মধ্যরাত্রি নীল আকাশ, দূরে কিছু কিছু বাড়ির জানলায় আলো জ্বলছে জোনাকির মতো, বাড়ির সামনের বটগাছটা অন্ধকারে ভূতের মতো ডালপালা ছড়িয়ে রাস্তা পাহারা দিচ্ছে, আশপাশের বাড়ি থেকে ক্রিসমাস ক্যারলজ ভেসে আসছে, ভেসে আসছে রাস্তার রোয়াক থেকে বাঙালি খ্রিস্টান ছোকরাদের মাতাল গান, আর দরজার ফ্রেমে ছবির মতো ধরা এক নারীমূর্তি।
২.
প্রিসিলা!
জানো প্রিসিলা, এই যে তুমি অচেতন হয়ে ঘুমিয়ে আছ আমার ছোট্ট খাটে, এভাবে আগে তুমি কখনো ঘুমোওনি আমার বিছানায়। সত্যি বলতে কি, তুমি আগে কখনো শোওইনি আমার বিছানায়। শুধু একবার ছাড়া। সেই শোওয়াটা কী যথার্থ শোওয়া? …না। ও কথা আমি এখন ভাবতেও চাই না। পরে যদি মনে পড়ে তোমাকে মনে করার…
হ্যাঁ, প্রিসিলা, তুমি সেই প্রিসিলাই আছ। তোমাকে অন্য কেউ বলে ভুল করতে পারব না।
না প্রিসিলা, তুমি কিন্তু সেই প্রিসিলা নেই। তোমাকে সেই প্রিসিলা বলে ভুল করতেও পারছি না।
কী অদ্ভুত সমস্যা বলো দিকিনি। একই সঙ্গেই তুমি প্রিসিলা প্রিসিলা নও। একই সঙ্গেই তুমি আছ এবং তুমি নেই। তুমি ক্লান্ত দেহে গভীর ঘুমে মগ্ন আছ, আর আমি তোমায় অক্লান্তভাবে দেখছি। এত কাছে তুমি, তবু তোমাকে আমি স্পর্শ করছি না। তোমার ওই পরিচিত লাল ঠোঁটে চুমে রাখছি না। কারণ আমি এই মুহূর্তে ভাবছি তুমি প্রিসিলা, তার পরমুহূর্তে ভাবছি তুমি সে নও। শুধু যখন তুমি অনুরোধ করলে তোমাকে একটা ঘুমপাড়ানি সুর-লালাবায়—শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিই তখনই তীব্রভাবে মনে হয়েছিল তুমি আমার সেই পুরাতন প্রেম। ইচ্ছে করছিল তোমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে, কপালে চুমো দিয়ে আমার এই বিছানায় শুইয়ে দিই। তাঁকে বৃদ্ধাশ্রমে ছেড়ে আসার আগে যেমনটি দিতাম মাকে।
কিন্তু এসব যখন ভাবছি তখন কী দেখলাম? দেখলাম তুমি আমার অফার করা রাম দিয়ে পটপট দুটো ঘুমের ওষুধ গিলে ফেললে। আর অমনি তুমি প্রিসিলা থেকে সম্পূর্ণ অচেনা কেউ একটা হয়ে গেল। যে-কেউ ঘুমের বড়ি খাচ্ছে এ আমি স্বপ্নেও আনতে পারি না। আমি ভেবে উঠতেই পারছি না তোমার এত ঘুমের দরকার হল কেন? তুমি কত দিন, কত মাস, কত বছর ঘুমোওনি প্রিসিলা? এই আমি তোমার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে তোমাকে দেখছি, যেন তুমি গানের স্বরলিপি। কত সুর তোমার মধ্যে আহা! আবার কত কত সুর মরেও গেছে, ইস।
তুমি ঘুমোও প্রিসিলা, আর আমি তোমায় দেখি। কিন্তু আমি নিশ্চিত নই তোমাকে চিনে উঠতে পারব কি না। নাকি মানুষ ঘুমিয়ে পড়লে অন্য মানুষ হয়ে যায়!
আমি এখনও ভুলতে পারি না বিদায় দিনে দেখা সেই তোমাকে। একটা আকাশি নীল ফ্রক ছিল তোমার পরনে। হালকা করে কাঁধের এক পাশে ফেলা ছিল একটা গাঢ় নীল স্কার্ফ; আর তোমার পায়ে ছিল সাদা হাইহিল জুতো। সেদিনই প্রথম তোমাকে লাল বা উজ্জ্বল গোলাপির বদলে ফ্রস্টেড পিঙ্ক লিপস্টিক ব্যবহার করতে দেখেছিলাম। যখন আমার পিয়ানোর গায়ে হেলান দিলে তুমি আমায় চুমু দিয়ে, আমি অবাক চোখে তোমার ঠোঁটের ওই হিমশীতল রংটাই দেখছিলাম। তখন ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারিনি তোমার ঠোঁটের ওই হিমশৈত্য একদিন আমাদের সম্পর্কেও ঢুকে পড়বে। পরে আমার ফ্ল্যাটের দ্বিতীয় বাঁকটায় দাঁড়িয়ে তুমি যখন হাত নাড়ছিলে ক্রমাগত আমি তোমাকে সব চেয়ে বেশি চাইছিলাম, ভালোবাসছিলাম ভেতরে ভেতরে। শুধু একটা ক্যামেরার অভাবে দৃশ্যটা ধরে রাখতে পারিনি সেদিন।
আর আজ তুমি আমার সামনে, এইখানে, এত কাছে শুয়ে, অথচ আমার ভিতরটা কীরকম ফাঁকা ফাঁকা। এ তোমার কী কালঘুম প্রিসিলা, যে তোমাকে ডেকে তুলতেও সাহস হবে না আমার? এই মদ আর ঘুমের বড়ি মেশানো ঘুমকে বড্ড ভয় পাই জানো, প্রিসিলা? অমিত যখন ওর শেষ চিঠি লিখছিল আমাকে, ও হুইস্কির সঙ্গে ঘুমের বড়ি মেশাচ্ছিল। ও হো, তুমি তো অমিতকে চেনোই না, ও আমার জীবনে এসেছিল তুমি চলে যাওয়ার পর। জানি তুমি কষ্ট পাবে তবু আজ আমি সত্যি কথাটাই বলব—অমিতকে পেয়ে আমি তোমাকে ভুলেই গিয়েছিলাম।
না, না, না। তুমি যা ভাবছ, তা না। অমিত ওয়জনট গে। আমাদের কোনো সমকামিতা ছিল না। তবু আমরা একে অন্যের উপর নির্ভর করতাম স্বামী-স্ত্রীর মতো। অমিতের ডান হাতটা পোলিয়োয় নষ্ট ছিল, তাই আমার দুটো হাত ছিল ওর হাত। আর আমার সাদামাটা মগজের মধ্যে ও একটু একটু করে সংগীতের রহস্য ঢোকাচ্ছিল। পরে আমি যখন ওর রেকর্ড শুনে, ওর সাহায্যে নোটেশন পড়ে ক্লোদ দেবুসির রচনা ক্ল্যারিনেট ও পিয়ানোর জন্য ‘র্যাপসোডি’-র পিয়ানো-অংশ বাজিয়েছি ও আনন্দে এতই দিশেহারা হয়ে গেছে যেন ও নিজের হাতে বাজনাটা বাজাল। দেখতে দেখতে একটা সময়ও এসেছিল যখন আমি কী বাজাচ্ছি ততটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমাকে দিয়ে কী বাজিয়ে নিতে চায়। আমি একদিন অভিমান করে বলেওছিলাম ওকে, তুমি আমার আঙুলগুলোকে ম্যাজিক ফিঙ্গার্স বলল ঠিকই, কিন্তু এরা আসলে তোমার মগজের দাস। দ্য প্লে দ্য টিউনজ ইউ ওয়ান্ট দেম টু প্লে।
কিন্তু এই দাসত্বই আমি চেয়েছিলাম, প্রিসিলা। হাত-পা-চোখ-নাক-কান সবই তো মগজের দাস, নয় কি? অমিত ছিল আমার মগজ, এবং আস্তে আস্তে হয়ে উঠছিল আমার মন ও হৃদয়। আর এইখানেই যত গোল বাঁধল শেষে। কিন্তু সেকথা থাক। সে অনেক পরের কথা। তোমাকে দেখতে দেখতে ফের একটু তোমার কথাই বলি বরং…
