অথচ, হায় কপাল, সেই দৃশ্যটারই কোনো স্মৃতি নেই লাোবোর। কারণ মদে ভারাক্রান্ত ছেলেটিকে সে দেখলই না। কথায় বলে দেবদূতেরা খুব নম্র চরণে যাতায়াত করে। তাদের যাওয়া আর আসা সবই খুব নীরব।
ন-মাস আগে অমিতের চলে যাওয়াটাও চিঠির পাতা ওড়ার মতোই খুব নিঃশব্দে ঘটল। বসন্তের সোনালি সকালে একটা হালকা ইনল্যাণ্ড খামে করে এসেছিল খবরটা, অমিতের নিজের হাতে লেখা :
মাস্টার, এই চিঠি শুধু তোমাকেই লেখা যায়। কারণ তুমি সব দুঃখকেই সুরে ব্যক্ত করতে চাও, যা আমারও খুব মনঃপুত। এই যে আমি রেকর্ডে মোজাটের মৃত্যুগীত ‘রিকুইয়ম’ শুনছি আর চিঠি লিখছি শেষবারের মতো এর আনন্দ পৃথিবীর আর কাউকে বোঝাতে পারব না। বিশেষ করে এই দিল্লি শহরের অপোগন্ডদের, যারা ভাবতেই পারে না মানুষ কত বড়ো আনন্দের সঙ্গে দুঃখ জয় করতে পারে। এই শহরে দিদির সুইসাইডের পর থেকেই ভাবছিলাম একটা কথা : দুঃখ জয় কাকে বলে? দুঃখকে অন্য দশ ভাবনার চাপে দূর করা, না এত বেশি আনন্দ উপলব্ধি করা যায় তোড়ে দুঃখের আর লেশমাত্র থাকে না চিত্তে।
আমি দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিলাম। বিরাট আনন্দের সন্ধানে দুটি জিনিসের মধ্যে এসে পড়েছি আমি—সংগীত আর মৃত্যু। আমি দু-টিকেই গ্রহণ করেছি। ভাবতে পারো, এই চিঠি ডাকে ফেলে এসে যখন হুইস্কি আর ঘুমের বড়িগোলা জল পান করব তখন আমার কানের কাছে রেকর্ডে বেজে চলবে মোজার্টের রিকুইয়ম’? পৃথিবীর আর কেউ বুঝুক, না বুঝুক তুমি নিশ্চয়ই জানবে কী সুখে আমি চলে গেলাম। আশা করব আমাদের বন্ধুত্বের স্মরণে একটু ছোট্ট রাত্রিসংগীত বাজিয়ে নেবে।
চিঠিটা পড়া হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মুড়ে ভাঁজ করে রাখা হয়নি। চিঠিটা হাওয়ায় উড়ে মাটিতে পড়ল, লোবোর আঙুলের গাঁটগুলোয় তখন অসহ্য যন্ত্রণা। বাতের অ্যাটাকের মতো। ও অনেকক্ষণ আঙুল মটকাল, পরে গরম জলে হাত ডুবিয়ে বসল। সেদিন আর হোটেলে বাজাতে যাওয়া হল না। রাতে পিয়ানোয় বসে মনে হল কবজি থেকে আঙুল অবধি হাতের কোনো সাড় নেই। চোখ দুটো ক্রমশ ভিজে আসছে, স্কোরশিট পড়া দুষ্কর। একটু একটু করে ভয় জাগল—এরপর স্টাফ নোটেশন পড়া ভুলে যাব না তো?
লোবো পিয়ানো থেকে উঠে বাইরে সিঁড়িতে বসে তার দিকে চেয়ে রইল। মনে পড়ল বাবার মৃত্যু, প্রিসিলার চলে যাওয়া, ইস্কুলের মাস্টারের মতো অমিতের ওকে স্কোর পড়া শেখানো। মনে পড়ল বৃদ্ধাশ্রমে মৃত্যুশয্যায় মার কথা—সনি, আসল বাজনা বাজাতে শেখো।
ওই সিঁড়িতে শোয়া অবস্থায়—লোবোর মনে পড়ে না সিঁড়ির তৃতীয় বাঁকে না শেষ ধাপিতে—ওর হার্ট অ্যাটাকটা হয়। পরে হাসপাতালে ডাক্তারের মুখে শুনেছিল সকালে হাতের যন্ত্রণাটা অ্যাটাকের পূর্বাভাস ছিল হয়তো।
কিন্তু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেও সনি লোবো যে হোটেলে ব্যাণ্ডে ফিরল না এটাতেই সবাই খুব অবাক হয়ে গেল। লোকটার হাতটাও কি গেল তা হলে? নাকি মগজটা ধসল? মদ আর গাঁজার কম্বিনেশন তো অনেক দিনের। কেউ কিন্তু একবারটি ভাবল না মানুষটার হৃদয় নিয়ে। নাকি অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ানের হৃদয় হয় না?
সনি লোবো কি-বোর্ডে হাত বুলোতে বুলোতে নিজের আঙুলগুলোকেও দেখছিল। কতকাল ঘুমিয়ে আছে ওরা, যেন সাপের ঘুম। তবে সাপ নয় বলেই হয়তো শীতে জাগল, ভর শীতে, একেবারে ক্রিসমাস উইকে। লোবো একটু হালকা সুর ধরল, তারপর ‘ডক্টর জিভাগো’ ছবির টাইটেল মিউজিক, তারপর ‘ব্লু ড্যানিউব। পাশের বাড়ির রেচেলদের ফ্ল্যাট থেকে ভেসে আসছে ক্রিসমাস ক্যারেলজ। লোববার বাসনা হল অমিতের উপহার দেওয়া শ্যমানের পিয়ানো ‘ফান্টাজিয়া’-র স্টাফ নোটেশন দেখে পিসটা একবার বাজায়। তাই ‘ব্লু। ড্যানিউব’ শেষ করেও স্বরলিপির বইটা খুঁজতে উঠল, আর তখনই দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ পেল।
বলতে নেই বেশ ভালো রকম বিরক্তই হল লোবো। সন্ধ্যেকালে আবার কী উৎপাত! ট্রিনকাসের সেই ছোকরাগুলোই আবার ফিরে এল না তো। নাকি পাড়ার ছোকরাদের চাঁদার আক্রমণ? ইদানীং হিন্দুদের পুজোর মতো খ্রিস্টানদের ক্রিসমাসে, নিউ ইয়ার্স ডে ইত্যাদিতে চাঁদা তোলা চালু হয়েছে। কিংবা, কে জানে, ডিকিই এল হয়তো বগলে রামের বোতল নিয়ে। সে-ক্ষেত্রে ওকেও আজ ফিরিয়ে দিতেই হবে; ন-মাস পর আজ ওর আঙুলগুলো পিয়ানোর রিডের স্পর্শ চাইছে। এত পিপাসা যে জমতে পারে আঙুলের ডগায় তা ওর ধারণাতেও ছিল না। কি-বোর্ড আঙুলগুলো শুধু নেচে বেড়াচ্ছে না, ওরা রিড থেকে যেন সুর পান করছে। সুরগুলো যেন সুরা হয়েছে আজ আঙুলের ঠোঁটের ডগায়।
‘আঙুলের ঠোঁটের ডগা!’ কথাটা মনে হতেই একটা সরু হাসি ফুটল লোহোর মুখে। অদ্ভুত অদ্ভুত পরিস্থিতিতে মানুষের কল্পনায় কত কীই যে ঘটে! লোবো মুখের সেই হাসির ঝিলিক নিয়েই ফ্ল্যাটের দরজাটা আস্তে করে খুলল।
খোলার সঙ্গে সঙ্গে একরাশ হিমেল হাওয়ায় ঘর ভরে গেল। হালকা একটা সোয়েটার গায়ে লোবোর, তাতে ওই ঠাণ্ডা রোখা মুশকিল। ও দরজা খুলেই ঠাণ্ডার প্রতিক্রিয়ায় এক পা পিছিয়ে এল। কিন্তু ততক্ষণে ওর চোখ পড়ছে দরজার বাইরে দাঁড়ানো আগন্তুকের উপর। আর তৎক্ষণাৎ গায়ের শীতভাবটা যেন বুকের ভিতরে ঢুকে এল। ফুসফুঁসে নয়, সরাসরি হৃদয়ে শীত বসা যেন। লোবো কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল, ও হেসে কিছু বলবে, না শীতে আরও কুঁকড়ে যাবে বুঝতে পারল না। বস্তুত, ও হাসলও না, কুঁকড়ে মূক হয়েও গেল না। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে দাঁড়িয়েই বিস্ফারিত নেত্রে আগন্তুককে দেখতে দেখতে শুধু বলল, তুমি!!!
