অমিত ওর লাজুক মুখ তুলে আস্তে আস্তে বলল, আমিও, লোবো মাস্টার, তোমার কাছে শুনতেই এসেছি।
একটা বিকট আর্তনাদ করে উঠেছিল লোবো, অ্যাঁ! তাতে রীতিমতো চমকে গিয়েছিল অমিত।
লোবোর আর্তনাদের দুটো কারণ ছিল। এক, এই ছোকরাও সেই অন্যদের মতোই হল শেষে! এরও উদ্দেশ্য কিছু প্রশংসা উগরে ফোকতায় পিয়ানো শুনে নেওয়া। আর দুই, এই প্রথম কেউ ওকে সম্মান করে মিস্টার লোবো না বলে লোবো মাস্টার বলল। বুকটা যেন কীরকম জুড়িয়ে এল ডাকটায়। যেমন আহ্লাদ হয় ভালো বাজনার পর কেউ যখন ওকে স্টাইল করে মায়েস্ত্রো’ বলে। কিন্তু তার চেয়েও যেন এই লোবো মাস্টার ডাকটায়…।
লোবোর চিন্তা কেটে গেল অমিতের কথায়, আমি কিন্তু রেস্তরাঁর ওইসব বাজনাই এখানে শুনতে আসিনি। ও তো হোটেল রেস্তরাঁয় গেলেই শোনা যায়।
লোবো অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, তা হলে কী শুনবে?
অমিত বলল, এইসব। বলে রেকর্ডগুলো এগিয়ে দিতে দিতে বলল, দিজ আর অল গ্রেট পিয়ানো পিসেজ। আমি তোমার হাতে শুনতে চাই।
আমার হাতে! দ্বিতীয়বারের মতো আর্তনাদ করে উঠল লোবো।
মুখে একটা সরু মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে অমিত বলল, ইয়েস, মাস্টার লোবো।
এবার বেপরোয়া হয়ে পড়েছে লোবো—তুমি কী করে ভাবছ আমি ও সব বাজাতে পারব? আমি জীবনে ক্ল্যাসিকাল বাজিয়েছি?
আর তখনই, ঠিক তখনই, অমিত ওই কথাটা বলেছিল যা আজও লোবোকে তাড়া করে ফেরে। বলেছিল, দ্য ক্ল্যাসিক ইজ ইন দ্য মাইণ্ড। সব ক্ল্যাসিকই মগজে ভর করে থাকে। তাকে ধরার জন্য চাই কণ্ঠ, মুখ বা আঙুল। সেরা পিয়ানোর জন্য চাই সেরা আঙুল, অ্যাণ্ড ইউ হ্যাভ ম্যাজিক ফিঙ্গার্স, মাস্টার।
—কিন্তু আমার মাথায় যে কিছু নেই অমিত! ফের আর্তনাদ করে উঠল লোবো।
অমিত বলল, সেজন্যই তো এইগুলো তোমায় শোনাব।
লোবো এবার রীতিমতো বিরক্ত—শুনে শুনে ও সব বাজানো যায়? ওগুলো কি ‘কে সেরা কেরা’ না ‘হামটি ডামটি’?
ক্ল্যাসিকাল পিস-এর কয়েকটা স্টাফ নোটেশন বই সামনে মেলে ধরে অমিত বলল, এর থেকে।
—আমি নোটেশন পড়তে জানি না।
–আমি তোমায় শিখিয়ে দেব।
–তুমি!
প্রায় আকাশ থেকে ছিটকে মাটিতে পড়েছিল লোবো। তোতলাতে তোতলাতে শুধোল, তু…তু…মি স্টা…স্টাফ নোটেশন পড়তে জানো?
অতি করুণভাবে মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ জীবনে শেখার মধ্যে ওইটাই শিখেছি, কলেজের পড়াশুনো আমার ভালো লাগে না।
-তা গাইতে, বাজাতে শেখোনি?
–না, আমার সব গান, সব বাজনা মাথার মধ্যে।
এই বলতে বলতে অমিত ওর পোলিয়োবিধ্বস্ত সরু ডানহাতটা বাড়িয়ে দিল সামনে। এতক্ষণ রেকর্ড দেখানো, বই মেলেধরা সব কাজই ছেলেটা বাঁ-হাতে সেরেছে, সেগুলো বয়েও এনেছিল ও বাঁ-হাতে, বাঁ-বগলে চেপে। ডান হাতটার দিকে লোববার নজরই যায়নি।
লোবো উঠে দাঁড়িয়ে বলল, অমিত, আমার বাড়িতে এই তোমার প্রথম আসা, কিন্তু শেষ আসা নয়। তোমার এই আসার সম্মানে আমি একটা ছোট্ট বাজনা বাজাতে চাই। তুমি ফরমানা করো।
অমিত বলল, ব্লু ড্যানিউব।
—রু ড্যানিউব? দ্যাটস মাই ফেভারিট ওয়ালজ!
—হয়তো পৃথিবীর সেরা ওয়ালজ পিসও, মাস্টার।
—কী করে জানলে আমি ওটা বাজাতে পারব?
—কারণ দু-মাস আগে এক সন্ধ্যায় ট্রিনকাসে তুমি এটা বাজিয়েছিলে। আমি দিদির সঙ্গে বসে সেই বাজনা শুনে বলেছিলাম, এর হাতে তো জাদু খেলে। হি ইজ টু প্ৰেশাস ফর হোটেলজ অ্যাণ্ড রেস্টোরান্টস। এর উচিত মোজার্ট, বেটোফেন বাজানো। তো দিদি বলল…
উৎকণ্ঠার সঙ্গে ললাবো বলে উঠল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, তো দিদি কী বলল?
অমিত বলল, ও বলল ওরা অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান। হালকা-পলকা জিনিসেই জীবন কাটিয়ে দেয়। ক্ল্যাসিকালচৰ্চার টেম্পারামেন্টই ওদের থাকে না।
মুখটা হঠাৎ ভার হয়ে গেল লোবোর। পিয়ানোর ঢাকনাটা তুলে কি-বোর্ডের উপর আলতো করে একটু আঙুল বুলিয়ে বলল, খুব ভুল বলেনি তোমার দিদি। তাঁর মৃত্যুর আগে মা-ও এই কথাটাই বলত দেখা হলে। বলত, বাজনা অনেক বাজিয়েছিস সনি, এবার আসল বাজনাটা ধর। আসল বাজনা বলতে মা বুঝতেন মোৎজার্ট, যার একটা পিস বাজিয়ে আমাকে ঘুম পাড়াত মা। এই পিয়ানোয়। মার নিজস্ব পিয়ানোয়। বলত, এ হল ছোট্ট একটু নৈশসংগীত।
অমিত বলল, আইনা ক্লাইনা নাখটমজিক। আ লিটল নাইটমিউজিক।
লোবো অবাক হয়ে বলল, তুমি জানো?
-কেন, তুমি জানো না?
খুব ক্লান্তভাবে মাথা নেড়ে লোবো বলল, মার বাজনার যেটুকু স্মৃতি, শুধু ওইটুকুই। খুব মনে হত একসময় রেকর্ড কিনে পুরোটা তুলে নিই, কিন্তু ভয় হয়েছে। ওতে ছেলেবেলার স্মৃতিটুকু আলগা হয়ে যাবে।
অমিত প্রতিবাদ করল, তা কেন, লোবো মাস্টার? মার স্মৃতিতে একটা প্রার্থনার মতোও তো হতে পারত বাজনাটা।
জড়তা ভেঙে কোনো মতে লোবো বলল, তুমি বলছ?
তারপর পিছন ফিরে অমিতের দিকে না তাকিয়ে আপনমনে লোবো ধরে বসল ‘ব্লু ড্যানিউব’-এর সুর নয়, আনন্দ-ফুর্তির নীল স্বর্ণিল-স্বপ্নিল সুর ‘আইনা ক্লাইনা নাখটজিক।
স্বল্পক্ষণের বাজনাটা শুনে অমিত বলল, এই অসাধারণ বাজনাটা কিন্তু পিয়ানোর বাজনা নয়। ইটস অ্যা আনফরগেটেবল অর্কেস্ট্রাল পিস প্লেড অনবদ্য ভায়োলিন। তুমি পিয়ানোয় যেটা বাজাও তা হল পিসটার মূল সুর। বলতে হয়, জাস্ট দ্য থিম টিউন। বাট দেন ইট ওয়জ মার্ভেলাস। সুরটা শুনলেই মন ভালো হয়ে যায়।
আজ সকালে ট্রিনকাসের ছেলেগুলো যখন সিঁড়ির তৃতীয় বাঁকে দাঁড়িয়ে অত কথা বলছিল হয়তো লোবোর মধ্যে একটু করে শত বছর আগের সেই রাতটা ফুটে উঠছিল যেদিন অমিত ওর পিছু নিয়ে ঠিকই বাঁক অবধি উঠে এসেছিল।
