না, ফিরে এসে বিয়েটা হয়নি লোবোর সঙ্গে, কারণ প্রিসিলা ফিরেই আসেনি। পরিবর্তে একটা চিঠি এসেছিল :
প্রিয়তম সনি, এই চিঠি পড়ে তোমার বুক ভেঙে যাবে জানি। তবু লিখছি, কারণ তোমাকে আমি এখনও সেভাবেই চাই যেভাবে বিদায়ের দিনে চেয়েছিলাম। আমি জানি কলকাতা ছেড়ে আসা তোমার পক্ষে নিঃশ্বাস নেওয়া ছেড়ে দেওয়ার মতন। তবু বলছি, প্লিজ বম্বে এস, শুধু আমার জন্য। আমাদের ভালবাসার জন্য। এখন আর কী আছে কলকাতায় তোমার? তোমার মা তো দিব্যি মানিয়ে নিয়েছেন বৃদ্ধাবাসে। মাঝেমধ্যে আমরা নিশ্চয়ই কলকাতা ফিরব, ওঁকে দেখব, সব বন্ধুদের সঙ্গে গিয়ে মিশব, একটু-আধটু গান-বাজনা করব ট্রিনকাস, মুল্যাঁ রুজ, প্রিন্সেসে…কী বলো? কলকাতা চিরকাল আমাদের কলকাতাই থাকবে। কিন্তু এখন, ফর নাও প্লিজ চলে এসো বম্বে। যা-কিছু ঘটার সব এখানেই ঘটছে, আমাদের গান-বাজনার জন্য টাকা উড়ছে হাওয়ায়, এখান থেকে এঙ্গেলবার্ট হাম্পারডিঙ্ক নামে একটা ছেলে লণ্ডনে গিয়ে কী নামটাই না কামিয়েছে! আর আমি শুধু ভাবি তোমার কথা, ঈশ্বর কী জাদুভরা আঙুলই না তোমায় দিয়েছেন! বম্বের সমস্ত নামকরা পিয়ানিস্টকেই তুমি ফিঙ্গারিঙ্গের লেসন দিতে পারো। ইউ ক্যান রিয়েলি বি দ্য বেস্ট পিয়ানিস্ট অব ইণ্ডিয়া। তা হলে কেন পড়ে আছ কলকাতায়? আর এই সবও যদি কিছু না হয় তোমার কাছে, অ্যাটলিস্ট তোমার প্রিসিলা তো আছে। কাম ফর মি, ডার্লিং, ডিয়ারেস্ট, জাস্ট কাম, আই অ্যাম ওয়েটিং।
সেদিনও ঠিক এইখানে বসে চিঠিটা পড়েছিল লোবো। শেষে রাগে, দুঃখে, অবরুদ্ধ কান্নায় সেটাকে দুমড়ে-মুচড়ে, দলা পাকিয়ে টেনিস বলের মতো ছুড়ে দিয়েছিল অদূরে বাঙালি খ্রিস্টানদের বস্তির চালে।
সেই থেকে লোবো এইখানে বসে চোখ রাখে সিঁড়ির তৃতীয় বাঁকটার উপর। ওর জীবনে এর পরের কোনো বড়ো ঘটনা ঘটলে হয়তো ওইখানেই ঘটবে। হয় ওখান থেকেই কেউ গড়িয়ে পড়বে নীচে, নয়তো উঠে আসবে উপরে। বস্তুত, ওইখানে দাঁড়িয়েই ট্রিনকাসের ছেলেগুলো আজ মিনতি করছিল, সনি, প্লিজ ফিরে এসো।
সিঁড়ির তৃতীয় বাঁকে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিল ওরা, কিন্তু লোবোর একেবারেই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি ব্যাপারটাকে। ও সিগারেট খেতে খেতে ওদের কথা সব শুনল, তারপর পুরো প্রসঙ্গটাকে বদলে দিয়ে খুব ক্যাজুয়ালি জিজ্ঞেস করল, মোরিন কেমন আছে? কেমন গাইছে?
ছেলেদের মধ্যে একজন উত্তর দিল, ফাটাফাটি গাইছে এখন মোরিন। যা কে সেরা সেরা করে! ইস তুমি যদি সঙ্গে থাকতে পিয়ানোয়!
লোবো তখন জিজ্ঞেস করল, বুড়ো সিলভিওর পায়ের বাত কীরকম? টিবেটান ওষুধে কিছু কাজ হল?
ছেলেরা তখনই বুঝে গিয়েছিল একে ফেরানো দায়। ওরা ওর জন্য আনা দুটো ‘লাকি স্ট্রাইক’-এর প্যাকেট ওর হাতে জমা দিয়ে চলে গেল। লোবো ফের মন দিয়ে দেখতে লাগল সিঁড়ির তৃতীয় বাঁকটাকে…আর ওরকম অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎই মনটা কীরকম কান্নায় ভরে গেল। ওর মনে পড়ল ওই তৃতীয় বাঁকটায় দাঁড়িয়ে সেই ছোট্টখাট্টো বাঙালি কলেজ যুবার আড়ষ্ট নিবেদন, মিস্টার লোবো, ক্যান আই কাম আপ অ্যাণ্ড টেক টেন মিনিটস অব ইয়োর প্ৰেশাস টাইম?
লোবো সেদিন প্রভূত মদ্যপান করেছিল, ভালো করে দেখেওনি ছেলেটার দিকে। তার উপর সন্ধ্যেকাল, পিছন ঘুরে ছেলেটার সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে কথা বলারও সৌজন্য দেখায়নি লোবো। চাবি ঘুরিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খুলতে খুলতে বলেছিল, দশ মিনিট? এমন ভর সন্ধ্যেবেলায় দশটা মিনিট কি চাট্টিখানি ব্যাপার? না বাপু, তুমি পরে একসময়…।
লোবো কথা শেষ না করেই ঢুকে গিয়েছিল ঘরে। যখন সুইচ টিপে অন্ধকার ফ্ল্যাটে আলো জ্বালল, দেখল ছেলেটাও গুটি গুটি এসে দাঁড়িয়েছে ঘরের দরজায়। হাতে কী সব চৌকো চৌকো খাতাপত্তর, সেগুলো দেখিয়ে বলল, আপনি একবারটি এগুলো দেখুন, তারপর পছন্দ না হলে আমি চলে যাব।
লোবোর বেশ মেজাজ চড়ছিল, সেটাকে সংযত না করেই বলল, দ্যাখো বাপু, গান-বাজনা আমার কাজ। বাড়িতে রেকর্ড রাখার জায়গা নেই। দয়া করে আমাকে এর-তার পুরোনো রেকর্ড গচাতে চেষ্টা কোরো না।
লোবো একটা সিগারেট ধরিয়ে ধপাস করে বসে পড়েছিল বেতের সোফায়। প্রথম ধোঁয়াটা হাওয়ায় ভাসিতে দিয়ে উপরে চাইতে দেখল যুবকটি মাথা নীচু করে কীরকম অভিমানী চোখে চেয়ে আছে মাটির দিকে। লোবোর সঙ্গে চোখাচোখি হতে বলল, আপনি যা ভাবছেন আমি তা নই। আমি আপনাকে রেকর্ড বেচতে আসিনি, দেখাতে এসেছি। আর এসব রেকর্ড এর তারও নয়, আমার বাবার। আর এগুলো কিছু গানের বই যা, আমার ধারণা, আপনার দেখা দরকার।
লোবো ছেলেটার হাতের পুরোনো ৭৮ আর পি এম রেকর্ডগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, এসব তো খুব পুরোনো রেকর্ড, এতে কাদের গান?
ছেলেটা রেকর্ডগুলো লোবোর সামনের সেন্টার টেবিলে নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল, মোজার্ট, শুমান, ফ্রানজ লিস্ট। আর এই বইগুলো…
ছেলেটার কথা তখনও শেষ হয়নি, তড়াক করে ওর সোফা থেকে লাফিয়ে উঠে লোবো বলল, তুমি আগে প্লিজ বসো, হোয়াট এভার ইয়োর নেম…
ছেলেটা উত্তর দিল, অমিত রে। বাট সিম্পলি কল মি অমিত।
লোবো ওকে বসিয়ে, নিজে বসে, সিলিঙের দিকে চোখ তুলে দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বলল, আমি সত্যি জানি না কেন এমন ব্যবহার করলাম তোমার সঙ্গে। এই সিঁড়ি দিয়ে আমার পিছন পিছন উঠে এসে কত লোকই যে আবদার করে একটু বাজনা শোনাও। আমার প্রথম এবং একমাত্র বান্ধবী প্রিসিলার পর এই তুমিই এলে আমাকে কিছু শোনাতে। দিস ইজ আ গ্রেট ডে ফর মি, অমিত।
